জাপানের কুমামোতো প্রিফেকচারে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানার এক সপ্তাহ পর জরুরি তৎপরতার মূল লক্ষ্য এখন ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের উদ্ধারের পরিবর্তে বেঁচে থাকা মানুষের জীবন স্থিতিশীল করা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী মৃত্যুর ঝুঁকি কমানো। তবে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর বৈষম্যমূলক পরিস্থিতি, নিরাপদ পানির সংকট এবং তীব্র গরম নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
প্রিফেকচার প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২৮ জুলাইয়ের ভূমিকম্পে মঙ্গলবার পর্যন্ত ৩৮ জনের মৃত্যু এবং ১২৩ জন আহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত হয়েছে। এছাড়া আশ্রয়ের জন্য গাড়িতে অবস্থান করা এক ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনাকে তাপঘাতজনিত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
দুর্যোগ-পরবর্তী চিকিৎসা পরিস্থিতির পরিবর্তন
জাপানিজ অ্যাসোসিয়েশন ফর ডিজাস্টার মেডিসিনের তথ্য বলছে, ভূমিকম্পের পঞ্চম দিন থেকেই সরাসরি আঘাতপ্রাপ্ত আহতদের তুলনায় অসুস্থতা ও অন্যান্য শারীরিক জটিলতায় চিকিৎসা নেওয়া মানুষের সংখ্যা বেশি হয়ে গেছে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক আশ্রয়কেন্দ্রে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় মানুষ স্বাভাবিকভাবে তরল গ্রহণ করতে পারছেন না। আবার জ্বালানির সংকটে অনেকেই গাড়িতে থাকলেও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালাতে পারছেন না, ফলে প্রচণ্ড গরমে তাপঘাতের ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে।
বাড়ছে রক্ত জমাট বাঁধা ও সংক্রমণের আশঙ্কা
চিকিৎসকেরা সতর্ক করেছেন, পানিশূন্যতা এবং দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে বা শুয়ে থাকার কারণে ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস বা শিরায় রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে। এই অবস্থা ‘ইকোনমি ক্লাস সিনড্রোম’ নামেও পরিচিত। রক্ত জমাট ফুসফুসে পৌঁছে গেলে তা প্রাণঘাতী হতে পারে।
এ ছাড়া খাদ্যদূষণ, সংক্রামক রোগের বিস্তার এবং আগে থেকেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত বয়স্কদের স্বাস্থ্য অবনতির আশঙ্কাও বাড়ছে।
চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, নিয়মিত পর্যাপ্ত পানি পান এবং শরীর ঠান্ডা রাখা তাপঘাত প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। গোসলের সুযোগ না থাকলেও ভেজা তোয়ালে বা প্রবাহমান পানি দিয়ে শরীর ঠান্ডা রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
২০১৬ সালের অভিজ্ঞতা থেকে সতর্কতা
বিশেষজ্ঞরা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ২০১৬ সালের কুমামোতো ভূমিকম্পে মোট ২৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এর মধ্যে ২২৫ জনের মৃত্যু সরাসরি ভূমিকম্পে নয়, বরং দীর্ঘদিন আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা, মানসিক চাপ, চিকিৎসা ব্যাহত হওয়া এবং শারীরিক জটিলতার কারণে ঘটে। তাই এবারও দুর্যোগ-পরবর্তী মৃত্যুর ঝুঁকি ঠেকাতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আশ্রয়কেন্দ্রে এখনও সংকট
মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত কুমামোতোর চারটি পৌর এলাকায় প্রায় ৪৪ হাজার পরিবার নিরাপদ পানির সংযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিভ্রাট অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা গেলেও স্থানীয় সংযোগ ক্ষতিগ্রস্ত থাকায় কিছু ভবনে এখনও সমস্যা রয়েছে।
প্রিফেকচারের ১৪৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে মোট ৭ হাজার ৬৪৬ জন অবস্থান করছেন। চিকিৎসা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনেক কেন্দ্রে পরিস্থিতি এখনও সন্তোষজনক নয়। সম্প্রতি পর্যন্ত কিছু মানুষ মেঝেতে শুধু একটি কাগজের শিট বিছিয়ে রাত কাটাতে বাধ্য হয়েছেন। এই পরিস্থিতির কারণে অনেকেই আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে ব্যক্তিগত গাড়িতে রাত কাটাচ্ছেন, যা তাপঘাত ও রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সরকারের সহায়তা ও পুনর্গঠন পরিকল্পনা
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ২১৪টি পানিবাহী ট্রাক মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি জাহাজের মাধ্যমে প্রায় ৪০০ মেট্রিক টন পানি পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। সোমবার সকাল পর্যন্ত প্রায় ৭৩০টি এয়ার কন্ডিশনার ও কুলিং ইউনিট সরবরাহ করা হয়েছে এবং আরও সরঞ্জাম পাঠানোর ব্যবস্থা চলছে।
সোমবার কুমামোতো সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ভূমিকম্পটিকে ‘অত্যন্ত গুরুতর দুর্যোগ’ হিসেবে ঘোষণা করার কথা জানান। এর ফলে জনপরিকাঠামো ও কৃষিজমি পুনর্গঠনে কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক সহায়তা বাড়বে। মঙ্গলবার সরকার ২০২৬ অর্থবছরের সংরক্ষিত তহবিল থেকে দুর্যোগ ত্রাণ ও পুনরুদ্ধারে ২৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ইয়েন অনুমোদন করেছে।
তিনি বলেন, বাজেটের সীমাবদ্ধতা যেন কখনও দুর্যোগ মোকাবিলায় বাধা না হয়, সে নীতিতেই সরকার জরুরি সহায়তা থেকে পূর্ণাঙ্গ পুনর্গঠন পর্যন্ত প্রয়োজন অনুযায়ী সংরক্ষিত তহবিল ব্যবহার করবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার চাহিদার জন্য অপেক্ষা না করে প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরাসরি পাঠানোর নীতিও অব্যাহত থাকবে।
জাপানের কুমামোতো ভূমিকম্পের এক সপ্তাহ পর উদ্ধার অভিযান থেকে জোর দেওয়া হচ্ছে বেঁচে থাকা মানুষের জীবন রক্ষা, স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো এবং পুনর্গঠনের কাজে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















