০৩:২৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬
হামে মৃতের সংখ্যা ৯১৫, ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭ শিশুর মৃত্যু ব্যাংকে বাড়তি তারল্য, ৯ শতাংশের নিচে নামল ট্রেজারি বিলের সুদ শেখ হাসিনা ভারতে কোন স্ট্যাটাসে, জানে না বাংলাদেশ: চিফ প্রসিকিউটর আলোচনার দরজা খোলা রাখছে পিটিআই, সমঝোতার গুঞ্জনে বাড়ছে জল্পনা নৌবন্দরগুলোতে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত, উত্তর বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ সকালে কফি খাওয়ার পর হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে? যে ৬ লক্ষণ একেবারেই উপেক্ষা করবেন না ই-রিকশার নিবন্ধনে বাধ্যতামূলক সৌরবিদ্যুৎ, অমান্য করলে জরিমানা ঝাড়খণ্ডে ছাত্র আন্দোলন তীব্র, মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের দাবি রাহুল গান্ধীর বিজয় সরকারের বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার বিস্ফোরক অভিযোগ, ‘২ থেকে ৪ শতাংশ কমিশন চান মন্ত্রীরা’ বিজেপি ছাড়ছেন শেহজাদ পুনাওয়ালা, পদত্যাগ গ্রহণের অনুরোধ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপুল সম্পদ—ভাগ চায় আমেরিকার জনপদ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারে যখন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ ও বাজারমূল্য নজিরবিহীনভাবে বাড়ছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে—এই বিপুল সম্পদের কতটা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে? একই সঙ্গে বাড়ছে আরেকটি দাবি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য যে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য সম্পদ ব্যবহার হচ্ছে, তার খরচও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকেই বহন করতে হবে।

এই বিতর্কের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে ভার্জিনিয়া। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বিপুলসংখ্যক তথ্যকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। শক্তিখেকো কম্পিউটার ও সার্ভারে ভরা এসব বিশাল স্থাপনার কারণে অঞ্চলটির একটি অংশ পরিচিত হয়েছে ‘তথ্যকেন্দ্র এলাকা’ হিসেবে। কিন্তু এবার সেই শিল্পের ওপরই কর বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে অঙ্গরাজ্যটি।

তথ্যকেন্দ্রে কর, ভার্জিনিয়ায় নতুন নজির

জুনের শেষ দিকে দীর্ঘ আলোচনা ও রাজনৈতিক দর-কষাকষির পর ভার্জিনিয়ার আইনপ্রণেতারা তথ্যকেন্দ্রগুলোর বিপুল বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর একটি ছোট আকারের কর আরোপের সিদ্ধান্ত নেন। যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া প্রথম অঙ্গরাজ্য ভার্জিনিয়া।

অ্যামাজন ও মাইক্রোসফটের মতো বিশাল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান যেসব তথ্যকেন্দ্রের মালিক বা ভাড়াটে হিসেবে কাজ করে, তাদের জন্য এই কর খুব বড় বোঝা নয়। কিন্তু ভার্জিনিয়ার জন্য এটি বড় ধরনের রাজস্বের উৎস হতে পারে। আগামী বছর এই কর থেকে প্রায় ৬০ কোটি ডলার পর্যন্ত আয় হতে পারে বলে জানিয়েছেন অঙ্গরাজ্যটির আইনপ্রণেতা লুইস লুকাস।

An aerial view of large, two-story buildings that sit close to a street of single-family homes.

তার যুক্তি, তথ্যকেন্দ্রের দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক ব্যয়ও বাড়ছে। ফলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেই ব্যয়ের একটি বড় অংশ বহন করতে হবে।

তার ভাষায়, মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী প্রতিষ্ঠানগুলো যখন একটি অঙ্গরাজ্যে এসে ব্যবসা করবে, তখন তাদেরও অন্য সবার মতো একই নিয়ম মেনে চলতে হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার লাভ কার?

