যুক্তরাজ্যের কারাগারে অতিরিক্ত বন্দীর চাপ মোকাবিলায় চালু হওয়া আগাম মুক্তি কর্মসূচিতে বড় পরিবর্তন এনেছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ধর্ষণ, শিশু যৌন নির্যাতন এবং গ্রুমিং-সংক্রান্ত অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিরা আর আগাম মুক্তির সুযোগ পাবেন না। তবে নরহত্যা (ম্যানস্লটার) বা গুরুতর গার্হস্থ্য সহিংসতার মতো অপরাধে দণ্ডিতদের ক্ষেত্রে সেই সুবিধা পুরোপুরি বাতিল করা হয়নি, যা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
অপরাধের ধরনভেদে ভিন্ন সিদ্ধান্ত
সরকার জানিয়েছে, জনমতের উদ্বেগ এবং ভুক্তভোগীদের ক্ষোভের কথা বিবেচনায় নিয়ে ধর্ষণ ও শিশু যৌন নির্যাতনের মতো গুরুতর যৌন অপরাধকে আগাম মুক্তি কর্মসূচির বাইরে রাখা হয়েছে। আগে এমন একটি পরিকল্পনা ছিল, যাতে কিছু গুরুতর অপরাধেও দণ্ডিতরা সাজা অর্ধেক ভোগ করার পর মুক্তির সুযোগ পেতে পারতেন।
তবে প্রধানমন্ত্রী স্বীকার করেছেন, কারাগারের ধারণক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে আরও বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা সম্ভব হয়নি। ফলে ম্যানস্লটার এবং কিছু গুরুতর গার্হস্থ্য সহিংসতার মামলায় দণ্ডিতরা এখনো নির্ধারিত শর্তে আগাম মুক্তির জন্য বিবেচিত হতে পারবেন।

অ্যান্ড্রু হার্পারের পরিবারের ক্ষোভ
এই সিদ্ধান্তের ফলে ২০১৯ সালে দায়িত্ব পালনকালে নিহত পুলিশ কর্মকর্তা পিসি অ্যান্ড্রু হার্পারের হত্যাকাণ্ডে ম্যানস্লটারের দায়ে দণ্ডিত দুই ব্যক্তি আগামী জানুয়ারিতে আগাম মুক্তির জন্য যোগ্য থাকবেন।
হার্পারের স্ত্রী লিসি হার্পার সরকারের সিদ্ধান্তে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, এটি ন্যায়বিচারের প্রতি অপমান এবং ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। তাঁর ভাষায়, একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যার মতো ঘটনা যদি যথেষ্ট গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত না হয়, তবে সেটি অত্যন্ত হতাশাজনক বার্তা বহন করে।
কারাগারের ওপর বাড়তি চাপ
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে কারাগারের অতিরিক্ত ভিড় সামাল দিতে জরুরি ভিত্তিতে আগাম মুক্তির ব্যবস্থা চালু করা হয়। এরপর থেকে প্রায় ৭০ হাজার বন্দী আগাম মুক্তি পেয়েছেন।
গত জুনের শেষে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের কারাগারগুলোতে বন্দীর সংখ্যা ছিল ৮৫ হাজার ৮৫৮ জন। অথচ মোট কার্যকর ধারণক্ষমতা প্রায় ৮৯ হাজার ৫০০। বিচার মন্ত্রণালয় আগে সতর্ক করেছিল, প্রায় ৬ হাজার বন্দীকে আগাম মুক্তি না দিলে নভেম্বরের মধ্যে কারাগারে আর জায়গা থাকবে না।
নীতি পর্যালোচনা ও নতুন ব্যবস্থা
দায়িত্ব নেওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যেই আগাম মুক্তি কর্মসূচি পুনর্বিবেচনার ঘোষণা দেন অ্যান্ডি বার্নহাম। তাঁর ভাষায়, জনসাধারণের উদ্বেগ তিনি স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেছেন। যদিও তিনি আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তা করলে কারাগার ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতো।
সরকার জানিয়েছে, আগামী শরতে যেসব প্রায় ৫ হাজার বন্দী আগাম মুক্তির জন্য বিবেচিত হওয়ার কথা ছিল, তাদের মধ্যে প্রায় ১ হাজার জন নতুন সিদ্ধান্তের কারণে আর এই সুবিধা পাবেন না। একই সঙ্গে গুরুতর অপরাধীদের আগাম মুক্তির পরিকল্পনা এক মাস পিছিয়ে সেপ্টেম্বরের পরিবর্তে অক্টোবরে কার্যকর করা হবে, যাতে প্রবেশন বিভাগ প্রস্তুতির সময় পায় এবং ভুক্তভোগীদের মতামত বিবেচনার সুযোগ থাকে।
নজরদারি আরও কঠোর
আগাম মুক্তিপ্রাপ্তদের ওপর নজরদারি আরও জোরদারের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। অধিকাংশ মুক্তিপ্রাপ্তের জন্য ইলেকট্রনিক ট্যাগ ব্যবহারের নীতি গ্রহণ, প্রবেশন তত্ত্বাবধানের সময় বাড়ানো এবং যৌন অপরাধের পুনরাবৃত্তি কমাতে রাসায়নিক দমন (কেমিক্যাল সাপ্রেশন) কর্মসূচি আরও বিস্তৃত এলাকায় চালুর পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।
তবে বিরোধী দল, গার্হস্থ্য সহিংসতা বিষয়ক কমিশনার এবং ভুক্তভোগীদের প্রতিনিধিরা বলছেন, যৌন অপরাধীদের বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক হলেও সহিংস অপরাধী ও গার্হস্থ্য নির্যাতনের দায়ে দণ্ডিতদেরও আগাম মুক্তির সুযোগ থেকে বাদ দেওয়া উচিত ছিল।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















