যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে স্থানীয় পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় সাম্প্রতিক সাইবার হামলা দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অন্তত সাতটি অঙ্গরাজ্যে এমন হামলার ঘটনা সামনে আসার পর ফেডারেল কর্তৃপক্ষ দ্রুত পানি সরবরাহ সংস্থাগুলোকে সতর্ক করেছে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছে।
নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে একাধিক পানি সরবরাহ সংস্থা
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই জানিয়েছে, হামলাকারীরা একাধিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থার পাসওয়ার্ড ও নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ সেটিংস পরিবর্তন করে দেয়। এর ফলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিজেদের যন্ত্রপাতির নিয়ন্ত্রণ হারায়। কোথাও কোথাও পানির চাপ কমে যায়, আবার কিছু স্থানে বন্যার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়। এতে অপরিশোধিত পানি সরবরাহ লাইনে প্রবেশের ঝুঁকি দেখা দেয়।
মার্কিন সাইবার নিরাপত্তা ও অবকাঠামো সংস্থা জানিয়েছে, কয়েকটি এলাকায় বাসিন্দাদের পানি ফুটিয়ে ব্যবহারের নির্দেশনা দিতে হয়েছে। পাশাপাশি অনেক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির পরিবর্তে হাতে পরিচালনা করতে হয়েছে।
হামলার পেছনে কারা?
ফেডারেল কর্তৃপক্ষ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে হামলার জন্য কোনো দেশ বা গোষ্ঠীকে দায়ী করেনি। তবে ঘটনাগুলোর ধরন দেখে অনেক বিশেষজ্ঞের ধারণা, এর সঙ্গে ইরানের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে।
মিনেসোটা ও মিশিগান অঙ্গরাজ্যের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন যে তাদের কয়েকটি পানি সরবরাহ ব্যবস্থা এই হামলার শিকার হয়েছে। এর আগে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সতর্ক করেছিল, ইন্টারনেট-সংযুক্ত শিল্প নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে ইরান-সমর্থিত হ্যাকারদের তৎপরতা বেড়েছে।
রাজনৈতিক বিতর্কে আড়াল হচ্ছে মূল সংকট
ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দেখা গেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করার দাবিকে খারিজ করে মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের প্রশাসনের সমালোচনা করেন। অন্যদিকে মিনেসোটার গভর্নর টিম ওয়ালজ ট্রাম্পের বক্তব্যের জবাবে ইরান-সংক্রান্ত নীতির সমালোচনা করেন।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক বিতর্কের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো দেশের পানি সরবরাহ ব্যবস্থার প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
পুরোনো অবকাঠামো, সীমিত সক্ষমতা
যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় এক লাখ ৭০ হাজার পানি ও বর্জ্যপানি ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র রয়েছে। এগুলোর অনেকই এখন স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। তবে ছোট শহর ও স্থানীয় পর্যায়ের বহু সংস্থার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সীমিত। পুরোনো যন্ত্রপাতি ও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার কারণে সেগুলো সাইবার হামলার ঝুঁকিতে বেশি থাকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের পানি সরবরাহ ব্যবস্থা বিস্তৃত হওয়ায় একটি হামলায় পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা কম। কিন্তু ছোট ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থাই বড় উদ্বেগের কারণ।
আরও শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তার আহ্বান
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি জবাবদিহি সংস্থা ২০২৪ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে পানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়নের সুপারিশ করেছিল। পরে পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা ঝুঁকি মূল্যায়নের একটি পরিকল্পনা তৈরি করলেও বেশির ভাগ উদ্যোগই এখনো স্বেচ্ছাভিত্তিক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো অত্যন্ত সাধারণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাও অনুসরণ করে না। যেমন—কারখানা বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ডিফল্ট পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করা, নিয়মিত সফটওয়্যার হালনাগাদ রাখা কিংবা অপারেটিং সিস্টেম আপডেট করা। এসব মৌলিক পদক্ষেপ নিলেও অনেক হামলা ঠেকানো সম্ভব।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে সাইবার হামলার সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে। তাই পানি, বিদ্যুৎসহ গুরুত্বপূর্ণ জনসেবামূলক অবকাঠামোর সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার বিকল্প নেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















