ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রভোস্টের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীকে হয়রানির অভিযোগের ঘটনায় হল অফিস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছেন শিক্ষার্থীরা। অভিযোগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত না আসায় রোববার এ ঘোষণা দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশসহ তিন দফা দাবি জানিয়েছেন।
তিন দফা দাবিতে শিক্ষার্থীদের অবস্থান
শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে রয়েছে ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ, অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রভোস্ট ও জড়িত কর্মচারীদের বহিষ্কার এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। শিক্ষার্থীরা বলছেন, ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ মুছে ফেলা হয়ে থাকলেও সেটিকে অভিযোগের সত্যতার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করে সংশ্লিষ্টদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।
এদিকে অভিযোগ তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ রতন ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত কমিটিকে দ্রুত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
যে অভিযোগ ঘিরে উত্তেজনা
ফজলুল হক মুসলিম হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মো. ইব্রাহিম অভিযোগ করেন, হলের প্রভোস্ট ড. মো. ইলিয়াস আল-মামুন তাকে একটি ফেসবুক পোস্টের বিষয়ে নিজের কক্ষে ডেকে পাঠান। পোস্টটিতে প্রভোস্টের সমালোচনা করা হয়েছিল বলে জানান তিনি।
ইব্রাহিমের অভিযোগ, প্রভোস্টের সঙ্গে আরও পাঁচ কর্মচারী দরজা বন্ধ করে তাকে প্রায় দেড় ঘণ্টা আটকে রাখেন। এ সময় তাকে মানসিকভাবে হয়রানি করা হয়, জোর করে তার মুঠোফোন পরীক্ষা করা হয় এবং বিভিন্নভাবে ভয় দেখানো হয়।
তার দাবি, প্রভোস্ট তাকে সাইবার অপরাধের মামলা, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার এবং হলের আবাসিক আসন বাতিলের হুমকি দেন। এমনকি তার মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলে ঘটনাটি কাউকে না জানানোর জন্যও বলা হয়।
ইব্রাহিম আরও বলেন, তার কাছ থেকে জোর করে একটি লিখিত বক্তব্যে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। ওই বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছিল, হল সংসদের ভিপি, জিএস ও এজিএসের প্ররোচনায় তিনি প্রভোস্টের বিরুদ্ধে পোস্ট করেছিলেন।
রাতভর উত্তেজনা ও সংঘর্ষ
ঘটনার পর গতকাল রাত ৯টার দিকে হলের শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নেতাদের পাশাপাশি শিবির ও ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে প্রতিবাদ করেন। সিসিটিভি ফুটেজ দেখাতে অস্বীকৃতি জানানোয় তারা প্রভোস্টের পদত্যাগ দাবি করেন এবং একপর্যায়ে তাকে অবরুদ্ধ করেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ও প্রক্টর হলে গেলে আন্দোলনকারীরা তাদেরও অবরুদ্ধ করেন। রাত ৩টার দিকে অবরুদ্ধ ব্যক্তিদের ‘উদ্ধার’ করতে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হলে গেলে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত ছয়জন আহত হন।
ছাত্রদল ও শিবিরের পাল্টাপাল্টি দাবি
হল ছাত্রদল প্রভোস্টের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী হয়রানির অভিযোগ এবং শিক্ষক-কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ করার ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছে। সংগঠনটি বিকেল ৩টার দিকে প্রক্টরের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায়।
অন্যদিকে বিকেল ৪টায় মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিবির প্রভোস্ট ড. মো. ইলিয়াস আল-মামুনকে সব প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে স্থায়ীভাবে অপসারণ এবং অভিযোগের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায়। ঘটনায় জড়িত বলে অভিযোগ ওঠা কর্মচারীদেরও বরখাস্তের দাবি করেছে সংগঠনটি।
এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় জড়িত ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সিসিটিভি ফুটেজ ও ভিডিও প্রমাণের ভিত্তিতে স্থায়ী বহিষ্কার এবং ফৌজদারি মামলা করার দাবি জানায় শিবির। ক্যাম্পাসে কোনো ছাত্রসংগঠন যাতে শিক্ষার্থীদের ওপর শক্তি প্রয়োগ করতে বা প্রশাসনের হয়ে বলপ্রয়োগকারী হিসেবে কাজ করতে না পারে, সে বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের লিখিত নিশ্চয়তাও চেয়েছে তারা।
শিবির জানিয়েছে, বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষার্থী ও সংগঠনটির আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
ফজলুল হক মুসলিম হল প্রভোস্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এখন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রভোস্টের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী হয়রানির অভিযোগে হল অফিস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















