পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে কয়েক মাস ধরে চলা জনবিক্ষোভ এখন সহিংস রূপ নিয়েছে। মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে শুরু হওয়া আন্দোলন ধীরে ধীরে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, নির্বাচনব্যবস্থা এবং ইসলামাবাদের শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে বৃহত্তর গণআন্দোলনে পরিণত হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অভিযানে বহু মানুষের প্রাণহানির অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন, প্রবাসী কাশ্মীরি নেতারা এবং ভারত।
মূল্যবৃদ্ধি থেকে রাজনৈতিক আন্দোলন
করোনা মহামারির পর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামছাড়া দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে সাধারণ মানুষের আন্দোলনের সূচনা হয়। পরে সেই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয় জম্মু-কাশ্মীর যৌথ আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি। তাদের দাবি, শুধু দ্রব্যমূল্য নয়, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় জনগণের রাজনৈতিক অধিকারও উপেক্ষিত হচ্ছে।
বর্তমানে পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে তিন ধাপে নির্বাচন চলছে। তবে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বিদ্যমান নির্বাচনব্যবস্থা জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে ব্যর্থ। তাই নির্বাচন শুরুর আগেই তারা কাঠামোগত পরিবর্তনের দাবি জানায়।
প্রতিনিধিত্ব নিয়ে ক্ষোভের কারণ
পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরের আইনসভায় মোট ৫৩টি আসনের মধ্যে ৪৫টি নির্বাচিত এবং আটটি মনোনীত। নির্বাচিত আসনের মধ্যে ১২টি সংরক্ষিত রয়েছে ১৯৪৭ সালের পর ভারতীয় জম্মু-কাশ্মীর থেকে স্থানান্তরিত শরণার্থীদের জন্য। এসব আসনের ভোটারদের বড় অংশই অঞ্চলটির বাইরে অবস্থান করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই সংরক্ষিত আসনগুলোর কারণে তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব কমে গেছে এবং ইসলামাবাদ সহজেই স্থানীয় জনমতের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারছে। এই ব্যবস্থার পরিবর্তনই এখন আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি।
দমন-পীড়নের অভিযোগ
নির্বাচনী প্রক্রিয়া চলাকালেই আন্দোলনকারীরা দীর্ঘ পদযাত্রার কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এরপর বিভিন্ন শহরে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী সংগঠনের দাবি, নিরাপত্তা বাহিনীর গুলি ও অভিযানে বহু মানুষ নিহত এবং শতাধিক আহত হয়েছেন।
বিশেষ করে এক গবেষক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বক্তব্য এবং আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে তিনি তরুণদের মধ্যে পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছিলেন।
ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক কেন জটিল
দীর্ঘদিন ধরেই পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে উন্নয়নবঞ্চনা ও অবহেলার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয় যখন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বিক্ষোভকারীদের নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেন। তার বক্তব্যে জনমনে ক্ষোভ বাড়ে। একই সময়ে নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপেও অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ ওঠে।
ভারতের প্রতিক্রিয়া
ভারত গত কয়েক মাস ধরে পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে বিক্ষোভ দমনে বলপ্রয়োগের সমালোচনা করে আসছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান উদ্বেগজনক এবং এতে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।
তবে আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী সংগঠন ভারতের মন্তব্যও প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের বক্তব্য, এই আন্দোলন সম্পূর্ণভাবে নাগরিক অধিকারভিত্তিক এবং এটিকে ভারত-পাকিস্তান বিরোধের অংশ হিসেবে দেখানো বিভ্রান্তিকর।
অন্যদিকে কাশ্মীরের বিশিষ্ট ধর্মীয় নেতা মিরওয়াইজ উমর ফারুকও সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো পাকিস্তানকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। যোগাযোগব্যবস্থার ওপর বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া, সংবাদমাধ্যম ও স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার দাবিও উঠেছে।
যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী প্রবাসী কাশ্মীরিরাও অনলাইনে প্রচারণা শুরু করেছেন। তাদের দাবি, বিক্ষোভ মোকাবিলায় অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ বন্ধ করতে হবে এবং রাজনৈতিক সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজতে হবে।
কৌশলগত গুরুত্বও রয়েছে
যেসব এলাকায় বিক্ষোভ সবচেয়ে বেশি হচ্ছে, সেগুলো নিয়ন্ত্রণরেখার কাছাকাছি এবং পাকিস্তানের নিরাপত্তা কৌশলের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষকদের মতে, এ কারণেই ইসলামাবাদ পরিস্থিতিকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইছে।
একই সঙ্গে এসব এলাকার সঙ্গে অতীতের সীমান্ত উত্তেজনা ও নিরাপত্তা ইস্যুরও সম্পর্ক রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতা এখন শুধু অভ্যন্তরীণ সংকট নয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরে মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন রাজনৈতিক অধিকার, নির্বাচনব্যবস্থা ও শাসন কাঠামো নিয়ে গভীর অসন্তোষের প্রতীক হয়ে উঠেছে। কঠোর নিরাপত্তা অভিযান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। আন্দোলনকারীরা তাদের দাবিতে অনড় থাকায় সংকটের দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনা আপাতত সীমিত বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















