যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে দেশটির প্রায় এক শতাব্দী আগের কঠোর অভিবাসন ব্যবস্থার ছায়া দেখা যাচ্ছে। ১৯২৪ সালে কংগ্রেস যে আইন করে নির্দিষ্ট দেশের মানুষের অভিবাসনে কোটা আরোপ করেছিল, এ সময় ট্রাম্প প্রশাসন অনেকটা একই ধরনের দেশভিত্তিক বিধিনিষেধ আরোপ করছে—তবে এবার কংগ্রেসের নতুন আইন নয়, মূলত প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতার মাধ্যমেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
১৯২৪ সালের কঠোর অভিবাসন আইন
১৯২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন সীমিত করার জন্য একটি কঠোর আইন করা হয়। অপরাধ, জনসংখ্যাগত পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কাকে সামনে রেখে ইতালি, পোল্যান্ড ও রাশিয়ার মতো দেশ থেকে আসা মানুষের সংখ্যা সীমিত করা হয়। এশিয়া থেকে অভিবাসন কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং বছরে সর্বোচ্চ দেড় লাখ অভিবাসীর প্রবেশের সীমা নির্ধারণ করা হয়।
সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের একটি অংশ মনে করতেন, বিশ্বের দরিদ্র ও নিপীড়িত মানুষের জন্য দেশটির দরজা আগের মতো খোলা রাখা সম্ভব নয়। এমনকি কিছু প্রভাবশালী মহলে বিভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির মানুষের সক্ষমতা নিয়ে বৈষম্যমূলক ও এখন সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য ধারণাও নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলেছিল।

এই আইনের পর যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। বিশেষ করে দক্ষিণ ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো থেকে মানুষের আগমন নাটকীয়ভাবে হ্রাস পায়। ১৯৩০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যায় বিদেশে জন্ম নেওয়া মানুষের অংশ যেখানে প্রায় ১২ শতাংশ ছিল, ১৯৭০ সালে তা নেমে আসে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে।
ট্রাম্পের নীতিতে একই ধরনের প্রবণতা
বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনও অভিবাসন কমাতে একের পর এক কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। দক্ষিণ সীমান্তে আশ্রয়প্রার্থীদের প্রবেশ বন্ধ করা হয়েছে, যুদ্ধ ও দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন দেশের মানুষের জন্য বহিষ্কার-সুরক্ষা প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং শরণার্থী গ্রহণও ব্যাপকভাবে সীমিত করা হয়েছে।
একই সঙ্গে কয়েকটি অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসন কার্যত থামিয়ে দেওয়ার মতো নীতি নেওয়া হয়েছে। সরকারি সুবিধার ওপর নির্ভরশীল হতে পারেন—এমন আশঙ্কায় কিছু অভিবাসীর স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বা স্থায়ী বসবাসের সুযোগও সীমিত করার চেষ্টা হয়েছে। এর পাশাপাশি কয়েক লাখ মানুষকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং আরও অনেককে স্বেচ্ছায় যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে যেতে চাপ দেওয়া হয়েছে।
অভিবাসন নীতি বিশ্লেষকদের মতে, ১৯২৪ সালের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির বড় পার্থক্য হলো—তখন কংগ্রেস সরাসরি জাতীয় কোটা নির্ধারণ করেছিল। এখন ট্রাম্প প্রশাসন বিস্তৃত নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে দেশভিত্তিক বিধিনিষেধ আরোপ করছে। তবে দুই সময়ের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে: উভয় ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রে কারা আসবে, কারা দেশটির সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে এবং কারা ‘উপযুক্ত’—এমন প্রশ্নকে অভিবাসন নীতির কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।
‘আমেরিকান সংস্কৃতি’ রক্ষার যুক্তি
ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্য বলছে, তাদের লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত সুরক্ষিত রাখা, অপরাধে জড়িত অবৈধ অভিবাসীদের গ্রেপ্তার ও বহিষ্কার করা এবং দেশের নাগরিকদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

