দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসের এক কিংবদন্তি চরিত্র শার্ল দ্য গলকে নিয়ে নির্মিত দুই পর্বের চলচ্চিত্র ফ্রান্সে অপ্রত্যাশিত জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বিশেষ করে দেশটির তরুণ প্রজন্মের মধ্যে চলচ্চিত্রটি ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে। জুনে মুক্তির পর এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০ লাখ দর্শক সিনেমাটি দেখেছেন।
প্রতিরোধের ডাক থেকে পর্দায় দ্য গল
১৯৪০ সালের ১৮ জুন। তখনকার তুলনামূলকভাবে অপরিচিত সেনা কর্মকর্তা শার্ল দ্য গল লন্ডনে ব্রিটিশ বেতারকেন্দ্র থেকে ফরাসিদের উদ্দেশে নাৎসি দখলদারিত্ব ও ভিশি সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। সেই ভাষণই পরে ফরাসি প্রতিরোধ আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের সঙ্গে দ্য গলের সম্পর্কও ছিল জটিল। চার্চিল তাকে অনেক সময় অহংকারী, একগুঁয়ে ও মিত্রশক্তির জন্য বিরক্তিকর ব্যক্তি হিসেবে দেখতেন। কিন্তু দ্য গল ফ্রান্সের শক্তি এবং প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে নিজের বিশ্বাস থেকে কখনো সরে আসেননি।
এই ইতিহাসকেই নতুন করে বড় পর্দায় তুলে ধরেছে ‘দ্য ব্যাটল অব দ্য গল’ নামের দুই পর্বের চলচ্চিত্র।
তরুণদের কাছে কেন এত জনপ্রিয়
চলচ্চিত্রটির নির্মাতারা শুরু থেকেই তরুণ দর্শকদের কাছে যুদ্ধ, প্রতিরোধ ও দায়িত্ববোধের বিষয়গুলো পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন। মুক্তির পর প্রথম দিকে অবশ্য সিনেমাটি খুব একটা সাড়া ফেলতে পারেনি। পরে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান বিশেষ প্রদর্শনী আয়োজন করে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয় ব্যক্তিদের মাধ্যমে তরুণদের সিনেমাটি দেখতে উৎসাহিত করে।
বিভিন্ন স্থানীয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে টিকিটও দেয়। এরপর তরুণদের মধ্যে মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে চলচ্চিত্রটির কথা।
প্যারিসের এক ব্যবসায় শিক্ষার্থী জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিনেমাটির কথা শুনেই তিনি বন্ধুদের সঙ্গে দেখতে গিয়েছিলেন। স্কুলে ফ্রি ফ্রেঞ্চ বাহিনী ও দ্য গল সম্পর্কে পড়ানো হলেও চলচ্চিত্রে এমন অনেক বিষয় উঠে এসেছে, যা আগে তিনি জানতেন না।

ইতিহাসের মহাকাব্যিক উপস্থাপন
চলচ্চিত্রটির প্রতিটি পর্ব প্রায় তিন ঘণ্টা দীর্ঘ। নির্মাণে ব্যয় হয়েছে বিপুল অর্থ। প্রথম পর্বে ১৯৪০ সালে দ্য গলের লন্ডন যাত্রা, ফ্রি ফ্রেঞ্চ বাহিনী গঠন এবং নাৎসিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘটনাগুলো তুলে ধরা হয়েছে।
এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো বির হাকেইমের যুদ্ধ। সেখানে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ ফরাসি যোদ্ধা লিবিয়ার মরুভূমিতে প্রায় ৩৭ হাজার নাৎসি সেনার বিরুদ্ধে ১৬ দিন প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এই প্রতিরোধ ব্রিটিশ অষ্টম বাহিনীকে পিছু হটার সুযোগ করে দিয়েছিল।
দ্বিতীয় পর্বে যুদ্ধের পরবর্তী সময় থেকে ১৯৪৪ সালে ফ্রান্সের মুক্তি পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ দেখানো হয়েছে।
দ্য গলের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ফরাসি-আর্মেনীয় অভিনেতা সিমন আবকারিয়ান। উইনস্টন চার্চিলের চরিত্রে রয়েছেন ব্রিটিশ মঞ্চাভিনেতা সিমন রাসেল বিইল।
বর্তমান ফ্রান্সেও দ্য গলের প্রতিধ্বনি
ইতিহাসবিদদের মতে, চলচ্চিত্রটির সাফল্যের পেছনে শুধু যুদ্ধের গল্প কাজ করছে না। বর্তমান ফ্রান্সের রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যেও দ্য গলের চরিত্র নতুন অর্থ পাচ্ছে।
ফ্রান্সে আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দ্য গলের মতো একজন দৃঢ়চেতা নেতার গল্প তরুণদের কাছে বিশেষ আবেদন তৈরি করছে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
ইতিহাসবিদ আলিয়া আগলানের মতে, তরুণরা এমন একজন মানুষকে নতুন করে আবিষ্কার করছে, যিনি ব্যর্থ হয়েছেন, দ্বিধায় পড়েছেন, কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে গেছেন—তবু নিজের অবস্থান থেকে সরে যাননি। এই প্রতিরোধের মানসিকতাই বর্তমান প্রজন্মের সঙ্গে গল্পটির সংযোগ তৈরি করেছে।
সবাই অবশ্য প্রশংসায় একমত নন
তবে চলচ্চিত্রটির সমালোচনাও হয়েছে। দ্য গলবিষয়ক ইতিহাসবিদ ও জীবনীকার আরনো তেইসিয়ের এটিকে অনেকটা চিত্রকাহিনির মতো বলে মনে করেছেন। তার মতে, বড় বাজেট ও শক্তিশালী অভিনয় থাকা সত্ত্বেও চলচ্চিত্রটি দ্য গলের মতো জটিল ঐতিহাসিক চরিত্রের প্রতি পুরোপুরি সুবিচার করতে পারেনি।
তবু দর্শকসংখ্যা বলছে, সমালোচনার মধ্যেও সিনেমাটি ফরাসি জনজীবনে বড় প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে প্রতিরোধ, দেশপ্রেম ও কঠিন সময়ে নিজের অবস্থানে অটল থাকার প্রশ্নগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ফরাসি চলচ্চিত্রে ঐতিহাসিক মহাকাব্য খুব বেশি দেখা যায় না। সেই জায়গায় দ্য গলের গল্পকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই চলচ্চিত্র শুধু অতীতের এক অধ্যায়কে পুনরুজ্জীবিত করেনি, বরং বর্তমান প্রজন্মের কাছেও এক পুরোনো নেতাকে নতুন করে পরিচিত করেছে।
দ্য গল হয়তো আজকের ফ্রান্সের রাজনৈতিক বাস্তবতার সরাসরি উত্তর নন। কিন্তু বিভক্তির সময়ে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে তার গল্প যে এখনো মানুষের মনে শক্তিশালী আবেদন তৈরি করতে পারে, এই চলচ্চিত্রের সাফল্য তারই প্রমাণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