ভার্জিনিয়ার সিদ্ধান্ত আসলে আরও বড় একটি জাতীয় বিতর্কের অংশ। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহর, কাউন্টি ও অঙ্গরাজ্যের কর্মকর্তারা এখন ভাবছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে তাদের জনগণ কীভাবে সরাসরি লাভবান হবে।

প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো দাবি করছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিকিৎসা গবেষণা থেকে শুরু করে যুদ্ধপ্রযুক্তি পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রকে বদলে দিতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে একই সঙ্গে তৈরি হচ্ছে উদ্বেগ। কারণ এই প্রযুক্তি যদি বিপুল অর্থনৈতিক লাভ সৃষ্টি করে, সেই লাভ সবার মধ্যে সমানভাবে ভাগ হবে কি না, তা নিয়ে নিশ্চিততা নেই।

বরং আশঙ্কা রয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে বহু মানুষের চাকরি হারাতে পারে, কিছু শিল্প ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ বাড়তে পারে এবং পুরো জনপদের অর্থনৈতিক কাঠামো বদলে যেতে পারে।

এই আশঙ্কা থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে এখন প্রশ্ন উঠছে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপুল সম্পদ থেকে সরকার ও সাধারণ মানুষ কতটা অংশ পাবে?

সামনে দুই সম্ভাবনা—অভূতপূর্ব সমৃদ্ধি নাকি বিপর্যয়

নীতিনির্ধারকদের আলোচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎকে মোটামুটি দুটি সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে দেখা হচ্ছে।

প্রথম সম্ভাবনা হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশ্ব অর্থনীতিতে অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি আনবে। কিছু পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এটি বিশ্ব অর্থনীতির উৎপাদনে ১৫ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি যোগ করতে পারে। এমন সম্ভাবনার কারণেই বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্যায়ন দ্রুত বেড়েছে।

দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি অনেক বেশি ভয়াবহ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ব্যর্থ হলে তা আর্থিক বাজারে বড় ধস সৃষ্টি করতে পারে। আবার প্রযুক্তিটি প্রত্যাশামতো সফল হলেও লাখ লাখ মানুষ চাকরি হারাতে পারেন। সম্পদের বড় অংশও তখন আরও অল্প কয়েকজন মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সম্প্রতি মহাকাশ প্রযুক্তির একটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারবাজারে প্রবেশের পর ইলন মাস্ক অল্প সময়ের জন্য বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হয়েছিলেন—এই ঘটনাও সম্পদ কেন্দ্রীভবনের আশঙ্কাকে আরও সামনে এনেছে।

বেকারত্বের আশঙ্কায় বাড়ছে রাজনৈতিক চাপ

Bernie Sanders, wearing a navy blue jacket over a light blue shirt and blue-striped tie, speaks to people holding phones.

এখনও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে ব্যাপক হারে চাকরি হারানোর ঘটনা দেখা যায়নি। কিন্তু ভবিষ্যতের আশঙ্কাই রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে।

প্রায় ২০০ জন অর্থনীতিবিদ, শিল্প খাতের নেতা ও সাবেক নিয়ন্ত্রক জুলাইয়ে একটি যৌথ সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে এমন পথে পরিচালিত করতে হবে, যাতে তা মানুষের কাজের পরিপূরক হয় এবং সমাজের সামগ্রিক কল্যাণে আসে।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে এ নিয়ে বিতর্কও ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। দেশটির কর রাজস্বের বড় অংশ আসে কর্মী ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আয় থেকে। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে যদি মানুষের আয় ও চাকরি কমে যায়, সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পদ ভাগের প্রস্তাব

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্পদ কীভাবে জনগণের মধ্যে ভাগ করা যায়, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বেশ কিছু প্রস্তাব সামনে এসেছে।

ভার্মন্টের স্বতন্ত্র আইনপ্রণেতা বার্নি স্যান্ডার্স বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ওপর এককালীন কর বসিয়ে সেই অর্থের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানের মালিকানার অংশ নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। তার পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই অংশ একটি নতুন সরকারি সম্পদ তহবিলে জমা হবে।

বর্তমান বাজারমূল্য ধরে সেই তহবিলের আকার প্রায় ৭ ট্রিলিয়ন ডলার হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। এর মাধ্যমে প্রত্যেক আমেরিকান নাগরিককে শুরুতেই ১ হাজার ডলারের বেশি অর্থ দেওয়া সম্ভব হতে পারে। পরবর্তীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে যে অতিরিক্ত সম্পদ সৃষ্টি হবে, তার একটি অংশও জনগণের মধ্যে বণ্টন করা যেতে পারে।

এই ধারণার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো একটি উদাহরণও রয়েছে। আলাস্কায় কয়েক দশক ধরে রাজ্যের ভেতর থেকে উত্তোলিত তেলের আয় থেকে নাগরিকদের ছোট অঙ্কের অর্থ দেওয়া হয়। সমর্থকদের মতে, ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অর্থনীতিতে তথ্য হতে পারে তেলের মতোই গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তাই সেই তথ্য থেকে তৈরি বিপুল সম্পদের একটি অংশও জনগণের পাওনা হওয়া উচিত।

