মরক্কোর উত্তরাঞ্চলীয় শহর ফনিদেক থেকে স্পেনের নিয়ন্ত্রিত সেউতা অঞ্চলের দূরত্ব মাত্র কয়েক কিলোমিটার। কিন্তু উন্নত জীবনের আশায় সেই সীমান্ত পাড়ি দিতে চাওয়া মানুষগুলোর স্বপ্ন আর সেখানে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া স্থানীয়দের বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান অনেক গভীর।
জুলাইয়ের শেষ দিকে মরক্কো থেকে সেউতায় যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। এরপর আগস্টের মাঝামাঝি আবারও বড় ধরনের সীমান্ত পারাপারের আহ্বান ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তবে আগের চেষ্টায় প্রায় ১০০ মানুষের মৃত্যুর খবর এবং সেউতায় পৌঁছানো অনেকের পরবর্তীতে মরক্কোয় ফিরে আসা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার শেষ কোথায়?
অনিশ্চয়তার মধ্যে সন্তানদের নিয়ে এক মা
কাসাব্লাঙ্কা থেকে দুই সন্তানকে নিয়ে ফনিদেকে এসেছেন মালিকা। তিন বছর বয়সী মেয়ে ও আট বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে তিনি শহরের রাস্তায় ঘুরছেন। কখনো খাবারের সন্ধানে, কখনো সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার সুযোগের অপেক্ষায়। থাকার মতো ঘর না থাকায় খোলা আকাশের নিচেও রাত কাটাতে হয়েছে তাদের।
মালিকার ভাষায়, দেশে তাঁর জীবন একেবারে ভেঙে পড়েছে। স্বামী চরম দারিদ্র্যের কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। কখনো কখনো তিনি বাড়ি ছেড়ে চলে যান, ফলে দুই সন্তানকে নিয়ে একাই অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয় মালিকাকে।
এই পরিস্থিতিতেই তাঁর বিশ্বাস, সেউতায় পৌঁছাতে পারলে সন্তানদের জন্য শিক্ষা ও কোনো ধরনের সহায়তার সুযোগ তৈরি হবে। সেই আশাতেই ভয়ংকর ঝুঁকি জেনেও তিনি সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন।
কাজ নেই, ভবিষ্যৎ নেই—তরুণদের হতাশা
২২ বছর বয়সী আহমেদ আমহিদ এসেছেন মধ্য মরক্কোর ওয়াদ জেম শহর থেকে। নিজের এলাকায় কাজের সুযোগ না থাকায় তাঁর মনে হয়েছে সেখানে তাঁর ভবিষ্যৎ নেই। সেউতায় যাওয়ার সম্ভাবনার কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখে তিনি ফনিদেকে চলে আসেন।
রাস্তায় আত্মীয়ের সঙ্গে পানীয় বিক্রি করে যা আয় করেন, তা দিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ গড়া সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, দেশে কর্মসংস্থান, শিল্পপ্রতিষ্ঠান কিংবা পর্যাপ্ত ব্যবসার সুযোগ নেই।
মরক্কোর গণমাধ্যম ও সংস্কৃতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আহমেদ আল-দাফরির মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তরুণদের এই ধরনের যাত্রায় বড় ভূমিকা রাখছে। অতীতে সীমান্ত পাড়ি দিতে সফল হওয়া ব্যক্তিদের ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে অনেকের মধ্যে ধারণা তৈরি হয় যে সবাই চলে যাচ্ছে, শুধু তারা পিছিয়ে আছে।
এভাবে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া আহ্বান এক ধরনের সমষ্টিগত মানসিকতা তৈরি করছে। ফলে অনেক তরুণ মনে করছেন, এই দলে যোগ না দিলে তাঁরা যেন আরও পিছিয়ে পড়বেন।
সবাই অবশ্য দেশ ছাড়তে চান না
ফনিদেকের সীমান্ত এলাকার কাছাকাছি ৩০ বছর বয়সী মোহাম্মদ আল-দামির সঙ্গে দেখা হয়। দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভালো নয়—এ কথা স্বীকার করলেও তিনি মরক্কো ছাড়ার কথা কখনো ভাবেননি।
