গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে ইবোলা ভাইরাসের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব নতুন এক মানবিক সংকট তৈরি করেছে। রোগের আতঙ্কে অনেক গর্ভবতী নারী হাসপাতালে যেতে ভয় পাচ্ছেন, ফলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে বাড়ছে প্রসবকালীন মৃত্যুর সংখ্যা।
দেশটির ইতুরি প্রদেশে ইবোলা ছড়িয়ে পড়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই মাতৃমৃত্যুর হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসের শেষ দিক থেকে জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে ওই অঞ্চলে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যাওয়া নারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ইবোলা ভয়ে চিকিৎসা থেকে দূরে নারীরা
ইতুরি প্রদেশের রাজধানী বুনিয়ায় বসবাসকারী ২৬ বছর বয়সী এসথার লুতুলা চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা। ইবোলা ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি নিয়মিত গর্ভকালীন পরীক্ষা করানো বন্ধ করে দিয়েছেন।
তার ভয়, সামান্য জ্বর হলেও হাসপাতালে গেলে তাকে ইবোলা রোগী সন্দেহে আলাদা করে রাখা হতে পারে। এই ভুল ধারণাই তাকে চিকিৎসা নেওয়া থেকে দূরে রেখেছে।

এসথারের মতো অনেক নারী মনে করছেন, হাসপাতালে গেলে তারা হয়তো রোগী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকতে বাধ্য হবেন। ফলে তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাড়িতেই থাকার চেষ্টা করছেন।
প্রতি সপ্তাহে বাড়ছে প্রসবজনিত মৃত্যু
জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, ইবোলা প্রাদুর্ভাবের আগে ইতুরি প্রদেশে প্রতি সপ্তাহে গড়ে ৩ জনের কিছু বেশি নারী প্রসবজনিত জটিলতায় মারা যেতেন। কিন্তু ইবোলা ছড়িয়ে পড়ার পর এই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৬ জনে পৌঁছেছে।
একই সময়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বাইরে মৃত্যুর হারও বেড়েছে। আগে যেখানে প্রসবজনিত মৃত্যুর প্রায় ৯ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বাইরে ঘটত, এখন তা বেড়ে ১৭ শতাংশের বেশি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক নারী ইবোলায় আক্রান্ত না হয়েও শুধু চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে প্রাণ হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছেন।
গুজব ও ভয় স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে দুর্বল করছে
ইবোলা নিয়ে নানা গুজব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অনেক মানুষ এখনো বিশ্বাস করেন না যে রোগটি সত্যিই রয়েছে। আবার অনেকে মনে করেন, হাসপাতালে গেলে সবাইকে জোর করে আলাদা করে রাখা হবে।

বুনিয়ার বেনেডিক্ট ক্লিনিকে আগে প্রতি মাসে প্রায় ৬০ জন নারী গর্ভকালীন চিকিৎসার জন্য আসতেন। কিন্তু বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে মাত্র ১০ জনের কাছাকাছি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ক্লিনিটির পরিচালক সনি মওয়েম্বো।
স্বাস্থ্যকর্মীরা বলছেন, ইবোলা মোকাবিলায় কাজ করতে গিয়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থার স্বাভাবিক সেবাও ব্যাহত হচ্ছে। আক্রান্ত এলাকাগুলোর হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক, ওষুধ ও সরঞ্জামের সংকট তৈরি হয়েছে।
চিকিৎসাকর্মীদের ওপর হামলা, বাড়ছে সংকট
ইবোলা মোকাবিলায় নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মীরাও বড় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। এ পর্যন্ত অন্তত ৪৪ জন স্বাস্থ্যকর্মী সংক্রমিত হয়ে মারা গেছেন। পাশাপাশি বেতন না পাওয়া ও কঠিন পরিস্থিতির কারণে অনেক কর্মী কাজ ছেড়ে দিয়েছেন।
ইবোলা চিকিৎসাকেন্দ্র ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপরও হামলার ঘটনা ঘটেছে। ভুল তথ্য ও ক্ষোভ থেকে এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকটি হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো।

গর্ভবতী নারীদের জন্য বাড়তি ঝুঁকি
ইবোলা একটি বিরল কিন্তু অত্যন্ত সংক্রামক ও প্রাণঘাতী রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত, শরীরের তরল, দূষিত কাপড় বা ব্যবহৃত সামগ্রীর সংস্পর্শে এটি ছড়াতে পারে।
গর্ভবতী নারীরা ইবোলায় আক্রান্ত হলে গর্ভপাতসহ নানা জটিলতার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তবে স্বাস্থ্যকর্মীদের আশঙ্কা, অনেক নারী ইবোলায় আক্রান্ত না হয়েও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে মারা যেতে পারেন।
জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের কর্মকর্তা নোয়েমি ডালমন্তে বলেন, সবচেয়ে বড় বিপদ হলো—অনেক নারী এমন চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা তাদের জীবন বাঁচাতে পারত।
কঙ্গোতে ইবোলার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পাশাপাশি এখন আরেকটি লড়াই শুরু হয়েছে—মানুষের ভয়, গুজব ও অবিশ্বাস দূর করে তাদের আবার স্বাস্থ্যসেবার আওতায় ফিরিয়ে আনার।


সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