এমন ধারণার কথা শুধু স্যান্ডার্সই বলেননি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বিভিন্ন সময়ে জনগণের জন্য একটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মালিকানার অংশ রাখার সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন।

প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের কয়েকজন শীর্ষ নির্বাহীও নাগরিকদের মধ্যে সম্পদ বণ্টনের ধারণার প্রতি নীতিগত সমর্থন জানিয়েছেন। তবে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর কেউ এখনো নির্দিষ্ট কোনো অঙ্গরাজ্য বা কেন্দ্রীয় আইনকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন করেনি।

কিছু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বরং নতুন গবেষণার ওপর জোর দিচ্ছে। তাদের বক্তব্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, তা আরও ভালোভাবে বোঝা প্রয়োজন।

অন্যদিকে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ সরকারি মালিকানার ধারণা নিয়ে সতর্ক। তাদের আশঙ্কা, সরকার যদি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানার অংশীদার হয়ে যায়, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের ক্ষেত্রে সরকারের আগ্রহ কমে যেতে পারে।

তাদের মতে, সরকার চাইলে প্রচলিত কর ব্যবস্থার মাধ্যমেই প্রযুক্তি খাতের বিপুল মুনাফা থেকে বেশি রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারে।

তথ্যকেন্দ্র ঘিরে স্থানীয় ক্ষোভ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মূল অবকাঠামো হিসেবে গড়ে ওঠা বিশাল তথ্যকেন্দ্রগুলো নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষোভ বাড়ছে।

কিছু এলাকায় এসব কেন্দ্র নির্মাণের ফলে বিপুলসংখ্যক নির্মাণকর্মীর কাজ হয়েছে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়েছে এবং সম্পত্তি কর থেকে স্থানীয় সরকারের আয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। লুইজিয়ানার একটি এলাকায় তথ্যকেন্দ্র থেকে পাওয়া নতুন রাজস্ব দিয়ে সরকারি শিক্ষকদের অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া সম্ভব হয়েছে।

ভার্জিনিয়ার লাউডাউন কাউন্টিতেও তথ্যকেন্দ্র ঘিরে এত বেশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও রাজস্ব তৈরি হয়েছে যে স্থানীয় সরকার বাসিন্দাদের সম্পত্তি কর কমাতে পেরেছে।

 Kathy Hochul stands behind a lectern that says, Keeping New Yorkers Safe, across the front.

কিন্তু সব জায়গার অভিজ্ঞতা এমন নয়। নতুন তথ্যকেন্দ্রগুলো আগের তুলনায় অনেক বড়, সেখানে কর্মসংস্থান তুলনামূলক কম এবং বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার অনেক বেশি। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে—এত বিপুল সম্পদ ব্যবহার করে তারা আসলে কতটা লাভ পাচ্ছেন?

একের পর এক অঙ্গরাজ্যে স্থগিত হচ্ছে নির্মাণ

গত দুই বছরে প্রায় ১২০টি স্থানীয় জনপদ তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ সাময়িকভাবে বন্ধ করা বা স্থগিত রাখার বিষয় বিবেচনা করেছে কিংবা বাস্তবায়ন করেছে।

নেব্রাস্কায় উর্বর জমি ও অনুকূল করনীতির কারণে অ্যালফাবেটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ করেছিল। কিন্তু চাহিদা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার পর গভর্নর জিম পিলেন শিল্পটির জন্য দেওয়া কর-সুবিধা স্থগিত করেন। তার বক্তব্য, বাজার পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে এবং বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকেই নিজেদের ব্যয় বহন করতে হবে।

নিউইয়র্ক আরও কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। জুলাইয়ে গভর্নর ক্যাথি হোকুল আগামী এক বছরের জন্য নতুন তথ্যকেন্দ্র নির্মাণে রাজ্যব্যাপী স্থগিতাদেশ দেন। পাশাপাশি তিনি তথ্যকেন্দ্রগুলোর করব্যবস্থা নতুন করে পর্যালোচনার ঘোষণা দেন।

তার যুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তথ্যকেন্দ্রগুলো এত বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে যে রাজ্যের বিদ্যমান বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হচ্ছে। অথচ এসব কেন্দ্র দীর্ঘমেয়াদে বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি করবে—এমন নিশ্চয়তাও নেই।

