চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক চাপের মধ্যে তাইওয়ান ১০ দিনব্যাপী বার্ষিক বৃহৎ সামরিক মহড়া শুরু করেছে। এবারের মহড়ায় প্রথমবারের মতো এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে মাঠপর্যায়ের সেনা কর্মকর্তাদের পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনার বাইরে হঠাৎ বদলে যাওয়া যুদ্ধপরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পাশাপাশি সীমিত ইন্টারনেট ব্যবস্থার মধ্যেও সামরিক ও বেসামরিক যোগাযোগ কীভাবে সচল রাখা যায়, সেটিও পরীক্ষা করা হবে।
বাস্তব যুদ্ধের মতো পরিবেশ তৈরির চেষ্টা
বুধবার ভোরে রাজধানী তাইপের ভূগর্ভস্থ কমান্ড সেন্টার থেকে মহড়ার নির্দেশ জারির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ‘হান কুয়াং’ নামে পরিচিত এই বার্ষিক অনুশীলন। এরপর যুদ্ধপ্রস্তুতির অংশ হিসেবে যুদ্ধবিমান বিভিন্ন ঘাঁটিতে ছড়িয়ে দেওয়া, জরুরি নৌ মোতায়েন এবং বিভিন্ন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করার মহড়া শুরু হয়।

সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এবারের অনুশীলনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদ্ধতি অনুসরণ করে নতুন একটি ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে। এর আওতায় অধস্তন কর্মকর্তারা ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশ গ্রহণের পর তা নিজেদের ভাষায় পুনরায় ব্যাখ্যা করবেন, যাতে নির্দেশের উদ্দেশ্য ও বাস্তবায়ন নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি না থাকে এবং সব পর্যায়ে সমন্বয় আরও শক্তিশালী হয়।
ইন্টারনেট সীমিত থাকলে কী হবে, তারও পরীক্ষা
এবারের মহড়ার একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো মোবাইল ইন্টারনেটের গতি ইচ্ছাকৃতভাবে কমিয়ে দেওয়া। এর মাধ্যমে দেখা হবে, যুদ্ধের সময় যদি যোগাযোগব্যবস্থা আংশিকভাবে অচল হয়ে পড়ে, তাহলে সাধারণ মানুষ এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থা কীভাবে যোগাযোগ বজায় রাখবে।
একই সঙ্গে বড় অস্ত্রভান্ডার নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, বেসামরিক কারখানাগুলোকে সামরিক প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করা এবং তাইওয়ানের পূর্ব উপকূলে সমুদ্রপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মহড়াও অনুষ্ঠিত হবে। ধারণা করা হচ্ছে, সম্ভাব্য সংঘাতের সময় চীন তাইওয়ানের প্রশান্ত মহাসাগরমুখী সরবরাহপথ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করতে পারে। সেই সম্ভাবনাও মাথায় রেখে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্তের অনুশীলন
সামরিক কর্মকর্তারা বলেছেন, এবারের মহড়ার মূল লক্ষ্য শুধু পূর্বপরিকল্পিত অনুশীলন নয়, বরং এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যেখানে বাস্তব যুদ্ধের মতো হঠাৎ নতুন সংকট সৃষ্টি হবে। তখন মাঠপর্যায়ের কমান্ডারদের দ্রুত পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে নতুন নির্দেশনা দিতে হবে।
তাদের মতে, আগের মহড়াগুলোর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সাজানো-গোছানো হওয়ার যে সমালোচনা ছিল, এবার তার পরিবর্তে বাস্তবতার কাছাকাছি পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে।
সরকারি কার্যক্রম সচল রাখার প্রস্তুতিও থাকবে
মহড়ার অংশ হিসেবে স্থানীয় প্রশাসনের সক্ষমতাও পরীক্ষা করা হবে। ভূমিকম্প, বড় ধরনের দুর্যোগ কিংবা সম্ভাব্য সামরিক হামলার মতো একাধিক সংকট একসঙ্গে দেখা দিলে কীভাবে সরকারি কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া হবে, সেটিও অনুশীলনের অন্তর্ভুক্ত।
এছাড়া ২০ হাজারের বেশি রিজার্ভ সেনাকে ডাকা হয়েছে। রাজধানীর একটি বিদ্যালয়ের মাঠে তাদের মর্টার পরিচালনা, রাইফেল ব্যবহারের কৌশল এবং যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান নেওয়ার প্রশিক্ষণও শুরু হয়েছে।
ভুয়া তথ্য মোকাবিলার ব্যবস্থাও থাকবে
এবার প্রথমবারের মতো সামনের সারির যুদ্ধসংক্রান্ত তথ্য প্রচার এবং শত্রুপক্ষের বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা মোকাবিলার সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য বিশেষ সংবাদ মূল্যায়ন ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে।
তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের ভাষায়, এই মহড়ার উদ্দেশ্য শুধু সেনাবাহিনীর প্রস্তুতি বাড়ানো নয়, বরং পুরো সমাজকে সম্ভাব্য যুদ্ধপরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য আরও সক্ষম করে তোলা। আগামী ১৪ আগস্ট পর্যন্ত এই মহড়া চলবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















