ব্রিটেনের ডানপন্থী রাজনীতিতে সাম্প্রতিক বিভাজন কেবল কে বেশি জনপ্রিয় বা কে বেশি কট্টর—তার প্রতিযোগিতা নয়। এর গভীরে রয়েছে আরও মৌলিক একটি প্রশ্ন: ব্রিটিশ হওয়ার অর্থ কী? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে রিফর্ম ইউকের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে আসা রিস্টোর পার্টির কিছু বক্তব্য যে জায়গায় পৌঁছেছে, তা ব্রিটিশ পরিচয়ের ঐতিহাসিক ধারণার সঙ্গেই সাংঘর্ষিক।
রিস্টোরের নেতা রুপার্ট লোয়ের বক্তব্য, যুক্তরাজ্যে এমন এক সময় আসবে যখন ‘শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ’রা সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকবে না। তাঁর সংজ্ঞায়, দুই বাবা-মা যুক্তরাজ্যে জন্মেছেন—এমন মানুষই প্রকৃত শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ। অন্যদিকে দলটির প্রচার পরিচালক ও সহপ্রতিষ্ঠাতা চার্লি ডাউনস মুসলিমদের তুলনায় খ্রিস্টানদের বেশি ব্রিটিশ বলে বিবেচনা করার যুক্তি দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের ভিত্তি হলো, ব্রিটেন সাংবিধানিকভাবে একটি খ্রিস্টান দেশ এবং খ্রিস্টান ধর্ম ব্রিটিশ জনগণের পরিচয় ও সংস্কৃতির কেন্দ্রে রয়েছে।
এই অবস্থানকে শুধু কড়া ডানপন্থী মতাদর্শ বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। কারণ এখানে নাগরিকত্ব, জাতিগত পরিচয় এবং ব্রিটিশ জাতীয় পরিচয়—তিনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়কে ইচ্ছাকৃতভাবে এক করে ফেলা হচ্ছে।
ব্রিটিশ হওয়া কি রক্তের পরিচয়?
রিস্টোরের বক্তব্যের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, ত্বকের রংকে জাতিগত পরিচয়ের সমার্থক ধরে নেওয়া। কিন্তু জাতিগত পরিচয় কেবল চেহারা কিংবা বংশগত বৈশিষ্ট্যের বিষয় নয়। ভাষা, ইতিহাস, সংস্কৃতি, সামাজিক অভিজ্ঞতা এবং পূর্বপুরুষের উত্তরাধিকার মিলেই একটি জনগোষ্ঠীর জাতিগত পরিচয় গড়ে ওঠে। আর ত্বকের রং মূলত ভূগোল ও বংশগত বৈচিত্র্যের ফল।

ইতিহাসের দীর্ঘ সময়ে ব্রিটেনের অধিকাংশ মানুষ সাদা চামড়ার ছিলেন—এটি সত্য হতে পারে। কিন্তু সেখান থেকে এই সিদ্ধান্তে যাওয়া যায় না যে ব্রিটিশ পরিচয়ের ভিত্তিই ছিল শ্বেতাঙ্গত্ব। ব্রিটিশ পরিচয় মূলত একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক নির্মাণ। দ্বীপভিত্তিক সমাজের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, ধর্মীয় ঐতিহ্য, প্রতিষ্ঠান, আইন এবং দীর্ঘ সামাজিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এই পরিচয় তৈরি হয়েছে।
ব্রিটেন কখনোই একক জাতিগত জনগোষ্ঠীর সরল রাষ্ট্র ছিল না। ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস এবং আংশিকভাবে আয়ারল্যান্ড—প্রতিটি ভূখণ্ডের নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয় রয়েছে। একই সঙ্গে তাদের মধ্যে একটি বৃহত্তর ব্রিটিশ পরিচয়ও বিকশিত হয়েছে।
এই বহুত্বই ব্রিটিশ পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। ইতিহাসবিদ জোনাথন ক্লার্ক ব্রিটেনকে বিভিন্ন পরিচয়ের একটি ‘বৈচিত্র্যময় ও বহুত্ববাদী ব্যবস্থা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ ব্রিটিশত্বের শক্তি ছিল অভিন্ন চেহারা তৈরি করার মধ্যে নয়; বরং পার্থক্যের মধ্যেও একটি রাজনৈতিক ও জাতীয় বন্ধন গড়ে তোলার সক্ষমতায়।
খ্রিস্টান না হলে কি ব্রিটিশ নন?