শিল্পের সঙ্গে স্থানীয় সরকারের সংঘাত

তথ্যকেন্দ্র নির্মাণে নিয়ন্ত্রণ ও কর বাড়ানোর উদ্যোগের বিরুদ্ধে প্রযুক্তি খাতও শক্ত অবস্থান নিয়েছে। বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী শিল্প সংগঠনগুলো আইনপ্রণেতাদের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছে।

অনেক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এমন আইনি সুবিধা ব্যবহার করে কম্পিউটার, সার্ভার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি করমুক্তভাবে কিনতে পারে। ভার্জিনিয়ায় এই করছাড় তুলে দেওয়ার চেষ্টা হলে প্রযুক্তি শিল্পের পক্ষ থেকে তীব্র লবিং শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত সেই করছাড় পুরোপুরি বাতিল করা সম্ভব হয়নি।

এর বদলে ভার্জিনিয়ায় বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর সীমিত ও সাময়িক কর আরোপ করা হয়েছে।

রাজনীতিতে নতুন বড় ইস্যু

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্পদ ও তার সামাজিক ব্যয় এখন ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—দুই দলের নেতৃত্বাধীন অঙ্গরাজ্যেই তথ্যকেন্দ্রকে দেওয়া কর-সুবিধা কমানো বা স্থগিত করার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। ইলিনয় ও ওহাইও কিছু কর-সুবিধা স্থগিত করেছে। অ্যারিজোনাও তিন বছরের জন্য এমন একটি বিরতি কার্যকর করেছে। সেখানে পাওয়া অর্থ শিশুদের দেখাশোনা ও অন্যান্য সামাজিক সেবায় ব্যয় করার কথা বলা হয়েছে।

অ্যারিজোনার গভর্নর ক্যাটি হবসের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে কিছু মানুষ বিপুলভাবে লাভবান হলেও সেই সুবিধা সবার মধ্যে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না। ফলে স্থানীয় মানুষের ক্ষোভও বাড়ছে।

টেক্সাসেও পরিস্থিতি বদলেছে। একসময় গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট অঙ্গরাজ্যটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিকাশের কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি তিনি তথ্যকেন্দ্রগুলো বিদ্যুৎ ব্যবহারের স্থানীয় নিয়ম মেনে চলছে কি না, তা যাচাই করতে রাজ্যব্যাপী নিরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন।

বিদ্যুতের বিল কে দেবে?

The A.I. Revolution Will Change Work. Nobody Agrees How. - The New York  Times

তথ্যকেন্দ্রের বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ এখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্নগুলোর একটি। অনেক অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দাদের আশঙ্কা, তথ্যকেন্দ্রের বিপুল বিদ্যুৎ চাহিদার কারণে শেষ পর্যন্ত বাড়তি ব্যয়ের বোঝা তাদের ঘাড়ে পড়তে পারে।

এ কারণেই গত দুই বছরে প্রায় ৩০টি অঙ্গরাজ্য তথ্যকেন্দ্রের বিদ্যুৎ ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত আইন বিবেচনা করেছে। এর মধ্যে বড় বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের জন্য আলাদা শুল্ক আরোপের প্রস্তাবও রয়েছে।

নিউ জার্সিতে আইনপ্রণেতারা এমন একটি শুল্ক চালু করেছেন, যার লক্ষ্য তথ্যকেন্দ্রের নির্মাতা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রকৃত ব্যয় বহনে বাধ্য করা।

সামনে বড় প্রশ্ন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আগামী দশকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে কতটা বদলে দেবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে একটি বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে—এই প্রযুক্তির বিপুল সম্ভাবনার পাশাপাশি এর সামাজিক ব্যয় নিয়েও রাজনৈতিক লড়াই শুরু হয়ে গেছে।

একদিকে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনতে পারে। অন্যদিকে স্থানীয় সরকার ও সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, সেই সমৃদ্ধির সুফল যদি কেবল অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে জমা হয়, আর বিদ্যুৎ, পানি, পরিবেশ ও কর্মসংস্থানের খরচ বহন করতে হয় সাধারণ মানুষকে, তাহলে এই প্রযুক্তিগত বিপ্লবের প্রকৃত লাভ কার?

