অপরাধ দমনে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নম্বরপ্লেট শনাক্তকারী ক্যামেরা নেটওয়ার্ক যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু সেই প্রযুক্তিই এখন অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত প্রতিশোধ, হয়রানি ও গোপন নজরদারির হাতিয়ার হয়ে উঠছে। একাধিক তদন্তে উঠে এসেছে, কিছু অসাধু পুলিশ কর্মকর্তা সরকারি ক্ষমতা ব্যবহার করে সাবেক স্ত্রী, প্রেমিকা, পরিবারের সদস্য বা অন্য নারীদের চলাফেরা গোপনে অনুসরণ করেছেন। এতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সাবেক প্রেমিকের নজরদারিতে আতঙ্কিত এক নারী
জর্জিয়ার বাসিন্দা মার্সি বেকলির জীবনে এই প্রযুক্তির অপব্যবহারের প্রভাব ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। তিনি বুঝতে পারছিলেন না, কেন তার সাবেক প্রেমিক সব সময় জানতে পারছেন তিনি কোথায় যাচ্ছেন। বাজারে যাওয়া, চিকিৎসকের কাছে যাওয়া কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা—প্রায় প্রতিটি যাত্রার পরই তিনি বার্তা পেতেন।
প্রথমে তিনি মনে করেছিলেন কেউ হয়তো তাকে অনুসরণ করছে। বাড়ির চারপাশে নিরাপত্তা ক্যামেরা বসান, গোপন ক্যামেরা শনাক্ত করার যন্ত্র কেনেন, এমনকি নিজের গাড়িতে ট্র্যাকার বসানো হয়েছে কি না তা একাধিকবার পরীক্ষা করান। পরে জানতে পারেন, তার সাবেক প্রেমিক, যিনি একটি ছোট শহরের পুলিশপ্রধান ছিলেন, সরকারি ক্যামেরা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেই তার গাড়ির অবস্থান নিয়মিত খুঁজে দেখছিলেন।
তদন্তে দেখা যায়, তিনি প্রায় ৬০০ বার মার্সি ও তার কিশোরী মেয়ের গাড়ির তথ্য অনুসন্ধান করেছিলেন। পরে তার বিরুদ্ধে অনুসরণ, হয়রানি ও প্রযুক্তির অপব্যবহারের অভিযোগ আনা হলেও বিচার শুরুর আগেই তিনি মারা যান।
হাজার হাজার ক্যামেরার বিশাল নেটওয়ার্ক
যুক্তরাষ্ট্রে এই প্রযুক্তি পরিচালনাকারী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দেশজুড়ে লক্ষাধিক রাস্তার ক্যামেরা স্থাপন করেছে। এসব ক্যামেরা চলন্ত গাড়ির নম্বরপ্লেট পড়ে একটি বিশাল তথ্যভান্ডারে সংরক্ষণ করে। তদন্তের প্রয়োজনে পুলিশ কর্মকর্তারা সহজেই সেই তথ্য অনুসন্ধান করতে পারেন।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এই প্রযুক্তি অপহরণ, চুরি, পলাতক আসামি শনাক্তকরণসহ নানা ধরনের অপরাধ তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রতি মাসে শত শত কোটি নম্বরপ্লেটের তথ্য সংগ্রহ করা হয় এবং অসংখ্য অপরাধ তদন্তে এই তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।
অন্তত অর্ধশত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ
তদন্তে অন্তত ৫০ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে প্রযুক্তির অপব্যবহারের অভিযোগ বা মামলা পাওয়া গেছে। তাদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা ব্যক্তিগত সম্পর্কের মানুষদের নজরদারিতে রাখতে সরকারি ডাটাব্যবস্থা ব্যবহার করেছেন।
কেউ সাবেক স্ত্রীকে অনুসরণ করেছেন, কেউ সাবেক প্রেমিকার নতুন সঙ্গীকে খুঁজেছেন, আবার কেউ ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিরোধে প্রতিনিয়ত গাড়ির অবস্থান যাচাই করেছেন। কয়েকটি ঘটনায় এই নজরদারি পরবর্তীতে হুমকি, মানসিক নির্যাতন এমনকি সহিংসতার ঘটনায়ও রূপ নেয়।
ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার
