পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামো নিয়ে আলোচনা করতে গেলে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর কিছু চিন্তা আজও নতুন করে সামনে আসে। তাঁর হাতে লেখা একটি সংক্ষিপ্ত নোটে সংসদীয় ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নিয়ে সংশয় এবং প্রেসিডেন্টশাসিত কাঠামো পাকিস্তানের জন্য তুলনামূলকভাবে উপযোগী হতে পারে—এমন ধারণার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এটি কোনো পূর্ণাঙ্গ সাংবিধানিক নকশা ছিল না। কিন্তু এতে স্পষ্ট যে স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনার উপযুক্ত কাঠামো নিয়ে জিন্নাহ গভীরভাবে ভাবছিলেন।
প্রায় আট দশক পর পাকিস্তানে একই প্রশ্ন আবারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে বিষয়টি গণতন্ত্রের বিকল্প খোঁজা নয়। বরং প্রশ্ন হলো—কীভাবে এমন একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তৈরি করা যায়, যেখানে রাষ্ট্র পরিচালনায় দলীয় আনুগত্যের চেয়ে যোগ্যতা, সততা, জ্ঞান ও বাস্তব সাফল্য বেশি গুরুত্ব পাবে?
রাষ্ট্রের সংকটের গভীরে যে সমস্যা
পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, ঋণের বোঝা, দুর্বল রপ্তানি, দারিদ্র্য, দুর্নীতি এবং বারবার আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের দ্বারস্থ হওয়া—এসবকে আলাদা আলাদা সমস্যা হিসেবে দেখলে মূল সংকটটি ধরা পড়বে না। এর পেছনে রয়েছে এমন একটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো, যেখানে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োগের ক্ষেত্রে দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য, প্রভাব এবং প্রতিষ্ঠিত স্বার্থ অনেক সময় বেশি কার্যকর হয়ে ওঠে।
জিন্নাহর বিভিন্ন বক্তব্যে যে রাষ্ট্রচিন্তা ফুটে ওঠে, তার কেন্দ্রবিন্দু ছিল জনগণের কল্যাণ। নারী অধিকার, দরিদ্র মানুষের প্রতি বিশেষ মনোযোগ, দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন, নাগরিক সমতা, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা, শিক্ষা ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তিকে অগ্রাধিকার, জাতীয় ঐক্য, সরকারি কর্মচারীদের সততা এবং সরকারের ওপর কার্যকর সমালোচনার সুযোগ—এসব তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অর্থনৈতিক ও সামন্ততান্ত্রিক আধিপত্যের বিরুদ্ধেও তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট। তিনি সতর্ক করেছিলেন এমন এক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যেখানে জমিদার ও পুঁজিশালী গোষ্ঠী সাধারণ মানুষের ওপর শোষণ চালিয়ে নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখে। আজকের বাস্তবতায় সেই সতর্কবার্তার অর্থ হলো—যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা যোগ্যতা ও সামাজিক গতিশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করে, তা শেষ পর্যন্ত দেশের অর্থনৈতিক শক্তিকেও দুর্বল করে।
![]()
প্রথম পরিবর্তন: রাষ্ট্র পরিচালনায় যোগ্যতার প্রাধান্য
পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে জরুরি সংস্কার হতে পারে এমন একটি শাসনব্যবস্থা, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ব্যক্তির নির্বাচন হবে প্রমাণিত দক্ষতার ভিত্তিতে।
একজন অর্থনীতিবিদ বা দক্ষ আর্থিক বিশেষজ্ঞ অর্থ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্ব দেবেন, স্বাস্থ্য খাত পরিচালনা করবেন অভিজ্ঞ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাবেন শিক্ষাক্ষেত্রে স্বীকৃত পেশাজীবী এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নেতৃত্বে থাকবেন সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানী বা উদ্ভাবক—এটাই হওয়া উচিত স্বাভাবিক কাঠামো।
একই নীতি আমলাতন্ত্রের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। শুধু দীর্ঘ চাকরির অভিজ্ঞতা কোনো ব্যক্তিকে একটি বিশেষায়িত মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য যথেষ্ট করে না। প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, গবেষণা, পেশাগত সাফল্য, রপ্তানি বৃদ্ধি কিংবা সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে পরিমাপযোগ্য অর্জনকে নিয়োগের প্রধান মানদণ্ড করতে হবে।
সরকারকে ফলাফল দিয়ে বিচার করতে হবে
মন্ত্রী ও সচিবদের দায়িত্ব শুধু নীতিঘোষণা বা নতুন প্রকল্পের ঘোষণা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পরিমাপযোগ্য কর্মদক্ষতার চুক্তি থাকা প্রয়োজন। বছরে অন্তত একবার স্বাধীনভাবে তাদের কাজ মূল্যায়ন করা যেতে পারে।
যে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে বারবার ব্যর্থ হবেন, তাঁর পদে থাকার যৌক্তিকতাও প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে। সরকার কতটি ঘোষণা দিয়েছে, কতটি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে কিংবা কত প্রচারণা চালিয়েছে—এসব নয়; আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত, মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতে কী পরিবর্তন এসেছে।
শিক্ষা ও গবেষণাকে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার বাইরে নিতে হবে
জিন্নাহর রাষ্ট্রচিন্তায় শিক্ষার গুরুত্ব ছিল মৌলিক। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শুধু ডিগ্রিধারী নয়, দায়িত্বশীল, দক্ষ এবং অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজন তিনি উপলব্ধি করেছিলেন।
সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে শিক্ষা ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি খাতে নির্দিষ্ট মাত্রার সরকারি ব্যয় সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত করা যেতে পারে। প্রস্তাব হতে পারে মোট দেশজ উৎপাদনের অন্তত ৬ শতাংশ শিক্ষা এবং ৪ শতাংশ বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বরাদ্দ রাখা। এর ফলে এসব খাত আর প্রতি বছর বাজেটের চাপের মুখে নির্বিচারে কাটছাঁটের শিকার হবে না।
আরও কঠোর একটি ব্যবস্থা হতে পারে সরকারি কর্মকর্তা ও নীতিনির্ধারকদের নিজেদের সন্তানদের সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার বাধ্যবাধকতা। যারা দেশের স্কুল, কলেজ, শিক্ষক ও গবেষণাগারের মান নির্ধারণ করবেন, তাদের নিজেদের পরিবারও যদি সেই ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে সরকারি শিক্ষার মান উন্নয়ন আর কেবল নীতিগত প্রতিশ্রুতি থাকবে না; তা ব্যক্তিগত বাস্তব প্রয়োজনেও পরিণত হবে।
ঋণনির্ভরতা থেকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে
পাকিস্তানের অর্থনীতির আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো কম মূল্য সংযোজনকারী পণ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। ধার করে ভোগ বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে সমৃদ্ধি তৈরি করা যায় না। প্রয়োজন এমন রপ্তানি অর্থনীতি, যেখানে প্রযুক্তি ও জ্ঞান হবে মূল সম্পদ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সফটওয়্যার, ওষুধ, টিকা, ইলেকট্রনিকস, প্রকৌশলপণ্য, আধুনিক কৃষি, প্রক্রিয়াজাত খনিজ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি, বিশেষায়িত রাসায়নিক এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির মতো খাতে দ্রুত সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
প্রতিটি বড় মন্ত্রণালয়কে নির্দিষ্ট রপ্তানি লক্ষ্য দেওয়া যেতে পারে। সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে কয়েক বছরের মধ্যে বছরে অতিরিক্ত কয়েক বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে হবে। বহু খাত একই সঙ্গে এই লক্ষ্য অর্জন করতে পারলে পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থান, কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
ক্ষমতা শুধু কেন্দ্রের হাতে থাকলে চলবে না
কার্যকর সরকার মানে শুধু ইসলামাবাদে দক্ষ প্রশাসন নয়। জনগণের কাছে রাষ্ট্রীয় সেবা পৌঁছে দিতে হলে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণও অপরিহার্য।
পানি, স্যানিটেশন, স্থানীয় সড়ক, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং পৌর সুবিধার মতো বিষয় স্থানীয় পর্যায়ে সবচেয়ে ভালোভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। তাই প্রাদেশিক অর্থের বড় অংশ স্বচ্ছ সূত্রের ভিত্তিতে জেলা, পৌরসভা, শহর ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পৌঁছানো দরকার। জনসংখ্যা, দারিদ্র্য, অবকাঠামোগত ঘাটতি এবং কাজের দক্ষতার মতো সূচক এর ভিত্তি হতে পারে।
প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতে পাকিস্তান ছোট আকারের আরও বহু প্রশাসনিক প্রদেশ তৈরির বিষয়ও বিবেচনা করতে পারে। তবে সীমানা নির্ধারণের ভিত্তি হওয়া উচিত জনসংখ্যা, ভৌগোলিক বাস্তবতা, যোগাযোগ, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও প্রশাসনিক সুবিধা—জাতিগত বা ভাষাগত পরিচয় নয়। ছোট প্রশাসনিক ইউনিট জনগণের কাছে সরকারকে আরও সহজলভ্য করতে এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে সেবা প্রদানের প্রতিযোগিতা তৈরি করতে পারে।

প্রেসিডেন্টশাসিত ব্যবস্থাও হতে হবে গণতান্ত্রিক
এ ধরনের সংস্কারের অর্থ গণতন্ত্রকে দুর্বল করা নয়। বরং রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো এমনভাবে সাজানো, যাতে গণতান্ত্রিক বৈধতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা একসঙ্গে কাজ করে।
সংসদকে আইন প্রণয়ন ও নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, সংবাদমাধ্যম এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন থাকতে হবে। সরকারের সমালোচনা ও বিরোধী মতকে গণতন্ত্রের দুর্বলতা নয়, বরং রাষ্ট্রের আত্মসংশোধনের অপরিহার্য উপাদান হিসেবে দেখতে হবে।
তাই প্রেসিডেন্টশাসিত ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হলে সেটিকে কর্তৃত্ববাদী শাসনের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক হবে না। একটি নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে সরকার গঠন করতে পারেন, কিন্তু সেই সরকারকেও সংবিধান, সংসদ, বিচার বিভাগ ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকতে হবে।
পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় ঘাটতি প্রতিভার নয়
পাকিস্তানে দক্ষ বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, অর্থনীতিবিদ, উদ্যোক্তা ও পেশাজীবীর অভাব নেই। সমস্যাটি হলো—রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় তাদের দক্ষতা যথেষ্ট পরিমাণে কাজে লাগানো হয়নি।
সুতরাং পাকিস্তানের সামনে আসল দ্বন্দ্ব গণতন্ত্র বনাম দক্ষতার নয়। প্রয়োজন দুটির সমন্বয়। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার বদলে যোগ্যতা, সামন্তীয় প্রভাবের বদলে সমান সুযোগ, অতিরিক্ত কেন্দ্রীয়করণের বদলে স্থানীয় ক্ষমতায়ন এবং ঋণ ও কম মূল্যমানের উৎপাদনের বদলে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও উচ্চমূল্যের রপ্তানিকে রাষ্ট্রীয় নীতির কেন্দ্রে আনতে হবে।
একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান শুধু ক্ষমতা বণ্টন করে না, যোগ্য মানুষকে দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগও দেয়। পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সেই পরিবর্তন কতটা বাস্তবভাবে করা যায় তার ওপর।
আত্তা-উর-রহমান 


