যুক্তরাষ্ট্রে এখন সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে। আর এর ফল শুধু প্রযুক্তি শিল্পের ভবিষ্যৎ নয়, আগামী কয়েক দশকের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকেও প্রভাবিত করতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে তাই নতুন প্রশ্নটি শুধু ‘এই প্রযুক্তি কত সম্পদ তৈরি করবে’ নয়; বরং ‘সেই সম্পদের ন্যায্য অংশ কারা পাবে’—এটাই হয়ে উঠছে বড় বিতর্ক।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি কর, তথ্যকেন্দ্র, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও সম্পদ বণ্টন নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দু এখন এই প্রশ্ন—প্রযুক্তিগত বিপ্লবের লাভ কি শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ঘরেও পৌঁছাবে?

 

 

 

জনপ্রিয় সংবাদ

হামে মৃতের সংখ্যা ৯১৫, ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭ শিশুর মৃত্যু

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপুল সম্পদ—ভাগ চায় আমেরিকার জনপদ

০২:১৩:৩০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তারে যখন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ ও বাজারমূল্য নজিরবিহীনভাবে বাড়ছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে—এই বিপুল সম্পদের কতটা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে? একই সঙ্গে বাড়ছে আরেকটি দাবি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য যে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য সম্পদ ব্যবহার হচ্ছে, তার খরচও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকেই বহন করতে হবে।

এই বিতর্কের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে ভার্জিনিয়া। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বিপুলসংখ্যক তথ্যকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। শক্তিখেকো কম্পিউটার ও সার্ভারে ভরা এসব বিশাল স্থাপনার কারণে অঞ্চলটির একটি অংশ পরিচিত হয়েছে ‘তথ্যকেন্দ্র এলাকা’ হিসেবে। কিন্তু এবার সেই শিল্পের ওপরই কর বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে অঙ্গরাজ্যটি।

তথ্যকেন্দ্রে কর, ভার্জিনিয়ায় নতুন নজির

জুনের শেষ দিকে দীর্ঘ আলোচনা ও রাজনৈতিক দর-কষাকষির পর ভার্জিনিয়ার আইনপ্রণেতারা তথ্যকেন্দ্রগুলোর বিপুল বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর একটি ছোট আকারের কর আরোপের সিদ্ধান্ত নেন। যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া প্রথম অঙ্গরাজ্য ভার্জিনিয়া।

অ্যামাজন ও মাইক্রোসফটের মতো বিশাল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান যেসব তথ্যকেন্দ্রের মালিক বা ভাড়াটে হিসেবে কাজ করে, তাদের জন্য এই কর খুব বড় বোঝা নয়। কিন্তু ভার্জিনিয়ার জন্য এটি বড় ধরনের রাজস্বের উৎস হতে পারে। আগামী বছর এই কর থেকে প্রায় ৬০ কোটি ডলার পর্যন্ত আয় হতে পারে বলে জানিয়েছেন অঙ্গরাজ্যটির আইনপ্রণেতা লুইস লুকাস।

An aerial view of large, two-story buildings that sit close to a street of single-family homes.

তার যুক্তি, তথ্যকেন্দ্রের দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক ব্যয়ও বাড়ছে। ফলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সেই ব্যয়ের একটি বড় অংশ বহন করতে হবে।

তার ভাষায়, মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী প্রতিষ্ঠানগুলো যখন একটি অঙ্গরাজ্যে এসে ব্যবসা করবে, তখন তাদেরও অন্য সবার মতো একই নিয়ম মেনে চলতে হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার লাভ কার?

ভার্জিনিয়ার সিদ্ধান্ত আসলে আরও বড় একটি জাতীয় বিতর্কের অংশ। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহর, কাউন্টি ও অঙ্গরাজ্যের কর্মকর্তারা এখন ভাবছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে তাদের জনগণ কীভাবে সরাসরি লাভবান হবে।

প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো দাবি করছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিকিৎসা গবেষণা থেকে শুরু করে যুদ্ধপ্রযুক্তি পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রকে বদলে দিতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে একই সঙ্গে তৈরি হচ্ছে উদ্বেগ। কারণ এই প্রযুক্তি যদি বিপুল অর্থনৈতিক লাভ সৃষ্টি করে, সেই লাভ সবার মধ্যে সমানভাবে ভাগ হবে কি না, তা নিয়ে নিশ্চিততা নেই।

বরং আশঙ্কা রয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে বহু মানুষের চাকরি হারাতে পারে, কিছু শিল্প ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ বাড়তে পারে এবং পুরো জনপদের অর্থনৈতিক কাঠামো বদলে যেতে পারে।

এই আশঙ্কা থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে এখন প্রশ্ন উঠছে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপুল সম্পদ থেকে সরকার ও সাধারণ মানুষ কতটা অংশ পাবে?

