ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মালিক মেটার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ৩০টি অঙ্গরাজ্যের করা একটি মামলার বিচার শুরু হতে যাচ্ছে। মামলায় অভিযোগ, শিশু ও কিশোরদের আকৃষ্ট করে দীর্ঘ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আটকে রাখতে মেটা এমন কিছু ব্যবস্থা ব্যবহার করেছে, যা তাদের গোপনীয়তা ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
মামলায় মেটার কাছে এক লাখ কোটি ডলারের বেশি ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের ব্যবস্থাপনাতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনার দাবি জানিয়েছে অঙ্গরাজ্যগুলো। মেটা মামলায় হেরে গেলে শুধু বিপুল অর্থদণ্ডই নয়, যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তরুণ ব্যবহারকারীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের অভিজ্ঞতাই আমূল বদলে যেতে পারে।
যেসব পরিবর্তন চায় অঙ্গরাজ্যগুলো
মামলাকারীরা কিশোর ব্যবহারকারীদের বয়স যাচাইয়ে অভিভাবকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা চায়। পাশাপাশি তরুণদের বারবার প্ল্যাটফর্মে ফিরিয়ে আনতে ব্যবহৃত আকর্ষণনির্ভর সুপারিশ ব্যবস্থা পরিবর্তন, চেহারা বদলে দেওয়া বিভিন্ন ছবি-ফিল্টার সরানো এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিডিও চালু হওয়া বন্ধ করার দাবি রয়েছে।
একই সঙ্গে একজন কিশোরের একাধিক হিসাব খোলার সুযোগ সীমিত করা এবং নির্দিষ্ট সময় পর অদৃশ্য হয়ে যায় এমন প্রকাশনা বন্ধ করার দাবিও করা হয়েছে। এমনকি প্রকাশনায় কতজন পছন্দ করেছে, সেই সংখ্যাও তরুণদের কাছ থেকে আড়াল করার প্রস্তাব রয়েছে।
মামলাকারী অঙ্গরাজ্যগুলোর দাবি, এসব ব্যবস্থা মূলত ব্যবহারকারীদের যত বেশি সময় সম্ভব মেটার প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখার জন্য তৈরি। ঘন ঘন পাঠানো বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমেও কিশোরদের বারবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফিরিয়ে আনা হয় বলে অভিযোগ তাদের।
মেটা অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য, তরুণদের সহায়তা ও নিরাপত্তার বিষয়ে তাদের দীর্ঘদিনের অঙ্গীকার রয়েছে এবং বিচার চলাকালে প্রমাণের মাধ্যমে সেটিই স্পষ্ট হবে।
মামলার পরিধি বিশাল
মামলাটি ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ৩০টি অঙ্গরাজ্য মিলে দায়ের করে। এর মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউইয়র্কের মতো বড় অঙ্গরাজ্যও রয়েছে। মামলাকারীরা শিশুদের গোপনীয়তা-সংক্রান্ত বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ও অঙ্গরাজ্য আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে।
মামলার বিচার করছেন ক্যালিফোর্নিয়ার কেন্দ্রীয় আদালতের প্রধান বিচারক ইয়োভন গনজালেজ রজার্স। প্রায় দুই দশকের বিচারিক অভিজ্ঞতায় তিনি সরাসরি ও কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত।
মামলায় মেটার বিরুদ্ধে জয়ী হলে অঙ্গরাজ্যগুলো যে পরিবর্তন চাইছে, তার অনেকটাই যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে কার্যকর করার চাপ তৈরি হতে পারে। কারণ মামলায় থাকা অঙ্গরাজ্যগুলোর জনসংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ।
মেটার জন্য নতুন সতর্কবার্তা
এর আগে নিউ মেক্সিকোতে মেটার বিরুদ্ধে করা আরেকটি মামলায় আদালত প্রতিষ্ঠানটিকে প্রায় ৯৪ কোটি ২০ লাখ ডলার জরিমানা করে এবং তরুণ ব্যবহারকারীদের সুরক্ষায় বেশ কিছু পরিবর্তনের নির্দেশ দেয়।
সেখানে ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য প্রকাশনার পছন্দের সংখ্যা দেখানো বন্ধ করা, কিশোরদের মাধ্যমে নগ্ন ছবি আদান-প্রদান নিষিদ্ধ করা এবং নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে অ্যাপের বিজ্ঞপ্তি সীমিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
বিচারক মেটার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবস্থাকে ‘জনসাধারণের জন্য ক্ষতিকর’ বলেও অভিহিত করেন। মেটা ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার কথা জানিয়েছে।
পছন্দের সংখ্যা নিয়েও প্রশ্ন
ফেসবুকের শুরুর সময় থেকেই ‘পছন্দ’ দেওয়ার ব্যবস্থা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। বর্তমানে প্রায় সব বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই এটি ব্যবহারকারীর প্রতিক্রিয়া ও জনপ্রিয়তা বোঝার অন্যতম প্রধান উপায়।
তবে কিশোরদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যাগুলো মানসিক চাপ বাড়াতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। নিজের প্রকাশনার পছন্দের সংখ্যা অন্যদের সঙ্গে তুলনা করার মাধ্যমে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অনুভূতি, বিষণ্নতা এবং আত্মমূল্যবোধের সংকট তৈরি হতে পারে।
মেটার নিজস্ব গবেষণাতেও পছন্দের সংখ্যা নিয়ে সামাজিক তুলনার বিষয়টি উঠে এসেছিল। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ গবেষণায় ইনস্টাগ্রামকেন্দ্রিক এই তুলনার সঙ্গে বেশি একাকিত্ব, নিজের শরীর নিয়ে নেতিবাচক ধারণা এবং খারাপ মেজাজের সম্পর্ক পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বড় বিতর্ক
মামলাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক। যুক্তরাষ্ট্রে একাধিক মামলায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারকে তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির সম্ভাব্য কারণগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
নিউ মেক্সিকোর বিচারকের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তেও মেটার প্ল্যাটফর্মের দীর্ঘদিনের কার্যক্রমকে তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
এখন ৩০টি অঙ্গরাজ্যের আইনজীবীরা একই ধরনের সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য নতুন করে আদালতে যুক্তি তুলে ধরবেন।
মেটার বিরুদ্ধে এই মামলার ফল তাই শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতি বা আইনি দায় নির্ধারণ করবে না। রায় যদি মেটার বিপক্ষে যায়, তাহলে কিশোরদের জন্য ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের নকশা, ব্যবহারপদ্ধতি এবং ব্যবহারকারীদের ধরে রাখার কৌশল—সবকিছুর ওপরই বড় পরিবর্তনের চাপ তৈরি হতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















