গাজার মধ্যাঞ্চলে হৃদয়বিদারক এক গণশেষকৃত্যে অংশ নিয়েছেন শত শত মানুষ। প্রায় তিন বছর আগে এক ভয়াবহ বিমান হামলায় নিহত ১১২ জনের মরদেহ উদ্ধার হওয়ার পর মঙ্গলবার তাদের একসঙ্গে দাফন করা হয়। নিহতদের মধ্যে অন্তত ৪০ জনই ছিল শিশু। দীর্ঘদিন ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকায় এতদিন তাদের মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ শহরে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয় এক শতাধিক কফিন। প্রতিটি কফিনে মোড়ানো ছিল ফিলিস্তিনের পতাকা। স্বজনরা শেষবারের মতো প্রার্থনা করেন। এরপর ধ্বংসস্তূপে ঘেরা রাস্তায় শোকমিছিল নিয়ে মরদেহগুলো কাছের একটি কবরস্থানে দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। চারদিকে ছিল কান্না আর স্বজন হারানোর বেদনা।
২০২৩ সালের সেই ভয়াবহ হামলা
২০২৩ সালের ২২ নভেম্বর গাজা সিটির একটি আবাসিক এলাকায় ব্যাপক বিমান হামলা চালানো হয়। ওই হামলায় একসঙ্গে তিন শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছিলেন বলে জানানো হয়। হামলার পরপরই স্থানীয় মানুষ হাতে থাকা সামান্য সরঞ্জাম দিয়ে ধ্বংসস্তূপ খুঁড়ে প্রায় ৪০টি মরদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হন। কিন্তু বাকি বহু মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচেই চাপা পড়ে ছিলেন।
পরবর্তী সময়ে এলাকাজুড়ে চলমান হামলা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে উদ্ধারকাজ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বহু পরিবার বছরের পর বছর তাদের স্বজনদের ভাগ্য জানতে পারেনি।
যুদ্ধবিরতির পর আবার শুরু উদ্ধারকাজ
গত বছরের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর কিছু এলাকায় উদ্ধারকর্মীরা আবার ধ্বংসস্তূপ সরানোর সুযোগ পান। যদিও বিচ্ছিন্ন হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, তবুও সাম্প্রতিক উদ্ধার অভিযানে ওই আবাসিক ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে আরও ১১২ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
স্থানীয় উদ্ধার কর্তৃপক্ষের দাবি, ওই হামলার ঘটনায় এখনো অন্তত ১৫৭ জন নিখোঁজ রয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, তাদের অনেকেই এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন।
হাজারো মানুষ এখনো নিখোঁজ

গাজার স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন এলাকায় ধসে পড়া ভবনের নিচে এখনো হাজারো মানুষের মরদেহ চাপা পড়ে থাকতে পারে। স্বজনদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অন্তত ৭ হাজার ৪০০ জনকে এখনো নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ, অনেক হামলায় একই পরিবারের সবাই নিহত হওয়ায় নিখোঁজের তথ্য জানানোর মতোও কেউ বেঁচে নেই।
আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্ক আরও তীব্র
গাজায় চলমান সামরিক অভিযানের বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিশন, মানবাধিকারভিত্তিক কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বিভিন্ন পর্যবেক্ষক সংস্থা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ তুলেছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘের তদন্ত কমিশন বলেছে, গাজায় বেসামরিক মানুষ, বিশেষ করে শিশুদের ওপর হামলার বিষয়ে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তবে ইসরায়েল এসব অভিযোগ ধারাবাহিকভাবে অস্বীকার করে আসছে।
যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও সহিংসতা অব্যাহত
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও গাজায় সহিংসতা পুরোপুরি থামেনি। সাম্প্রতিক দিনগুলোতেও নতুন হামলায় বহু মানুষের প্রাণহানির খবর এসেছে। একই সময়ে যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা এগোলেও তা এখনো অচলাবস্থায় রয়েছে।
ফিলিস্তিনি পক্ষ বলছে, গাজা থেকে ইসরায়েলি বাহিনী সম্পূর্ণ প্রত্যাহার না হলে নিরস্ত্রীকরণের প্রশ্নে কোনো অগ্রগতি সম্ভব নয়। অন্যদিকে ইসরায়েল নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কথা তুলে বর্তমান প্রস্তাব নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে।
ধ্বংসস্তূপে পরিণত গাজা
প্রায় তিন বছরের যুদ্ধ গাজার বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। অধিকাংশ মানুষ নিজেদের বাড়িঘর হারিয়ে অস্থায়ী তাঁবুশিবিরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসা ও নিরাপদ আশ্রয়ের সংকট এখনো তীব্র। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা হাজারো মানুষের মরদেহ উদ্ধারের অপেক্ষায় অসংখ্য পরিবার এখনো স্বজনদের শেষ বিদায় জানানোর সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে।
গাজায় মঙ্গলবারের এই গণশেষকৃত্য শুধু ১১২ জন মানুষের দাফন নয়, বরং দীর্ঘদিনের অপেক্ষা, বেদনা ও যুদ্ধের নির্মম মানবিক মূল্যকে আবারও বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