সামনে দুই সম্ভাবনা—অভূতপূর্ব সমৃদ্ধি নাকি বিপর্যয়

নীতিনির্ধারকদের আলোচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎকে মোটামুটি দুটি সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে দেখা হচ্ছে।

প্রথম সম্ভাবনা হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশ্ব অর্থনীতিতে অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি আনবে। কিছু পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এটি বিশ্ব অর্থনীতির উৎপাদনে ১৫ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি যোগ করতে পারে। এমন সম্ভাবনার কারণেই বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্যায়ন দ্রুত বেড়েছে।

দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি অনেক বেশি ভয়াবহ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ব্যর্থ হলে তা আর্থিক বাজারে বড় ধস সৃষ্টি করতে পারে। আবার প্রযুক্তিটি প্রত্যাশামতো সফল হলেও লাখ লাখ মানুষ চাকরি হারাতে পারেন। সম্পদের বড় অংশও তখন আরও অল্প কয়েকজন মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সম্প্রতি মহাকাশ প্রযুক্তির একটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারবাজারে প্রবেশের পর ইলন মাস্ক অল্প সময়ের জন্য বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হয়েছিলেন—এই ঘটনাও সম্পদ কেন্দ্রীভবনের আশঙ্কাকে আরও সামনে এনেছে।

বেকারত্বের আশঙ্কায় বাড়ছে রাজনৈতিক চাপ

Bernie Sanders, wearing a navy blue jacket over a light blue shirt and blue-striped tie, speaks to people holding phones.

এখনও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে ব্যাপক হারে চাকরি হারানোর ঘটনা দেখা যায়নি। কিন্তু ভবিষ্যতের আশঙ্কাই রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে।

প্রায় ২০০ জন অর্থনীতিবিদ, শিল্প খাতের নেতা ও সাবেক নিয়ন্ত্রক জুলাইয়ে একটি যৌথ সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে এমন পথে পরিচালিত করতে হবে, যাতে তা মানুষের কাজের পরিপূরক হয় এবং সমাজের সামগ্রিক কল্যাণে আসে।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে এ নিয়ে বিতর্কও ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। দেশটির কর রাজস্বের বড় অংশ আসে কর্মী ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আয় থেকে। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে যদি মানুষের আয় ও চাকরি কমে যায়, সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পদ ভাগের প্রস্তাব

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্পদ কীভাবে জনগণের মধ্যে ভাগ করা যায়, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বেশ কিছু প্রস্তাব সামনে এসেছে।

ভার্মন্টের স্বতন্ত্র আইনপ্রণেতা বার্নি স্যান্ডার্স বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ওপর এককালীন কর বসিয়ে সেই অর্থের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানের মালিকানার অংশ নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। তার পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই অংশ একটি নতুন সরকারি সম্পদ তহবিলে জমা হবে।

বর্তমান বাজারমূল্য ধরে সেই তহবিলের আকার প্রায় ৭ ট্রিলিয়ন ডলার হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। এর মাধ্যমে প্রত্যেক আমেরিকান নাগরিককে শুরুতেই ১ হাজার ডলারের বেশি অর্থ দেওয়া সম্ভব হতে পারে। পরবর্তীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে যে অতিরিক্ত সম্পদ সৃষ্টি হবে, তার একটি অংশও জনগণের মধ্যে বণ্টন করা যেতে পারে।

এই ধারণার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো একটি উদাহরণও রয়েছে। আলাস্কায় কয়েক দশক ধরে রাজ্যের ভেতর থেকে উত্তোলিত তেলের আয় থেকে নাগরিকদের ছোট অঙ্কের অর্থ দেওয়া হয়। সমর্থকদের মতে, ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অর্থনীতিতে তথ্য হতে পারে তেলের মতোই গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তাই সেই তথ্য থেকে তৈরি বিপুল সম্পদের একটি অংশও জনগণের পাওনা হওয়া উচিত।

এমন ধারণার কথা শুধু স্যান্ডার্সই বলেননি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বিভিন্ন সময়ে জনগণের জন্য একটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মালিকানার অংশ রাখার সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন।

প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের কয়েকজন শীর্ষ নির্বাহীও নাগরিকদের মধ্যে সম্পদ বণ্টনের ধারণার প্রতি নীতিগত সমর্থন জানিয়েছেন। তবে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর কেউ এখনো নির্দিষ্ট কোনো অঙ্গরাজ্য বা কেন্দ্রীয় আইনকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন করেনি।

