ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ শুধু যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিকেই নয়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কর্মসূচিকেও কঠিন চাপে ফেলেছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, যুদ্ধের অর্থায়ন নিয়ে কংগ্রেসে বিতর্ক এবং যুদ্ধের প্রতি জনসমর্থন কমে যাওয়ায় মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ট্রাম্প প্রশাসন নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
এই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলে সফরে যাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সফরে তিনি অর্থনীতি ও নিজের নীতিগত কর্মসূচি তুলে ধরার চেষ্টা করবেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধের প্রভাব তাঁর সেই বার্তাকে দুর্বল করে দিতে পারে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির চাপ
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজারেও। দেশজুড়ে পেট্রোলের গড় মূল্য প্রতি গ্যালনে ৪.১০ ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর সর্বোচ্চ পর্যায়।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গ্যাসোলিনের দাম ৩৭ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। এতে আগে থেকেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে চাপে থাকা মার্কিন ভোক্তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়েছে।
ট্রাম্প অবশ্য দাবি করেছেন, সংঘাতের মধ্যেও আন্তর্জাতিক তেলের দাম প্রত্যাশার তুলনায় কম রয়েছে এবং যুদ্ধ শেষ হলে জ্বালানির দাম দ্রুত কমে আসবে।
তেল কোম্পানিগুলোর দিকে অভিযোগ
সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির জন্য বড় তেল কোম্পানিগুলোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, তাঁর প্রশাসনের নীতির কারণে শেভরন ও এক্সনের মতো প্রতিষ্ঠান রেকর্ড মুনাফা করেছে।
ওভাল অফিসেও তিনি একই বক্তব্য পুনর্ব্যক্ত করে তেল কোম্পানিগুলোকে খুচরা পর্যায়ে জ্বালানির দাম কমানোর আহ্বান জানান। তাঁর ভাষায়, ভোক্তাদের জন্য এখনই জ্বালানির মূল্য কমানো উচিত।

যুদ্ধ নিয়ে রাজনৈতিক চাপ
ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে জনসমর্থনের প্রশ্নে। আধুনিক মার্কিন ইতিহাসে জনসমর্থন ছাড়াই যুদ্ধ শুরু করা প্রেসিডেন্টদের মধ্যে ট্রাম্পের অবস্থান বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে।
যুদ্ধের কোনো সুস্পষ্ট সমাপ্তির ইঙ্গিত না থাকায় জনমত জরিপে যুদ্ধের প্রতি সমর্থন কমছে। একই সঙ্গে কংগ্রেসে যুদ্ধের জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ নিয়েও বিতর্ক বাড়ছে।
যুদ্ধ শুরুতে কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন নেওয়া হয়নি। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুদ্ধের জন্য আরও কয়েক বিলিয়ন ডলার বরাদ্দের প্রশ্ন ওঠার পর বিষয়টি নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনায় আসে।
গত সপ্তাহে সিনেটের রিপাবলিকানরা ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা সীমিত করার উদ্যোগ নাকচ করলেও পরে দলের অনেক সদস্যই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
রিপাবলিকান সিনেটর জন কেনেডি এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে বলেন, নতুন করে বোমা হামলা শুরু করা উচিত কি না, সে বিষয়ে তাঁর কাছে পর্যাপ্ত সামরিক গোয়েন্দা তথ্য নেই। তিনি সতর্ক করেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানির দাম ও মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে এবং সাধারণ মানুষকে তার মূল্য দিতে হবে।
নির্বাচনী প্রচারে ডেমোক্র্যাটদের কৌশল
মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে ডেমোক্র্যাটরা ইতোমধ্যেই যুদ্ধকে রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে ব্যবহার শুরু করেছে।
মেইন অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাট-সমর্থিত সংগঠন মেজরিটি ফরওয়ার্ড রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্সকে লক্ষ্য করে ১৫ লাখ ডলারের বেশি মূল্যের বিজ্ঞাপন প্রচার চালিয়েছে। ওই প্রচারে অভিযোগ করা হয়েছে, কলিন্স ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে ট্রাম্পকে কার্যত ‘ব্ল্যাঙ্ক চেক’ দিয়েছেন।
ইরান যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই তা ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক বার্তা, কংগ্রেসের ভেতরের ঐক্য এবং নির্বাচনী কৌশলের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও জনসমর্থন কমে যাওয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কর্মসূচি এবং নির্বাচনী প্রস্তুতি নতুন চ্যালেঞ্জে পড়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















