বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় কে-পপ ব্যান্ডগুলোর অসংখ্য আলোচিত নৃত্যপরিকল্পনার পেছনে যাঁর সৃজনশীলতা কাজ করেছে, সেই দক্ষিণ কোরিয়ার খ্যাতিমান নৃত্যপরিচালক চোই ইয়ংজুন এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নৃত্য প্রযুক্তির জগতে নতুন উদ্যোগ নিয়ে হাজির হয়েছেন। তাঁর সহপ্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান এমভিএনটি এমন একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছে, যা সংগীতের সঙ্গে মিলিয়ে নতুন নৃত্যভঙ্গি তৈরি করতে পারবে। অনেকেই এই উদ্যোগকে সংগীত তৈরির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্ল্যাটফর্মগুলোর নাচভিত্তিক সংস্করণ হিসেবে দেখছেন।
দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে নতুন উদ্যোগ
চোই ইয়ংজুন প্রায় দুই দশক ধরে কে-পপ জগতে কাজ করছেন। তাঁর কোরিওগ্রাফি করেছে বিটিএস, সেভেন্টিনসহ বহু জনপ্রিয় শিল্পী ও দল। এ পর্যন্ত তিনি ৮০০-রও বেশি নৃত্যপরিকল্পনা তৈরি করেছেন।
ছয় বছর আগে নৃত্যশিল্পী ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তা জুন জুংয়ের সঙ্গে পরিচয়ের পর দুজনের মধ্যে একটি নতুন ভাবনা জন্ম নেয়। তাদের লক্ষ্য ছিল এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে নৃত্যপরিকল্পনাকারীরা নিজেদের সৃষ্টির জন্য দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক সুবিধা পেতে পারেন।

কপিরাইট সমস্যার সমাধানই ছিল মূল লক্ষ্য
প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়েছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরির উদ্দেশ্যে নয়। বরং নৃত্যশিল্পীদের মেধাস্বত্ব ও আয়ের সীমাবদ্ধতা দূর করাই ছিল প্রধান লক্ষ্য।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী জুন জুং বলেন, অসংখ্য নৃত্যপরিকল্পনা তৈরি হলেও সেগুলো থেকে অধিকাংশ নৃত্যপরিকল্পনাকারী দীর্ঘমেয়াদে কোনো আয় পান না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাচ ছড়িয়ে পড়লেও স্রষ্টাদের জন্য কার্যকর আয়ের ব্যবস্থা খুবই সীমিত।
কীভাবে কাজ করবে এই প্রযুক্তি
এমভিএনটি প্ল্যাটফর্মে নৃত্যপরিকল্পনাকারীরা নিজেদের তৈরি নাচ আপলোড করে একটি ডিজিটাল সংগ্রহশালা গড়ে তুলতে পারবেন। পরে সেই তথ্যভান্ডার ব্যবহার করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন নৃত্যরূপ তৈরি করবে।
যখনই কোনো স্রষ্টার আপলোড করা নৃত্য বা তার উপাদান ব্যবহার হবে, তখন সেই স্রষ্টা স্বীকৃতি ও আয়ের অংশ পাবেন—এমন ব্যবস্থাই গড়ে তুলতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।
বর্তমানে প্ল্যাটফর্মটিতে এক হাজারের বেশি ব্যবহারকারী যুক্ত হয়েছেন এবং দুই হাজারেরও বেশি নৃত্যরুটিন তৈরি হয়েছে।
বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা
২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি একটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে দুই লাখ মার্কিন ডলারের অর্থায়ন পায়। এখন তারা নতুন বিনিয়োগ সংগ্রহের মাধ্যমে এক কোটি মার্কিন ডলার তোলার লক্ষ্য নিয়েছে, যাতে প্রযুক্তি আরও উন্নত করা যায় এবং বিশ্ববাজারে বিস্তার ঘটানো সম্ভব হয়।
সাধারণ মানুষ থেকে পেশাদার—সবার জন্য
প্রথমদিকে সাধারণ ব্যবহারকারী, ছোট ভিডিও নির্মাতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য এই প্রযুক্তি উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে পেশাদার নৃত্যপরিকল্পনাকারীরাও এটি তাঁদের সৃজনশীল কাজের সহকারী হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন।
একই সঙ্গে অ্যানিমেশন, ভার্চুয়াল চরিত্র এবং বিনোদন শিল্পের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্যও এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ রাখা হচ্ছে।
‘নাচ মানুষের হৃদয় থেকেই আসবে’
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি একদিন মানুষের মতো নৃত্য সৃষ্টি করতে পারবে—এমন প্রশ্নে চোই ইয়ংজুনের অবস্থান স্পষ্ট।
তিনি বলেন, নাচ মানুষের অনুভূতি, হৃদয় ও আত্মার প্রকাশ। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কখনোই মানুষের বিকল্প নয়। এটি কেবল একজন সহকারীর মতো কাজ করবে, যা নতুন ধারণা তৈরি ও সৃজনশীলতার পরিধি বাড়াতে সাহায্য করবে।
তাঁর মতে, প্রযুক্তি যদি নৃত্যপরিকল্পনাকারীদের সময় বাঁচায় এবং নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে, তবে সেটিই হবে এর সবচেয়ে বড় সাফল্য।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