কিছু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বরং নতুন গবেষণার ওপর জোর দিচ্ছে। তাদের বক্তব্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, তা আরও ভালোভাবে বোঝা প্রয়োজন।

অন্যদিকে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ সরকারি মালিকানার ধারণা নিয়ে সতর্ক। তাদের আশঙ্কা, সরকার যদি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানার অংশীদার হয়ে যায়, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের ক্ষেত্রে সরকারের আগ্রহ কমে যেতে পারে।

তাদের মতে, সরকার চাইলে প্রচলিত কর ব্যবস্থার মাধ্যমেই প্রযুক্তি খাতের বিপুল মুনাফা থেকে বেশি রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারে।

তথ্যকেন্দ্র ঘিরে স্থানীয় ক্ষোভ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মূল অবকাঠামো হিসেবে গড়ে ওঠা বিশাল তথ্যকেন্দ্রগুলো নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষোভ বাড়ছে।

কিছু এলাকায় এসব কেন্দ্র নির্মাণের ফলে বিপুলসংখ্যক নির্মাণকর্মীর কাজ হয়েছে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেড়েছে এবং সম্পত্তি কর থেকে স্থানীয় সরকারের আয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। লুইজিয়ানার একটি এলাকায় তথ্যকেন্দ্র থেকে পাওয়া নতুন রাজস্ব দিয়ে সরকারি শিক্ষকদের অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া সম্ভব হয়েছে।

ভার্জিনিয়ার লাউডাউন কাউন্টিতেও তথ্যকেন্দ্র ঘিরে এত বেশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও রাজস্ব তৈরি হয়েছে যে স্থানীয় সরকার বাসিন্দাদের সম্পত্তি কর কমাতে পেরেছে।

 Kathy Hochul stands behind a lectern that says, Keeping New Yorkers Safe, across the front.

কিন্তু সব জায়গার অভিজ্ঞতা এমন নয়। নতুন তথ্যকেন্দ্রগুলো আগের তুলনায় অনেক বড়, সেখানে কর্মসংস্থান তুলনামূলক কম এবং বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার অনেক বেশি। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে—এত বিপুল সম্পদ ব্যবহার করে তারা আসলে কতটা লাভ পাচ্ছেন?

একের পর এক অঙ্গরাজ্যে স্থগিত হচ্ছে নির্মাণ

গত দুই বছরে প্রায় ১২০টি স্থানীয় জনপদ তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ সাময়িকভাবে বন্ধ করা বা স্থগিত রাখার বিষয় বিবেচনা করেছে কিংবা বাস্তবায়ন করেছে।

নেব্রাস্কায় উর্বর জমি ও অনুকূল করনীতির কারণে অ্যালফাবেটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ করেছিল। কিন্তু চাহিদা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার পর গভর্নর জিম পিলেন শিল্পটির জন্য দেওয়া কর-সুবিধা স্থগিত করেন। তার বক্তব্য, বাজার পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে এবং বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকেই নিজেদের ব্যয় বহন করতে হবে।

নিউইয়র্ক আরও কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। জুলাইয়ে গভর্নর ক্যাথি হোকুল আগামী এক বছরের জন্য নতুন তথ্যকেন্দ্র নির্মাণে রাজ্যব্যাপী স্থগিতাদেশ দেন। পাশাপাশি তিনি তথ্যকেন্দ্রগুলোর করব্যবস্থা নতুন করে পর্যালোচনার ঘোষণা দেন।

তার যুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তথ্যকেন্দ্রগুলো এত বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে যে রাজ্যের বিদ্যমান বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হচ্ছে। অথচ এসব কেন্দ্র দীর্ঘমেয়াদে বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি করবে—এমন নিশ্চয়তাও নেই।

শিল্পের সঙ্গে স্থানীয় সরকারের সংঘাত

তথ্যকেন্দ্র নির্মাণে নিয়ন্ত্রণ ও কর বাড়ানোর উদ্যোগের বিরুদ্ধে প্রযুক্তি খাতও শক্ত অবস্থান নিয়েছে। বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী শিল্প সংগঠনগুলো আইনপ্রণেতাদের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছে।

