ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি ফেসবুক রিল সাময়িকভাবে সরিয়ে দেওয়াকে ঘিরে মেটার বিরুদ্ধে চাপ আরও বাড়িয়েছে দেশটির সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। কমিটির চেয়ারম্যান নিশিকান্ত দুবে জানিয়েছেন, মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গকে তিন দিনের মধ্যে ক্ষমা চাইতে হবে। তা না হলে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের অধীনে মেটা যে ‘সেফ হারবার’ সুরক্ষা পায়, তা প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হবে।
সংসদের যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক স্থায়ী কমিটি ইতোমধ্যে ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে এ বিষয়ে লিখিতভাবে তাদের অবস্থান জানিয়েছে। সপ্তাহের শুরুতে মেটাসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পর এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
প্রকাশক নাকি মধ্যস্থতাকারী?
নিশিকান্ত দুবের দাবি, প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা একটি নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁর ভাষায়, এ ধরনের পদক্ষেপ প্রকাশকের আচরণের সঙ্গে বেশি সঙ্গতিপূর্ণ। সে কারণেই মার্ক জাকারবার্গের প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া উচিত বলে মনে করছে সংসদীয় কমিটি।

কমিটির মতে, যদি মেটা ব্যবহারকারীদের কনটেন্ট নিয়ে এমনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তারা কেবল প্রযুক্তিগত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নিজেদের অবস্থান দাবি করতে পারে না। এই যুক্তির ভিত্তিতেই ‘সেফ হারবার’ সুবিধা প্রত্যাহারের প্রসঙ্গ সামনে আনা হয়েছে।
কীভাবে শুরু হয় বিতর্ক
বিতর্কের সূত্রপাত ২৩ জুলাই প্রকাশিত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি ফেসবুক রিলকে ঘিরে। ওই ভিডিওতে তিনি নিট-ইউজি প্রশ্নপত্র ফাঁসকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে হওয়া বিক্ষোভ নিয়ে বক্তব্য দেন এবং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন ও প্রশ্নফাঁসকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির জন্য নতুন আইন আনার প্রস্তাব তুলে ধরেন।
২৮ জুলাই ভিডিওটি প্রায় পাঁচ ঘণ্টার জন্য ফেসবুকে দেখা যায়নি। পরে সেটি আবার প্ল্যাটফর্মে ফিরিয়ে আনা হয়। এই সাময়িক অপসারণই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্কের জন্ম দেয়।
মেটার ব্যাখ্যা
সংসদীয় কমিটির বৈঠকে উপস্থিত একটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মেটার এক কর্মকর্তা ঘটনাটির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং জানান, এটি অ্যালগরিদমজনিত একটি ত্রুটির কারণে ঘটেছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যেন এমন ঘটনা আর না ঘটে, সে জন্য প্রতিষ্ঠানের সিস্টেমে পরিবর্তন আনার আশ্বাসও দেওয়া হয়।

এদিকে বিষয়টি নিয়ে ভারত সরকারেরও নজরদারি বাড়ছে। মেটার বৈশ্বিক পর্যায়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে শুধু প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও অপসারণ নয়, ভারতীয় আইন মেনে চলা, শিশুদের যৌন নির্যাতনসংক্রান্ত অনলাইন কনটেন্ট, কৃত্রিমভাবে তৈরি ডিজিটাল কনটেন্ট এবং যাচাইকৃত অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা নিয়েও আলোচনা হবে।
‘সেফ হারবার’ নিয়ে আইনি প্রশ্ন
নিশিকান্ত দুবে একাধিকবার বলেছেন, ক্ষমা না চাইলে মেটা তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৭৯ ধারার অধীনে পাওয়া ‘সেফ হারবার’ সুরক্ষা হারাতে পারে। এই বিধান অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী ব্যবহারকারীদের প্রকাশিত তৃতীয় পক্ষের কনটেন্টের জন্য সরাসরি আইনি দায় থেকে সুরক্ষা পায়।
তবে আইন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের মতে, ‘সেফ হারবার’ একটি আইনগত সুরক্ষা। এটি কার্যকর থাকবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত আদালত সংশ্লিষ্ট আইন মেনে চলার বিষয়টি বিবেচনা করেই নেবে। শুধু নির্বাহী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তা প্রত্যাহার করা যায় কি না, সে প্রশ্নও রয়েছে।
এদিকে এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হলেও মেটা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