কিছু ঘটনায় পুলিশ কর্মকর্তারা মানুষের অত্যন্ত ব্যক্তিগত তথ্য জানার চেষ্টা করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, একজন কর্মকর্তা তার সাবেক প্রেমিকা গর্ভপাত-সংক্রান্ত একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে গিয়েছিলেন কি না, সেটিও এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনুসন্ধান করেন। পরে সেই তথ্যকে কেন্দ্র করে তাকে মানসিক চাপ ও জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে হয়।
আরেকটি ঘটনায় এক কর্মকর্তা তার সাবেক সঙ্গী কোথায় জন্মদিন উদ্যাপন করছেন, সন্তানদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন—এসব তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করে তাকে বারবার বার্তা পাঠাতেন।

নজরদারির ভয়ে বদলে গেছে জীবন
এই ধরনের নজরদারির শিকার হওয়া অনেক নারী জানিয়েছেন, তারা দীর্ঘ সময় আতঙ্কে ছিলেন। কেউ নিজের গাড়ি ব্যবহার বন্ধ করে আত্মীয়ের গাড়ি ব্যবহার করেছেন, কেউ বাড়ি থেকে বের হওয়া কমিয়ে দিয়েছেন, আবার কেউ পুলিশকেই অভিযোগ জানাতে ভয় পেয়েছেন, কারণ অভিযুক্ত ব্যক্তিরাও ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা।
অনেকেই বলেছেন, তারা মনে করতেন প্রতিটি মুহূর্তে কেউ তাদের দেখছে। সেই ভয় তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন করে তোলে।
পর্যাপ্ত তদারকি নেই
সমালোচকদের মতে, প্রযুক্তিটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম না থাকায় অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। অনেক পুলিশ বিভাগে অনুসন্ধানের কারণ বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করার বাধ্যবাধকতা নেই। কোথাও কোথাও একটি মাত্র শব্দ লিখেই অনুসন্ধান সম্পন্ন করা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি অনুসন্ধানের সঙ্গে নির্দিষ্ট অপরাধ মামলার নম্বর বাধ্যতামূলক করা হলে অপব্যবহার অনেকটাই কমানো সম্ভব। এছাড়া নিয়মিত নিরীক্ষা, স্বাধীন তদারকি এবং কঠোর শাস্তির ব্যবস্থাও জরুরি।
প্রতিষ্ঠানের অবস্থান
প্রযুক্তি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, বিপুল সংখ্যক ব্যবহারকারীর মধ্যে খুব অল্পসংখ্যক ব্যক্তি এই অপব্যবহার করেছেন। তাদের দাবি, নতুন নিরীক্ষা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, যা সন্দেহজনক অনুসন্ধান শনাক্ত করতে সহায়তা করবে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী বলেন, প্রযুক্তি নিজে অপরাধ করে না; মানুষ ভুল সিদ্ধান্ত নেয়। তাই অপব্যবহারকারীদের শনাক্ত করে জবাবদিহির আওতায় আনাই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য।
প্রযুক্তির অগ্রগতি, নীতিমালার পিছিয়ে থাকা
বিশেষজ্ঞদের মতে, নজরদারি প্রযুক্তি অত্যন্ত দ্রুত উন্নত হলেও সেই গতিতে আইন ও নীতিমালা গড়ে ওঠেনি। যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারে একক জাতীয় আইন নেই। ফলে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও পুলিশ বিভাগ নিজেদের মতো নিয়ম তৈরি করছে, যা অনেক ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত নয়।
গোপনীয়তা রক্ষায় কাজ করা সংগঠনগুলোর দাবি, আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহার অব্যাহত রাখতে হলে তার সঙ্গে সমান গুরুত্বে নাগরিক অধিকার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় অপরাধ দমনের জন্য তৈরি প্রযুক্তিই সাধারণ মানুষের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার জন্য নতুন হুমকিতে পরিণত হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