অনেক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এমন আইনি সুবিধা ব্যবহার করে কম্পিউটার, সার্ভার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি করমুক্তভাবে কিনতে পারে। ভার্জিনিয়ায় এই করছাড় তুলে দেওয়ার চেষ্টা হলে প্রযুক্তি শিল্পের পক্ষ থেকে তীব্র লবিং শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত সেই করছাড় পুরোপুরি বাতিল করা সম্ভব হয়নি।

এর বদলে ভার্জিনিয়ায় বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর সীমিত ও সাময়িক কর আরোপ করা হয়েছে।

রাজনীতিতে নতুন বড় ইস্যু

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্পদ ও তার সামাজিক ব্যয় এখন ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।

ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—দুই দলের নেতৃত্বাধীন অঙ্গরাজ্যেই তথ্যকেন্দ্রকে দেওয়া কর-সুবিধা কমানো বা স্থগিত করার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। ইলিনয় ও ওহাইও কিছু কর-সুবিধা স্থগিত করেছে। অ্যারিজোনাও তিন বছরের জন্য এমন একটি বিরতি কার্যকর করেছে। সেখানে পাওয়া অর্থ শিশুদের দেখাশোনা ও অন্যান্য সামাজিক সেবায় ব্যয় করার কথা বলা হয়েছে।

অ্যারিজোনার গভর্নর ক্যাটি হবসের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে কিছু মানুষ বিপুলভাবে লাভবান হলেও সেই সুবিধা সবার মধ্যে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না। ফলে স্থানীয় মানুষের ক্ষোভও বাড়ছে।

টেক্সাসেও পরিস্থিতি বদলেছে। একসময় গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট অঙ্গরাজ্যটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিকাশের কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি তিনি তথ্যকেন্দ্রগুলো বিদ্যুৎ ব্যবহারের স্থানীয় নিয়ম মেনে চলছে কি না, তা যাচাই করতে রাজ্যব্যাপী নিরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন।

বিদ্যুতের বিল কে দেবে?

The A.I. Revolution Will Change Work. Nobody Agrees How. - The New York  Times

তথ্যকেন্দ্রের বিদ্যুৎ ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ এখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্নগুলোর একটি। অনেক অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দাদের আশঙ্কা, তথ্যকেন্দ্রের বিপুল বিদ্যুৎ চাহিদার কারণে শেষ পর্যন্ত বাড়তি ব্যয়ের বোঝা তাদের ঘাড়ে পড়তে পারে।

এ কারণেই গত দুই বছরে প্রায় ৩০টি অঙ্গরাজ্য তথ্যকেন্দ্রের বিদ্যুৎ ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত আইন বিবেচনা করেছে। এর মধ্যে বড় বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের জন্য আলাদা শুল্ক আরোপের প্রস্তাবও রয়েছে।

নিউ জার্সিতে আইনপ্রণেতারা এমন একটি শুল্ক চালু করেছেন, যার লক্ষ্য তথ্যকেন্দ্রের নির্মাতা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রকৃত ব্যয় বহনে বাধ্য করা।

সামনে বড় প্রশ্ন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আগামী দশকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে কতটা বদলে দেবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে একটি বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে—এই প্রযুক্তির বিপুল সম্ভাবনার পাশাপাশি এর সামাজিক ব্যয় নিয়েও রাজনৈতিক লড়াই শুরু হয়ে গেছে।

একদিকে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনতে পারে। অন্যদিকে স্থানীয় সরকার ও সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, সেই সমৃদ্ধির সুফল যদি কেবল অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে জমা হয়, আর বিদ্যুৎ, পানি, পরিবেশ ও কর্মসংস্থানের খরচ বহন করতে হয় সাধারণ মানুষকে, তাহলে এই প্রযুক্তিগত বিপ্লবের প্রকৃত লাভ কার?

যুক্তরাষ্ট্রে এখন সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে। আর এর ফল শুধু প্রযুক্তি শিল্পের ভবিষ্যৎ নয়, আগামী কয়েক দশকের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকেও প্রভাবিত করতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে তাই নতুন প্রশ্নটি শুধু ‘এই প্রযুক্তি কত সম্পদ তৈরি করবে’ নয়; বরং ‘সেই সম্পদের ন্যায্য অংশ কারা পাবে’—এটাই হয়ে উঠছে বড় বিতর্ক।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি কর, তথ্যকেন্দ্র, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও সম্পদ বণ্টন নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দু এখন এই প্রশ্ন—প্রযুক্তিগত বিপ্লবের লাভ কি শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ঘরেও পৌঁছাবে?