ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তার গুরুত্বপূর্ণ দূরপাল্লার নির্ভুল আঘাতকারী ক্ষেপণাস্ত্রের বড় অংশ ব্যবহার করে ফেলেছে বলে জানা গেছে। এতে ভবিষ্যতে অন্য কোনো বড় সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি কতটা শক্তিশালী থাকবে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ব্যবস্থা—এটিএসিএএমএস এবং প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল—এর মজুত প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিষয়টি সম্পর্কে জানেন এমন কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর প্রায় সবই ইরান যুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে।
কয়েক মাসের যুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারে চাপ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ পাঁচ মাস ধরে চলার পর এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দীর্ঘপাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
এসব অস্ত্রের মাধ্যমে নিরাপদ দূরত্ব থেকে শত্রুর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অত্যন্ত নির্ভুলভাবে হামলা চালানো যায়। প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্রের দাম ১০ লাখ ডলারের বেশি।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, চীন বা রাশিয়ার মতো শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অধিকারী কোনো দেশের সঙ্গে সংঘাত হলে এই ধরনের অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতেও চাপ
শুধু স্থলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র নয়, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ব্যবহৃত টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতেও বড় ধরনের চাপ পড়েছে বলে জানা গেছে।
একজন সূত্রের দাবি, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র তার বৈশ্বিক টমাহক মজুতের প্রায় অর্ধেক ব্যবহার করেছে। তবে এই তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।
টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র সাধারণত যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন থেকে ছোড়া হয় এবং শত্রুর শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে হামলা চালানোর ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবে পরিচিত।
ভবিষ্যৎ সংঘাত নিয়ে সামরিক মহলে উদ্বেগ
কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে গেলে যুক্তরাষ্ট্র একই সময়ে একাধিক সংকট মোকাবিলায় সমস্যায় পড়তে পারে। বিশেষ করে রাশিয়া বা চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের বিরুদ্ধে সামরিক প্রস্তুতি ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি অস্ত্র রয়েছে এবং প্রয়োজনের তুলনায়ও মজুত যথেষ্ট।
তিনি আরও দাবি করেছেন, মার্কিন প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলো আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি অস্ত্র তৈরি করছে এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে।

প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রেও কমেছে মজুত
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আক্রমণাত্মক অস্ত্র নয়, প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার ওপরও যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে।
মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিএসআইএসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ চলাকালে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রায় ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যবহার হয়ে থাকতে পারে। একই সময়ে থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থার মজুতও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
প্যাট্রিয়ট ও থাড ব্যবস্থা শত্রুর ছোড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত ও ধ্বংস করতে ব্যবহৃত হয় এবং এগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির মধ্যে অন্যতম।
অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা
মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্প এখন দ্রুত অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো নতুন চুক্তির মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের সতর্কতা, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চললে বর্তমান উৎপাদন হারও প্রয়োজনীয় মজুত পূরণ করতে যথেষ্ট নাও হতে পারে।
ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিচালনার প্রস্তুতি নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















