রাশিয়ার অন্যতম পরিচিত যুদ্ধবিরোধী রাজনীতিক বরিস নাদেজদিন দেশ ছেড়ে ফ্রান্সে পৌঁছানোর ঘোষণা দিয়েছেন। আসন্ন সংসদীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ বাতিল হওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি এই পদক্ষেপ নেন। নাদেজদিনের এই দেশত্যাগকে রাশিয়ায় বিরোধী রাজনীতির ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ফ্রান্সে পৌঁছে স্বাধীনতার বার্তা
সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিওতে প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে নাদেজদিন জানান, তিনি নিরাপদে ফ্রান্সে পৌঁছেছেন। ভিডিওতে তিনি বলেন, তিনি এখন জীবিত ও স্বাধীন, তবে নিজের দেশে ফিরে যেতে না পারার কষ্ট এখনও রয়ে গেছে।
কীভাবে তিনি রাশিয়া ছাড়তে সক্ষম হয়েছেন, সে বিষয়ে তিনি কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি। তবে তিনি জানান, নতুন পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে পরে জানাবেন।
নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পথ বন্ধ
সম্প্রতি নাদেজদিনের বিরুদ্ধে তথাকথিত ‘চরমপন্থার প্রতীক’ প্রদর্শনের অভিযোগ আনা হয়। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই তাকে সংসদীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখা হয়। অভিযোগের সূত্র ছিল এমন একটি ভিডিওর লিংক ভাগ করে নেওয়া, যেখানে রাশিয়ার প্রয়াত বিরোধী নেতা আলেক্সেই নাভালনির একটি ছবি ছিল।
এর আগেই তাকে ‘বিদেশি প্রভাবাধীন ব্যক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। পাশাপাশি একটি চলমান দেউলিয়া মামলার অজুহাতে তার বিদেশ ভ্রমণেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

জীবন নিয়ে শঙ্কা
গত মাসে এক সাক্ষাৎকারে নাদেজদিন বলেছিলেন, তিনি নিজের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগে আছেন এবং সুযোগ পেলেই দেশ ছাড়ার চেষ্টা করবেন। তিনি জানান, সরকারের ক্রমাগত চাপের কারণে রাশিয়ায় বিরোধী রাজনীতি চালিয়ে যাওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
তিনি রাশিয়ার দুই আলোচিত বিরোধী নেতা বরিস নেমৎসভ ও আলেক্সেই নাভালনির পরিণতির কথাও উল্লেখ করেন। নেমৎসভ ২০১৫ সালে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। অন্যদিকে নাভালনির মৃত্যুকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
যুদ্ধবিরোধী অবস্থান থেকেই জনপ্রিয়তা
নাদেজদিন ২০২৪ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় ইউক্রেন যুদ্ধের বিরোধিতা করে আলোচনায় আসেন। তিনি প্রার্থিতা সমর্থনে কয়েক লাখ মানুষের স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কর্তৃপক্ষ তার প্রার্থিতা গ্রহণ করেনি।
সাম্প্রতিক সংসদীয় নির্বাচনের প্রস্তুতিতে তিনি ‘শান্তি, উন্নয়ন, সৎ নির্বাচন ও শক্তিশালী শহর’ স্লোগান সামনে এনে প্রচার চালাচ্ছিলেন। তিনি ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান, মুক্ত নির্বাচন এবং ইন্টারনেটের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের দাবি তুলেছিলেন।
বিরোধী দলগুলোর ওপর বাড়ছে চাপ
রাশিয়ার উদারপন্থী ইয়াবলোকো দলও আসন্ন নির্বাচনের আগে নানা বাধার মুখে পড়েছে। দলটি ‘শান্তি ও স্বাধীনতা’ স্লোগান নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলেও তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী কয়েকটি অঞ্চলে প্রার্থী দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
এ ছাড়া দলটির একাধিক সদস্যের বিরুদ্ধেও ‘চরমপন্থার প্রতীক’ প্রদর্শনের অভিযোগ এনে তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সেপ্টেম্বরের সংসদীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বিরোধী রাজনীতিকদের কার্যক্রম সীমিত করার প্রচেষ্টা আরও জোরদার হয়েছে।
রাশিয়া থেকে নাদেজদিনের প্রস্থান দেশটির বিরোধী রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। তিনি বিদেশে অবস্থান করলেও ভবিষ্যতে কীভাবে রাজনৈতিক ভূমিকা রাখবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে তার দেশত্যাগ রাশিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনাকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