ব্রিটেনের ইতিহাসে খ্রিস্টধর্মের ভূমিকা অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। সপ্তম শতাব্দী থেকে খ্রিস্টীয় ধর্ম ও প্রতিষ্ঠান ব্রিটিশ সমাজের বিকাশে গভীর প্রভাব রেখেছে। দেশটির আইন, নৈতিক ধারণা, সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং ঐতিহাসিক সংস্কৃতির বহু স্তর খ্রিস্টীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।
কিন্তু ইতিহাসে খ্রিস্টধর্মের প্রভাব থাকা আর রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ার শর্ত হিসেবে খ্রিস্টান পরিচয় দাবি করা এক বিষয় নয়।
২০২১ সালের জনগণনা এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে আনে। প্রায় ২ কোটি ৭ লাখ মানুষ জানিয়েছেন, তারা কোনো ধর্ম অনুসরণ করেন না। আর খ্রিস্টান হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিয়েছেন মোট জনসংখ্যার ৪৬ শতাংশ। তাহলে ব্রিটিশত্বকে যদি খ্রিস্টান পরিচয়ের সঙ্গে এক করে দেখা হয়, সেই যুক্তির শেষ পরিণতি দাঁড়ায়—দেশটির অর্ধেকেরও বেশি মানুষকে কোনো না কোনোভাবে কম ব্রিটিশ হিসেবে বিবেচনা করা।
এটি শুধু রাজনৈতিকভাবে বিভাজনমূলক নয়; যুক্তির দিক থেকেও অসঙ্গত।
একজন হিন্দু, শিখ, ইহুদি বা মুসলিম নাগরিক ব্রিটিশ নাগরিকত্ব অর্জনের পর অন্য নাগরিকের তুলনায় কম ব্রিটিশ হয়ে যান না। একইভাবে ধর্মহীন একজন নাগরিকও রাষ্ট্রের বাইরে চলে যান না।
ব্রিটেনের আসল শক্তি কোথায়
ব্রিটেন ও পশ্চিমা সমাজের মূল্যবোধের শিকড় নিয়ে অবশ্যই বিতর্ক হতে পারে। বাইবেলীয় ঐতিহ্য, খ্রিস্টীয় নৈতিকতা, আলোকায়ন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান—সবকিছুর অবদান নিয়ে নতুন করে আলোচনা প্রয়োজন হতে পারে। একটি সমাজ তার ঐতিহাসিক ভিত্তি ভুলে গেলে তার সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা দুর্বল হতে পারে—এই আশঙ্কা অমূলক নয়।
কিন্তু এই ঐতিহ্য রক্ষার অর্থ অ-শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের বাদ দেওয়া নয়।
বরং জনগণনার তথ্যের দিকে তাকালে একটি আকর্ষণীয় বাস্তবতা দেখা যায়। শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের মধ্যে যেখানে ৪৯ শতাংশ খ্রিস্টান হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিয়েছেন, আফ্রিকা বা ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে আসা কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর মধ্যে খ্রিস্টান পরিচয়ের হার প্রায় ৭০ শতাংশ।
অর্থাৎ ব্রিটিশ সমাজে ধর্মীয় ঐতিহ্য রক্ষার প্রশ্নকে ত্বকের রঙের সঙ্গে যুক্ত করা বাস্তবতার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ব্রিটিশত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য বরং এর নাগরিক চরিত্র। এই রাষ্ট্রের ধারণা হলো—নাগরিকত্ব অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ একটি অভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে যায়। একজন নতুন নাগরিকের পক্ষে স্থানীয়ভাবে নিজেকে ইংরেজ, স্কটিশ কিংবা ওয়েলশ হিসেবে অনুভব করতে সময় লাগতে পারে। এমনকি হয়তো সেই আঞ্চলিক আত্মপরিচয় কখনোই পুরোপুরি তৈরি হবে না। কিন্তু জাতীয় নাগরিকত্বের প্রশ্নে সেটি অপরিহার্য নয়।
কারণ ব্রিটিশ পরিচয়ের কেন্দ্রে রয়েছে রাজনৈতিক স্বাধীনতা, প্রতিষ্ঠান, আইন এবং একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত নাগরিক বন্ধন।

জাতীয় পরিচয়ের সংকট কোথা থেকে এসেছে?
তবে ব্রিটিশ জাতীয় পরিচয় যে আজ সংকটে নেই, এমন দাবি করাও বাস্তবতা অস্বীকার করা হবে। গত কয়েক দশকে এই সংকটের পেছনে দুটি বড় পরিবর্তন কাজ করেছে।
প্রথমত, ব্রিটেন ও পশ্চিমা বিশ্ব নিজেরাই নিজেদের জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিকে দুর্বল করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে বুদ্ধিজীবী মহলের একটি অংশ জাতীয় রাষ্ট্রকে বিভাজন, বৈষম্য ও যুদ্ধের উৎস হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। উত্তর-আধুনিক চিন্তায় জাতীয় ইতিহাস ও পরিচয়কে অনেক সময় কৃত্রিম নির্মাণ হিসেবে দেখা হয়েছে। বহুসাংস্কৃতিকতার কিছু সংস্করণ আবার এমন ধারণা সামনে এনেছে যে পুরোনো জাতীয় সংস্কৃতির জায়গা করে দিতে হবে বিভিন্ন সমান্তরাল সাংস্কৃতিক পরিচয়কে।
এর ফলে একটি অভিন্ন জাতীয় চেতনা দুর্বল হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ব্যাপক অভিবাসনের ফলে ব্রিটিশ সমাজে এমন কিছু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, যেগুলোকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে মুসলিম অভিবাসীদের একটি অংশের ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠেছে—তারা কি ব্রিটিশ সমাজের প্রচলিত রাজনৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছেন, নাকি উল্টো ব্রিটিশ সমাজকে নিজেদের ধর্মীয় ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার দাবি তুলছেন?
এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। একই সঙ্গে এটিও সত্য যে কোনো সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর আচরণ দিয়ে পুরো সম্প্রদায়কে বিচার করা বিপজ্জনক।
কিন্তু এই সমস্যাগুলো নিয়ে কথা না বললে ক্ষোভ আরও বাড়ে। সেই ক্ষোভ থেকেই রিফর্ম ইউকের মতো জনতুষ্টিবাদী রাজনীতি শক্তিশালী হয়েছে। আমেরিকায় একই ধরনের অসন্তোষ ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলনের ভিত তৈরি করেছে। আর এই বৃহত্তর জনতুষ্টিবাদী ঢেউয়ের আরও চরম প্রান্তে জন্ম নিয়েছে এমন সব গোষ্ঠী, যারা জাতীয় পরিচয়কে রক্ত, বংশ ও ত্বকের রঙের সঙ্গে যুক্ত করতে চায়।
এখানেই বিপদ।
ব্রিটেনকে রক্ষা করার নামে ব্রিটেনকে বদলে ফেলা
জাতীয় পরিচয় রক্ষার প্রয়োজন থাকতেই পারে। সীমান্ত, অভিবাসন, সামাজিক সংহতি, আইন ও সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা নিয়ে কঠোর রাজনৈতিক অবস্থানও গণতন্ত্রের মধ্যে বৈধ। কিন্তু জাতীয় পরিচয়কে ‘রক্ত ও মাটি’র ধারণায় নামিয়ে আনা ব্রিটিশ রাজনৈতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

রক্তের বিশুদ্ধতা কিংবা জাতিগত সমজাতীয়তার রাজনীতি ইউরোপের ইতিহাসে ভয়াবহ পরিণতি ডেকে এনেছে। নাৎসি মতাদর্শ তার সবচেয়ে ভয়ংকর উদাহরণ। তাই ব্রিটেনের জাতীয় পরিচয় রক্ষার নামে সেই ধরনের ধারণাকে গ্রহণ করা ইতিহাসের শিক্ষা ভুলে যাওয়া।
বরং ব্রিটেনের সামনে প্রকৃত কাজ হলো—যে মূল্যবোধ ও প্রতিষ্ঠান তার জাতীয় পরিচয় গড়ে তুলেছে, সেগুলোকে স্পষ্টভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। নাগরিকত্বের অর্থ কী, আইনের শাসন কেন গুরুত্বপূর্ণ, ব্যক্তিস্বাধীনতার সীমা কোথায়, ধর্মীয় স্বাধীনতার সঙ্গে জাতীয় আইনের সম্পর্ক কী এবং একটি গণতান্ত্রিক সমাজে সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগরিষ্ঠের দায়িত্ব কী—এসব প্রশ্ন নিয়ে দৃঢ় আলোচনা প্রয়োজন।
কেউ ব্রিটিশ হওয়ার জন্য সাদা হতে হবে না। খ্রিস্টান হওয়াও বাধ্যতামূলক নয়। ব্রিটিশত্বের মূল শক্তি যদি কোথাও থেকে থাকে, সেটি হলো ভিন্ন মানুষকে একটি অভিন্ন রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে যুক্ত করার ক্ষমতায়।
রিস্টোরের মতো রাজনীতি সেই ধারণাকে শক্তিশালী করছে না; বরং তার ভিত্তিই সংকুচিত করছে। তারা যে ব্রিটেনকে রক্ষা করতে চায়, তাদের প্রস্তাবিত পরিচয়ের রাজনীতি সেই ব্রিটেনের ঐতিহাসিক চরিত্রের সঙ্গেই বিরোধ তৈরি করে।
জাতীয় পরিচয় রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায় তাই মানুষকে জাতি, ধর্ম কিংবা ত্বকের রঙে ভাগ করা নয়। বরং নাগরিকদের মধ্যে সেই অভিন্ন মূল্যবোধের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা, যা বহু শতাব্দী ধরে ব্রিটিশ রাষ্ট্র ও সমাজকে টিকিয়ে রেখেছে।
ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ যদি কোনো একটি পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে, সেটি শ্বেতাঙ্গত্ব কিংবা ধর্মীয় একরূপতা নয়—বরং স্বাধীনতা, আইন, প্রতিষ্ঠান, ইতিহাস এবং নাগরিক সমতার ধারণা। সেটিই ব্রিটিশত্বের শক্তি। সেটিই রক্ষা করার মতো বিষয়।
মেলানি ফিলিপস 


















