দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে জাপানের রাজনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অন্তরালের এক কম আলোচিত অধ্যায়কে বড় পর্দায় তুলে এনেছে নতুন জাপানি চলচ্চিত্র ‘দ্য সিক্রেট ব্যাটলফিল্ড’ (কাইসেন জেনইয়া)। পরিচালক ইউইয়া ইশির নির্মিত এই ছবি দেখায়, কীভাবে যুদ্ধ শুরুর আগেই একদল বিশেষজ্ঞ দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের ভয়াবহ পরিণতির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, কিন্তু সেই সতর্কবার্তা শেষ পর্যন্ত উপেক্ষিত হয়।
ইতিহাসভিত্তিক এই চলচ্চিত্রটি ১৯৮৩ সালে নাওকি ইনোসের লেখা একটি নন-ফিকশন বই অবলম্বনে নির্মিত। এর আগে গল্পটি এনএইচকের একটি টেলিভিশন নাটক হিসেবেও প্রচারিত হয়েছিল। এবার সেটিকে সম্প্রসারিত করে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে রূপ দেওয়া হয়েছে।
যুদ্ধের আগে গোপন গবেষণা
চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় চরিত্র ইয়োইচি উজিতা, পেশায় একজন ব্যাংকার, যিনি কৃষি ঋণ নিয়ে কাজ করেন। সরকারি নির্দেশে তাকে এমন একটি বিশেষ গবেষণা দলে যুক্ত করা হয়, যেখানে সামরিক কর্মকর্তা, আমলা এবং বেসামরিক বিশেষজ্ঞরা একত্রে বিশ্লেষণ করেন—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে জাপানের সম্ভাব্য অবস্থান কী হতে পারে।
এই দলটি ‘টোটাল ওয়ার রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এ যুদ্ধের সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে বিভিন্ন পরিস্থিতির অনুকরণে বিশ্লেষণ চালায়। তাদের সিদ্ধান্ত ছিল স্পষ্ট—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ জাপানের পরাজয় ডেকে আনবে। কিন্তু সেই মূল্যায়ন নীতিনির্ধারণে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি।

ঐতিহাসিক বাস্তবতার পুনর্নির্মাণ
পরিচালক ইউইয়া ইশি যুদ্ধপূর্ব জাপানের রাজনৈতিক পরিবেশকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যেখানে জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা, নিরাপত্তাহীনতা এবং রাজনৈতিক চাপ একসঙ্গে কাজ করেছে। বিশেষ করে চীনে জাপানের আগ্রাসনের পর সৃষ্ট পরিস্থিতি কীভাবে যুদ্ধের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছিল, সেটিও চলচ্চিত্রে গুরুত্ব পেয়েছে।
ছবিটি শুধু গবেষণা দলের পূর্বাভাসই তুলে ধরে না, বরং কেন সেই সতর্কবার্তা অগ্রাহ্য করা হয়েছিল, সেই প্রশ্নেরও উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে।
চরিত্র নিয়ে বিতর্ক
চলচ্চিত্রে গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে মেজর জেনারেল দাইদো ইতাকুরাকে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে। তবে বাস্তব জীবনের ওই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক জেনারেল জো ইইমুরার নাতি এই উপস্থাপনা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, চলচ্চিত্রটি তার দাদার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে এবং এ নিয়ে ক্ষতিপূরণের দাবিতে মামলা করেছেন।
তবে নির্মাতাদের অবস্থান হলো, বাস্তব ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত কল্পকাহিনির ক্ষেত্রে এমন আইনি বাধা ভবিষ্যতে ঐতিহাসিক চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য নেতিবাচক নজির তৈরি করতে পারে।
শৈল্পিকতার চেয়ে ইতিহাসের গুরুত্ব
সমালোচনায় বলা হয়েছে, চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে বড় শক্তি এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব। যদিও টেলিভিশন নাটক থেকে সম্প্রসারিত হওয়ায় দৃশ্য নির্মাণ, সংলাপ এবং উপস্থাপনায় টিভি প্রযোজনার ছাপ রয়ে গেছে, তবু বাস্তব ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে দর্শকের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে ছবিটি কার্যকর।
চলচ্চিত্রে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও সেনা কর্মকর্তা হিদেকি তোজোকেও একমাত্র খলনায়ক হিসেবে দেখানো হয়নি। বরং তাকে এমন একজন দ্বিধাগ্রস্ত নেতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যিনি সম্ভাব্য পরাজয়ের আশঙ্কা জানার পরও যুদ্ধ ঠেকাতে ব্যর্থ হন।
‘দ্য সিক্রেট ব্যাটলফিল্ড’ বর্তমানে জাপানের প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হচ্ছে। ১৩৮ মিনিট দৈর্ঘ্যের এই চলচ্চিত্রটি জাপানি ভাষায় নির্মিত।
যুদ্ধ শুরুর আগেই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য পরাজয়ের পূর্বাভাস দেওয়া জাপানি গবেষণা দলের বাস্তব ইতিহাস নিয়ে নির্মিত ‘দ্য সিক্রেট ব্যাটলফিল্ড’ নতুন করে আলোচনায়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















