মেক্সিকোর সবচেয়ে বড় এবং অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় মেক্সিকোর জাতীয় স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় (ইউএনএএম) ভর্তি পরীক্ষায় ব্যাপক জালিয়াতির সন্দেহে প্রায় ৫৮ হাজার শিক্ষার্থীকে পুনরায় পরীক্ষা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। অনলাইনে প্রথমবারের মতো আয়োজিত ভর্তি পরীক্ষা ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
অস্বাভাবিক ফলাফলে সন্দেহের শুরু
এ বছর গ্রীষ্মে প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়। পরীক্ষাটি ঘরে বসে অনলাইনে নেওয়া হয় এবং পরীক্ষার্থীদের পর্যবেক্ষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ওয়েবক্যাম, মুখমণ্ডল ও কণ্ঠ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। তবে ফলাফল প্রকাশের আগে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দেখতে পায়, আগের বছরের তুলনায় অসাধারণ উচ্চ নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।
২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে যেখানে ১২০ নম্বরের পরীক্ষায় ১০০ বা তার বেশি নম্বর পেত মাত্র সাড়ে তিন শতাংশ পরীক্ষার্থী, সেখানে এ বছর সেই হার বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ শতাংশে। একইভাবে ১১০ বা তার বেশি নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীর হার শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছে যায়।
বিশেষ করে চিকিৎসা অনুষদে ভর্তি হতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ ১০০ বা তার বেশি নম্বর অর্জন করেছে, যা গত বছরের ৯ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দায় স্বীকার
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর লিওনার্দো লোমেলি বলেছেন, বিজ্ঞান, মানবিক শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইউএনএএম নিজের ভুল স্বীকার করতে এবং তা সংশোধন করতে জানে। তিনি বলেন, এই ঘটনায় দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করতেই বিশ্ববিদ্যালয় পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যারা সৎভাবে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন, তাদের আবার পরীক্ষা দিতে হওয়ায় তিনি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। তবে ভর্তি প্রক্রিয়ায় ন্যায্যতা ও সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
হাজারো ফল বাতিল, ফৌজদারি তদন্ত
ফলাফল প্রকাশের আগেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় ৩ হাজার ১৭৪টি পরীক্ষার ফল বাতিল করে। পরিচয় জালিয়াতি, বাইরের সহায়তা গ্রহণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহারের মতো নানা অনিয়ম শনাক্ত হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় ইতোমধ্যে একটি ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পরীক্ষার্থীদের অবৈধ সুবিধা দেওয়ার নামে প্রতারণামূলক সেবা দিচ্ছিল। এখন বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা তদন্ত করছে।
প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনলাইন প্রতারণার অভিযোগ
বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, পরীক্ষা চলাকালীন প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে অনলাইনে বিক্রিও হয়েছে। পাশাপাশি পরীক্ষার আগে বিভিন্ন মাধ্যমে নকল করার কৌশলও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ধারণা করা হচ্ছে, বহু পরীক্ষার্থী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন প্রযুক্তির সহায়তায় পরীক্ষায় অনিয়ম করেছে।
একজন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন অনুযায়ী, প্রায় ৭৫ হাজার পরীক্ষায় কোনো না কোনো মাত্রায় অনিয়মের সম্ভাবনা থাকতে পারে।
শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শত শত শিক্ষার্থী রাজধানী মেক্সিকো সিটিতে বিক্ষোভ করে এবং শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ করে। তাদের দাবি, যারা সৎভাবে পরীক্ষা দিয়েছে, তাদের আবার পরীক্ষায় বসতে বাধ্য করা অন্যায়।
ভর্তি কার্যক্রম স্থগিত
এই নজিরবিহীন ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় সাময়িকভাবে সব ভর্তি কার্যক্রম স্থগিত করেছে এবং পুরো পরিস্থিতি মূল্যায়নে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করেছে।
এ বছর এক লাখ ৫৮ হাজারের বেশি আবেদনকারীর মধ্যে মাত্র ২১ হাজার ৯৬২টি আসনের জন্য প্রতিযোগিতা হয়েছিল। জালিয়াতির অভিযোগের কারণে নতুন শিক্ষাবর্ষও পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। পূর্বনির্ধারিত ১০ আগস্টের পরিবর্তে এখন নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হবে ৩১ আগস্ট।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















