যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাঁচ মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসান ঘটাতে সম্ভাব্য আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। অন্যদিকে ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, বর্তমানে কোনো আলোচনা হচ্ছে না এবং এমন কোনো বৈঠকেরও সূচি নেই। এ অবস্থায় হরমুজ প্রণালির কাছে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
আলোচনা নিয়ে পরস্পরবিরোধী অবস্থান
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা চলছে এবং এটি ইরানসহ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের অনুরোধে এগোচ্ছে। তিনি ইরানের উদ্দেশে এটিকে “ভালো একটি চুক্তি” স্বাক্ষরের শেষ সুযোগ বলেও মন্তব্য করেন।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য আসে এমন এক সময়ে, যখন তিনি এর আগে ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক হামলার অনুমোদন দিয়েও তা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কূটনৈতিক উদ্যোগের সুযোগ দিতেই সেই হামলা বাতিল করা হয়।
ইরানের সরাসরি অস্বীকৃতি
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি ট্রাম্পের বক্তব্য নাকচ করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বর্তমানে কোনো আলোচনা চলছে না এবং নিকট ভবিষ্যতেও কোনো বৈঠক নির্ধারিত নেই।
তিনি জানান, ইরান বিদেশি কোনো প্রতিনিধি দলকে আতিথ্য দেওয়ার বা নিজেদের আলোচকদের বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা করেনি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ধর্মীয় সফরে ইরাকে থাকলেও অন্যান্য আলোচক দেশে অবস্থান করছেন। বাঘায়ির মতে, বর্তমানে কেবল ওমানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
হরমুজে জাহাজে হামলা
এই কূটনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেই ওমান উপকূলসংলগ্ন হরমুজ প্রণালির কাছে একটি কার্গো জাহাজ অজ্ঞাত একটি প্রক্ষেপণে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও)।
বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের উল্লেখযোগ্য অংশ এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করে। সাম্প্রতিক সংঘাতের পর এ পথের নৌযান চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ক্লেপলারের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার মাত্র ছয়টি জাহাজ প্রণালিটি অতিক্রম করেছে, যার মধ্যে ছিল তিনটি তেলবাহী ট্যাংকার ও তিনটি বাল্ক ক্যারিয়ার।
বাজারের প্রতিক্রিয়া
যদিও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অব্যাহত রয়েছে, তবু সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমাধানের আশায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমেছে। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৭ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮৩ দশমিক ৭৭ মার্কিন ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে ডাও সূচক রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়। মঙ্গলবার এশিয়ার শেয়ারবাজার ও তেলের দামে সামান্য ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে।
হরমুজ নিয়ে বিরোধই মূল সংকট
আঞ্চলিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যপথ, জাহাজ চলাচল এবং জ্বালানি অবকাঠামোকে চাপের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর ব্যয় বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ওয়াশিংটনের দাবি, জুনে হওয়া সমঝোতা অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখার কথা ছিল। তবে তেহরানের বক্তব্য, সেই নথিতে প্রণালিতে নৌচলাচলের ওপর ইরানের কর্তৃত্ব বহাল রাখা হয়েছে।
এদিকে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ইরানের নেতৃত্বকে “অবিশ্বাস্যভাবে দ্বিমুখী” বলে আখ্যা দিয়ে দাবি করেন, তারা বৈঠকের অনুরোধ করেছে এবং খুব শিগগিরই আরও আলোচনা হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি পুনরায় দাবি করেন, হরমুজ প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে।
সংঘাত শুরুর পর থেকে সামরিক হুমকি ও কূটনৈতিক যোগাযোগের মধ্যে দোলাচল অব্যাহত থাকলেও, পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা, আঞ্চলিক সামরিক সক্ষমতা কমানো এবং সংঘাতের স্থায়ী সমাধানের মতো যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত লক্ষ্যগুলো এখনো অর্জিত হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার ঘটনায় বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















