যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সমর্থক এবং বিতর্কিত হলেও প্রভাবশালী রক্ষণশীল ব্লগার লরা লুমারের ইউক্রেন সফর দেশটির প্রতি তাঁর অবস্থানে নাটকীয় পরিবর্তন এনেছে। দীর্ঘদিন ইউক্রেনের সমালোচক হিসেবে পরিচিত লুমার এখন প্রকাশ্যে ইউক্রেনের অন্যতম জোরালো সমর্থকে পরিণত হয়েছেন। তাঁর এই অবস্থান পরিবর্তন ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ আন্দোলনের ভেতরেও নতুন করে মতবিরোধের জন্ম দিয়েছে।
ইউক্রেন সফরেই বদলে যায় দৃষ্টিভঙ্গি
গত ১৯ জুলাই লুমার ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে পৌঁছান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি নিজের চোখে দেখাই ছিল সফরের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু প্রায় দশ দিনের এই সফর শেষে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে এসে ইউক্রেনের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন।
সফরকালে তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সাক্ষাৎকার নেন, সামনের সারির এক সামরিক কমান্ডারের সঙ্গে কথা বলেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফকে ইউক্রেন সফরে যেতে উৎসাহিত করারও চেষ্টা করেন। দেশে ফিরে তিনি দাবি করেন, এই সফর তাঁর চিন্তাধারায় গভীর পরিবর্তন এনেছে এবং তিনি মনে করেন তাঁর উদ্যোগ আন্তর্জাতিক নীতিতেও প্রভাব ফেলেছে।
হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের আশা
লুমার জানান, চলতি মাসেই তিনি হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করে ইউক্রেন সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে চান। ট্রাম্প ইতোমধ্যে সামাজিক মাধ্যমে জেলেনস্কির সঙ্গে লুমারের সাক্ষাৎকার প্রচার করেছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পও ইউক্রেনের প্রতি তুলনামূলক ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছেন। তিনি ন্যাটো সম্মেলনে ইউক্রেনের আত্মরক্ষার অধিকারের পক্ষে বক্তব্য দেন এবং জেলেনস্কির সঙ্গেও আগের তুলনায় উষ্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তবে তিনি এখনো রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং জেলেনস্কি—দুজনের সঙ্গেই তাঁর ভালো সম্পর্ক রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন।
‘রাশিয়াই মূল সমস্যা’
লুমারের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত রাশিয়াকে প্রধান হুমকি হিসেবে দেখা। তাঁর ভাষায়, রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করেছে এবং এমন একটি বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা চায়, যা যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাব কমিয়ে দিতে পারে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য ইউক্রেনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হওয়া জরুরি।
একসময় যিনি ইউক্রেনকে কড়া ভাষায় সমালোচনা করতেন, তিনিই এখন বলছেন, “রাশিয়ার তুলনায় ইউক্রেনকে সমর্থন করাই প্রকৃত অর্থে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি।”

রুশ প্রভাব নিয়ে সতর্কবার্তা
লুমারের দাবি, রাশিয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বিভাজন সৃষ্টি এবং বিশেষ করে ডানপন্থী ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। তাঁর অভিযোগ, অনেক রক্ষণশীল মতাদর্শের মানুষ রুশ প্রচারণার প্রভাবে বিভ্রান্ত হচ্ছেন এবং ভুল তথ্য বিশ্বাস করছেন।
তিনি জানান, গত দেড় বছরে সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন প্রচারণা পর্যবেক্ষণ করেই তাঁর অবস্থান ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে।
ইউক্রেনের কৌশল
ইউক্রেন দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল মহলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। সেই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই লুমারের সফরকে গুরুত্ব দেওয়া হয় বলে দেশটির কর্মকর্তারা মনে করছেন।
সফরকালে লুমার জেলেনস্কির সঙ্গে দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে ইউক্রেনের ভাবমূর্তি নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি পরামর্শ দেন, আন্তর্জাতিক মহল এবং বিশেষ করে মার্কিন জনগণের কাছে ইউক্রেনের অবস্থান আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা উচিত। একই সঙ্গে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রের সামনের সারির শহর খারকিভ সফর করেন এবং সেখানে ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গেও কথা বলেন।
‘আমেরিকা ফার্স্ট’ আন্দোলনে নতুন বিতর্ক
লুমারের অবস্থান পরিবর্তন ট্রাম্পপন্থী রাজনীতির ভেতরে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ আন্দোলনের একটি অংশ ইউক্রেনে মার্কিন সহায়তার বিরোধিতা করে আসছিল। কিন্তু লুমারের মতো প্রভাবশালী এক কণ্ঠের অবস্থান পরিবর্তন সেই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
তিনি এখন যুক্তি দিচ্ছেন, ইউক্রেন শুধু রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করছে না; বরং ভবিষ্যতের নিরাপত্তা প্রযুক্তি, বিশেষ করে ড্রোন প্রতিরোধের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকেও গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিতে পারে। তাঁর মতে, এই কারণেই ইউক্রেনকে সমর্থন করা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল রাজনীতিতে লুমারের এই নতুন অবস্থান ভবিষ্যতে ট্রাম্প প্রশাসনের ইউক্রেননীতি এবং ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ বিতর্ক—উভয়ের ওপরই উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















