ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা “এখনই চলছে”। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের কোনো সরাসরি আলোচনা হচ্ছে না।
এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের কারণে ছয় মাস ধরে চলা ইরান যুদ্ধের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ থামার কোনো সুস্পষ্ট পথ এখনো দেখা যাচ্ছে না, আবার দুই পক্ষের মধ্যে গোপন যোগাযোগের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ট্রাম্পের দাবি, ইরান আলোচনার জন্য আগ্রহী
সোমবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ আলোচনার জন্য আগ্রহ দেখিয়েছে। তার দাবি, সম্ভাব্য বড় ধরনের মার্কিন হামলা তিনি সাময়িকভাবে থামিয়েছেন, কারণ তিনি ইরানকে “শেষ সুযোগ” দিতে চান।
ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি আক্রমণের প্রস্তুতি নিয়েছিল যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে কঠিন হামলাগুলোর একটি হতে পারত। তবে তিনি জানান, কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ দিতে তিনি অপেক্ষা করছেন।
এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প ইরানের নেতৃত্বকে “অবিশ্বাস্যভাবে দ্বিমুখী” বলে সমালোচনা করেন। তার অভিযোগ, ইরান একদিকে আলোচনার কথা বলছে, অন্যদিকে প্রকাশ্যে তা অস্বীকার করছে।

ইরানের বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা নেই
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সোমবার তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বর্তমানে কোনো আলোচনা চলছে না।
তিনি জানান, ইরান শুধু ওমানের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। মূল বিষয় হলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ করা।
বাঘাই বলেন, হরমুজ প্রণালির সংকট ইরান ও ওমানের বিরোধের কারণে তৈরি হয়নি। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পর থেকেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে শুরু সংঘাত
যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা। কিন্তু সংঘাত শুরু হওয়ার পর কয়েক দিনের মধ্যেই হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়।
পারস্য উপসাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি সরবরাহ পরিবহন করা হয়। ইরান জাহাজ চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে, কর আরোপের কথা জানায় এবং কিছু এলাকায় সামরিক তৎপরতা বাড়ায়।
এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দর অবরোধ করে এবং হরমুজ প্রণালির আশপাশে সামরিক অভিযান চালায়। এরপর ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি থাকা দেশগুলোর দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।
ব্যর্থ সমঝোতা ও নতুন উত্তেজনা
জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার পর এপ্রিল মাসে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত সেই আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে নেতৃত্ব দেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।
তবে সেখানে কোনো সমাধান হয়নি। পরে কয়েক দফা নিম্নপর্যায়ের আলোচনার পর জুনে একটি সমঝোতা স্মারক তৈরি হয়। এতে মার্কিন অবরোধ কিছুটা শিথিল করা, ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা কমানো এবং হরমুজ প্রণালি পরিচালনায় ইরান ও ওমানের যৌথ উদ্যোগের কথা বলা হয়েছিল।
কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেই সমঝোতা ভেঙে পড়ে। হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার বিষয়ে ইরানের অবস্থানের কারণে যুক্তরাষ্ট্র আবার অবরোধ জোরদার করে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো শান্তির উদ্যোগে
বর্তমানে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারসহ কয়েকটি আরব দেশ যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে। কারণ দীর্ঘ সংঘাত তাদের অর্থনীতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ইরানও এসব দেশের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে বলে জানা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরান খুব দ্রুত তার অবস্থান পরিবর্তন করবে বা সামরিকভাবে পরাজিত হবে—এমন সম্ভাবনা কম।

ওমানের মধ্যস্থতায় নতুন সম্ভাবনা
ওমান হরমুজ প্রণালি পুনরায় স্বাভাবিক করার জন্য একটি প্রস্তাব দিয়েছে। এতে জাহাজ চলাচলের পথ দুই দেশের উপকূল বরাবর সমান ভাগে ভাগ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া নৌপথের রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন দেশ, প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার স্বেচ্ছা অর্থায়নের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের ব্যবস্থা ইরানকে মুখ রক্ষা করে আগের অবস্থান থেকে সরে আসার সুযোগ দিতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনো স্পষ্ট করে বলছে, হরমুজ প্রণালির ওপর একতরফা নিয়ন্ত্রণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।
যুদ্ধের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই দুই পক্ষের বক্তব্যে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে। হামলার ক্ষয়ক্ষতি, আলোচনার অগ্রগতি কিংবা যুদ্ধবিরতি—সব বিষয়েই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিবরণ একে অপরের বিপরীত।
এদিকে দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। রিপাবলিকান দলের অনেক নেতা ও ভোটার এখন যুদ্ধের কারণ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
শান্তি আলোচনা সত্যিই শুরু হয়েছে, নাকি এটি কেবল কূটনৈতিক চাপ তৈরির অংশ—তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে হরমুজ প্রণালি ও পারমাণবিক ইস্যু ঘিরে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা আগামী দিনগুলোতেও বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম বড় সংকট হয়ে থাকবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















