গাড়ি, বাস, ট্রেন কিংবা নৌযানে চলার সময় অনেকেরই মাথা ঘোরা, অস্বস্তি কিংবা বমিভাব শুরু হয়। বিশেষ করে চলন্ত গাড়িতে বসে মুঠোফোনের পর্দার দিকে তাকালে এই সমস্যা আরও বাড়তে পারে। তবে আইফোনের একটি তুলনামূলকভাবে অচেনা সুবিধা এখন সেই সমস্যার কিছুটা সমাধান দিচ্ছে।
পর্দায় নাচে যে বিন্দুগুলো
আইফোনে থাকা এই সুবিধার নাম ‘ভেহিকল মোশন কিউজ’। এটি চালু করলে পর্দার চারপাশে ছোট ছোট চলমান বিন্দু দেখা যায়। গাড়ি যে দিকে বা যেভাবে নড়ছে, বিন্দুগুলোও সেই গতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নড়াচড়া করে।
মুঠোফোনের ভেতরের গতিমাপক যন্ত্র গাড়ির গতিবিধি শনাক্ত করে এবং সেই অনুযায়ী বিন্দুগুলোর নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে চোখ ও শরীরের মধ্যে চলাচল সম্পর্কে যে অসামঞ্জস্য তৈরি হয়, সেটি কিছুটা কমে আসতে পারে।
কেন চলন্ত গাড়িতে বমিভাব হয়
চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে গতি-জনিত অসুস্থতার কারণ নিয়ে গবেষণা করছেন। একটি প্রচলিত ব্যাখ্যা হলো, শরীরের ভেতরের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণকারী অঙ্গ চলাচল অনুভব করলেও চোখ অনেক সময় পর্দার স্থির দৃশ্য দেখে। ফলে মস্তিষ্ক পরস্পরবিরোধী সংকেত পায়।
আরেকটি ব্যাখ্যায় বলা হয়, শরীরের পেশি ও বিভিন্ন অঙ্গ প্রতিনিয়ত পরবর্তী নড়াচড়া অনুমান করে শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখে। সেই অনুমান বাস্তব গতির সঙ্গে না মিললে মাথা ঘোরা ও বমিভাব তৈরি হতে পারে।
এ কারণেই চালকের তুলনায় যাত্রীর এই সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। চালক নিজেই গাড়ির গতি ও দিক নিয়ন্ত্রণ করেন, ফলে তার শরীরের নড়াচড়া সম্পর্কে অনুমান ও বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য তুলনামূলক কম থাকে।
বিন্দুগুলো কীভাবে সাহায্য করে
বিশেষজ্ঞদের মতে, চোখকে শরীরের প্রকৃত গতিবিধি সম্পর্কে অতিরিক্ত দৃশ্যমান সংকেত দেওয়া হলে এই অসামঞ্জস্য কমতে পারে। আইফোনের পর্দায় চলমান বিন্দুগুলো সেই কাজটিই করার চেষ্টা করে।
একজন ভারসাম্য-ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণাকারী চিকিৎসাবিশেষজ্ঞের মতে, বিন্দুগুলো ব্যবহারকারীকে মহাশূন্যে তার শরীর কীভাবে নড়ছে, সে সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়। এ ধরনের দৃশ্যমান সংকেত বমিভাব কমাতে সহায়ক হতে পারে।
এমনকি তরলভর্তি বিশেষ চশমাও তৈরি হয়েছে, যেগুলো মাথা ও শরীরের গতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চোখের সামনে নড়াচড়া তৈরি করে। কিছু গবেষণায় এ ধরনের পদ্ধতির কার্যকারিতার প্রমাণও পাওয়া গেছে।

কারও কাছে আশ্চর্যজনক, কারও কাছে একেবারেই নয়
এই সুবিধা নিয়ে ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা অবশ্য এক নয়। কেউ কেউ জানিয়েছেন, এতে কোনো পরিবর্তন তারা টের পাননি। আবার যাদের দীর্ঘদিনের গাড়িতে বমিভাবের সমস্যা রয়েছে, তাদের কেউ কেউ এটিকে প্রায় জীবন বদলে দেওয়া সুবিধা হিসেবে দেখছেন।
নিউইয়র্কের এক শিল্পকলা সংগ্রাহক জানিয়েছেন, গাড়িতে চলার সময় এই বিন্দুগুলো তার জন্য বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। এমনকি কারও গাড়িতে বমি পাওয়ার কথা শুনলেই তিনি এই সুবিধাটি ব্যবহারের পরামর্শ দেন।
এক গাড়িপ্রেমী সংবাদপত্রের প্রধান সম্পাদকও জানিয়েছেন, কর্মসূত্রে তাকে প্রায়ই গাড়ির যাত্রীর আসনে বসতে হয়। ফলে গাড়িতে বমিভাব তার জন্য দীর্ঘদিনের সমস্যা। তার দাবি, পর্দার এই বিন্দুগুলো সত্যিই কাজে দেয়।
তবে সমস্যাটাও অন্য জায়গায়
এই সুবিধার সবচেয়ে মজার দিক হলো, এটি মূলত তখনই সবচেয়ে প্রয়োজনীয় যখন মুঠোফোনের দিকে তাকানোর কারণেই আপনার বমিভাব তৈরি হচ্ছে।
অর্থাৎ বমিভাব কমাতে গিয়ে আপনি আবারও মুঠোফোনের পর্দার দিকে তাকানোর সুযোগ পাচ্ছেন। অথচ বর্তমান সময়ে অতিরিক্ত পর্দা ব্যবহারের অভ্যাস কমানো নিয়েই যখন এত আলোচনা, তখন এটি কিছুটা পরিহাসেরও বিষয়।
তাই গাড়িতে মুঠোফোন দেখলেই যদি মাথা ঘোরে, আইফোনের এই সুবিধাটি অবশ্যই চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে। তবে সবচেয়ে সহজ সমাধানটিও হয়তো ভুলে গেলে চলবে না—মুঠোফোনটি এক পাশে রেখে জানালার বাইরে তাকিয়ে যাত্রাটা উপভোগ করা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