তবে প্রশাসনের বিভিন্ন বক্তব্যে শুধু সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয় নয়, অভিবাসনের সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ স্পষ্ট হয়েছে। প্রশাসনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু প্রচারণামূলক বক্তব্যে বলা হয়েছে, বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলো থেকে অতিরিক্ত অভিবাসন যুক্তরাষ্ট্রের সংস্কৃতি ও অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
শরণার্থী হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধানত শ্বেতাঙ্গ আফ্রিকানদের একটি গোষ্ঠীকে গ্রহণের সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তাদের যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতার কথা উল্লেখ করেছেন। এই বক্তব্যও অভিবাসন নীতিতে সংস্কৃতি ও আত্মীকরণের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।
জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিয়েও বিতর্ক
জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের বিষয়টিও ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন অবস্থানের একটি অংশ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নিলে নাগরিকত্ব পাওয়ার দীর্ঘদিনের নীতি নিয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন।
প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার বিভিন্ন দেশের মানুষের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ এবং সেখানে সন্তান জন্ম দেওয়ার মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে কঠোর মন্তব্য করেছেন। পরে প্রশাসন জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার উদ্যোগও পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছে।
১৯২৪ ও ১৯৬৫—দুই বিপরীত যুগ
১৯২৪ সালের কঠোর অভিবাসন ব্যবস্থা কয়েক দশক টিকে থাকার পর ১৯৬৫ সালে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সময় প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি. জনসন ও কংগ্রেস অভিবাসনব্যবস্থা নতুন করে সাজায়। পশ্চিম ইউরোপের বাইরের দেশগুলোর মানুষের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের নতুন সুযোগ তৈরি হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের বিদেশে থাকা পরিবারের সদস্যদের স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদন করার সুযোগও বাড়ানো হয়।

কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রূপকার স্টিফেন মিলার ১৯৬৫ সালের এই পরিবর্তনের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই আইন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষকে যুক্তরাষ্ট্রে আসার এবং পরে পরিবারের সদস্যদেরও নিয়ে আসার সুযোগ দিয়েছিল। তিনি ১৯২০ থেকে ১৯৭০ সালের সময়কে এমন একটি যুগ হিসেবে তুলে ধরেছেন, যখন বিদেশে জন্ম নেওয়া মানুষের সংখ্যা কমেছিল এবং দেশীয় জনসংখ্যা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে একটি অভিন্ন জাতীয় পরিচয় গড়ে উঠেছিল।
৭৫ দেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসন সীমিত করার অভিযোগ
সাবেক অভিবাসন কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করছেন, ট্রাম্প প্রশাসন ধীরে ধীরে ১৯৬৫ সালের উদার অভিবাসন কাঠামোকে দুর্বল করছে। এর একটি বড় উদাহরণ হিসেবে তারা জানুয়ারিতে ৭৫টি দেশের মানুষের দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসন সীমিত করার সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করেছেন। এসব দেশের অনেকগুলোতেই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যা রয়েছে, আবার অনেক দেশ আফ্রিকায় অবস্থিত।
একজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা বর্তমান পরিস্থিতিকে ১৯২৪ ও ১৯৬৫ সালের দুই বিপরীত অভিবাসন যুগের মাঝখানে দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা হলো, ১৯২৪ সালে কংগ্রেস জাতিগত ও দেশভিত্তিক কোটা চালু করেছিল, ১৯৬৫ সালে সেই ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছিল; আর এখন ট্রাম্প প্রশাসন নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে আবার সেই পুরোনো কাঠামোর দিকে ফিরতে চাইছে।
অভিবাসন কমার প্রভাব
বর্তমান নীতির প্রভাব ইতোমধ্যে পরিসংখ্যানেও দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের আদমশুমারি-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশটিতে অভিবাসনের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় অর্ধেকেরও বেশি কমেছে। একই সময়ে জন্মহার কমে যাওয়া এবং অভিবাসন কমে যাওয়ার কারণে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত এক বছরের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও ইতিহাসের অন্যতম ধীরগতির পর্যায়ে পৌঁছায়।
ফলে প্রশ্ন উঠছে, যুক্তরাষ্ট্র কি আবার এমন এক সময়ের দিকে এগোচ্ছে, যখন অভিবাসনকে দেশের অর্থনীতি ও জনসংখ্যার শক্তি হিসেবে দেখার বদলে জাতীয় সংস্কৃতি, নিরাপত্তা ও পরিচয় রক্ষার ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হবে?
প্রায় এক শতাব্দী আগে ১৯২৪ সালের আইন অভিবাসনের ওপর কঠোর সীমা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যাগত কাঠামো বদলে দিয়েছিল। ১৯৬৫ সালের সংস্কার সেই পথ পাল্টে দেয়। এখন ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপগুলো সেই পুরোনো বিতর্ককে আবার সামনে নিয়ে এসেছে—যুক্তরাষ্ট্রের দরজা বিশ্বের মানুষের জন্য কতটা খোলা থাকবে এবং দেশটির ভবিষ্যৎ পরিচয় কীভাবে নির্ধারিত হবে, সেই প্রশ্নেই নতুন করে উত্তাপ তৈরি হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















