যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আটককেন্দ্রগুলোতে অনশনরত অভিবাসীদের জোরপূর্বক খাবার খাওয়ানোর অভিযোগ ঘিরে নতুন করে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। একাধিক ঘটনার তথ্য সামনে আসার পর মানবাধিকারকর্মী ও চিকিৎসকদের একাংশ বলছেন, এই ধরনের প্রক্রিয়া মানবিক মর্যাদার পরিপন্থী এবং কিছু ক্ষেত্রে তা নির্যাতনের পর্যায়েও পড়তে পারে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, আটক ব্যক্তিদের জীবন রক্ষা ও চিকিৎসা নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য।
দীর্ঘ মাস ধরে জোর করে খাবার দেওয়ার অভিযোগ
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, একজন আফগান নাগরিক অভিবাসন আটককেন্দ্রে অনশন শুরু করার পর প্রায় ছয় মাস ধরে তাকে নাক দিয়ে নল প্রবেশ করিয়ে তরল পুষ্টিকর খাবার দেওয়া হয়। আদালতের অনুমতির ভিত্তিতে এই চিকিৎসা প্রক্রিয়া চালানো হয় বলে জানা গেছে।
চিকিৎসা নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, দীর্ঘ অনশনের কারণে ওই ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং একসময় তাকে হুইলচেয়ার ব্যবহার করতে হয়। তবুও তিনি অনশন চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। পরে এক পর্যায়ে অনশন শেষ হওয়ায় আদালতে চলা প্রক্রিয়াও বন্ধ হয়ে যায়।
আদালতের নির্দেশে দ্রুত শুরু হয় প্রক্রিয়া

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোনো আটক ব্যক্তি দীর্ঘ সময় অনশন চালিয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জরুরি ভিত্তিতে ফেডারেল আদালতের কাছে অনুমতি চায়। আদালতের আদেশ পাওয়ার পর নিরাপত্তারক্ষীরা ওই ব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রেখে চিকিৎসাকর্মীরা নাক দিয়ে একটি নল পাকস্থলী পর্যন্ত প্রবেশ করিয়ে তরল খাদ্য সরবরাহ করেন।
সমালোচকদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রেই আদালতের এসব কার্যক্রম অত্যন্ত দ্রুত সম্পন্ন হয় এবং অধিকাংশ নথি গোপন থাকায় পুরো প্রক্রিয়া জনসমক্ষে আসে না। অনেক আটক ব্যক্তির আইনজীবীও থাকেন না, ফলে তারা নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ
আরেকটি ঘটনায় একজন ইউক্রেনীয় নাগরিক, যিনি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছিলেন, আটক অবস্থায় অনশন শুরু করেন। তার আইনজীবীর দাবি, প্রয়োজনীয় ওষুধ না পাওয়ায় তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থা দ্রুত অবনতি ঘটে।
কর্তৃপক্ষ তাকে জোর করে খাবার দেওয়ার জন্য আদালতের অনুমতি চাইলে আইনজীবী বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করেন। পরে তাকে হাসপাতালে পাঠিয়ে স্বাধীন চিকিৎসা মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেই অনশন ভেঙে খাবার গ্রহণ শুরু করলে জোরপূর্বক খাবার দেওয়ার প্রক্রিয়া আর এগোয়নি।
আইনজীবী না থাকলে বাড়ছে ঝুঁকি

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পর্যালোচিত বেশিরভাগ ঘটনায় আটক ব্যক্তিদের পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। এমনই এক ঘটনায় সৌদি আরবের এক নারী দীর্ঘ অনশনের কারণে একাধিকবার হাসপাতালে ভর্তি হন। তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় কর্তৃপক্ষ আদালতের কাছে জোর করে খাবার দেওয়ার অনুমতি চাইলেও শুনানির আগেই তিনি অনশন ভেঙে ফেলেন।
তবে ওই নারী এখনও আটক রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনের উদ্বেগ
মানবাধিকার সংগঠন ও একাধিক চিকিৎসক মনে করছেন, অনশন সাধারণত চরম হতাশা বা প্রতিবাদের একটি উপায়। তাদের মতে, জোরপূর্বক খাবার দেওয়ার পরিবর্তে অনশনের কারণ দূর করার উদ্যোগ নেওয়া বেশি মানবিক।
কিছু চিকিৎসকের বক্তব্য, জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতিতে নাক দিয়ে নল প্রবেশ করিয়ে খাবার দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। তবে মাসের পর মাস একই পদ্ধতি প্রয়োগ করা শারীরিক ও মানসিকভাবে অত্যন্ত কষ্টকর হতে পারে এবং এ নিয়ে স্বাধীন পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।
কর্তৃপক্ষের অবস্থান
আটককেন্দ্র পরিচালনায় যুক্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের কাছে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, সুস্থতা ও মর্যাদা রক্ষা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ক্ষুধার্ত অবস্থায় থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে নির্ধারিত চিকিৎসা নির্দেশিকা অনুসরণ করা হয় এবং প্রয়োজনে আদালতের অনুমতি নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।
এদিকে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর কাছে পাঠানো প্রশ্নের জবাব প্রতিবেদনে প্রকাশের সময় পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
বাড়ছে বিতর্ক
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান মেয়াদে অভিবাসন আটককেন্দ্রে আটক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনশন এবং তার জবাবে জোরপূর্বক চিকিৎসা প্রয়োগের ঘটনাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো আরও স্বচ্ছতা, স্বাধীন নজরদারি এবং আটক ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের সব পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য আটক ব্যক্তিদের জীবন রক্ষা এবং চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা।
অভিবাসন নীতি, মানবাধিকার এবং চিকিৎসা নীতিশাস্ত্র—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে সামনে এনে বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