তাঁর যুক্তি, জীবিকা চালানোর সুযোগ থাকলে নিজের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়ে সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার কোনো মানে নেই। সেউতায় পৌঁছানো গেলেও সেখানে যাওয়ার জন্য যে বিপদ ও কষ্ট সহ্য করতে হয়, তা তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
জুলাইয়ের শেষ দিকে সীমান্তের দিকে মানুষের ঢল দেখেও তিনি তাতে যোগ দেননি। তাঁর বিশ্বাস, ভবিষ্যৎ নিয়ে যত অনিশ্চয়তাই থাকুক, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী জীবিকা চালিয়ে যাওয়াই নিরাপদ পথ।
আগস্টের মাঝামাঝি আবার সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার আহ্বান ছড়িয়ে পড়লেও কঠোর নিরাপত্তা প্রস্তুতি দেখে তিনি মনে করেছিলেন, এবারও চেষ্টা সফল হবে না। বিশেষ করে আগে সেউতায় যাওয়া অনেক মানুষ ফিরে আসায় স্থানীয়দের মধ্যে এমন অভিযানের আগ্রহও কমে গেছে বলে তাঁর ধারণা।
অভিবাসনের প্রভাব পড়ছে ফনিদেকের অর্থনীতিতে
ফনিদেকের ব্যবসায়ী মুনির হামদুচও কখনো দেশ ছাড়ার কথা ভাবেননি। তবে তিনি স্বীকার করেন, শহরের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠেছে। ২০১২ সাল থেকে ব্যবসা করছেন তিনি এবং পর্যটন কমে যাওয়ায় মৌসুমি ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল মানুষজন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
তাঁর মতে, শহরে নতুন অর্থনৈতিক কার্যক্রম ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। অনেক প্রকল্প থেমে আছে, আবার কিছু প্রকল্প তৈরি হলেও এখনো চালু হয়নি।
স্থানীয় নাগরিক সমাজকর্মী মোহাম্মদ আজুজের মতে, অভিবাসনের কারণে ফনিদেকের চরিত্রও বদলে গেছে। একসময় শহরটি অভিবাসীদের জন্য শুধু যাত্রাপথ হিসেবে ব্যবহৃত হলেও এখন অনেকের কাছে এটি অপেক্ষার ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে।
এর প্রভাব পড়েছে শহরের অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতিতে। একই সঙ্গে পর্যটন আকর্ষণও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে এসবের মধ্যেও হামদুচ নিজের দোকান ও পরিবার ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন না। তাঁর কাছে অল্প আয় হলেও সন্তানদের খাবার জোগাতে পারাটাই বড় কথা।
সেউতার স্বপ্ন কতটা বাস্তব?
ফনিদেকের রাস্তায় থাকা মানুষগুলোর গল্পে দুটি ভিন্ন বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ তরুণেরা উন্নত জীবনের আশায় সীমান্ত পাড়ি দিতে চান। অন্যদিকে স্থানীয় অনেক মানুষ মনে করেন, বিপজ্জনক পথে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পেছনে ছোটা সমাধান নয়।
সেউতার কয়েক কিলোমিটারের দূরত্ব তাই শুধু একটি সীমান্তের ব্যবধান নয়; এটি মরক্কোর অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক হতাশা, অভিবাসনের আকাঙ্ক্ষা এবং নিরাপদ জীবনের সন্ধানে মানুষের মরিয়া হয়ে ওঠার প্রতিচ্ছবি।
মালিকার মতো মানুষের কাছে সেউতা এখনো আশার শেষ ঠিকানা। আর আল-দামি বা হামদুচের মতো স্থানীয়দের কাছে নিজের দেশেই সামান্য আয় করে পরিবারকে নিয়ে টিকে থাকাই জীবনের সবচেয়ে বাস্তব পথ।
সেউতার স্বপ্ন তাই কারও কাছে নতুন জীবনের প্রতিশ্রুতি, আবার কারও চোখে ভয়ংকর এক অনিশ্চিত যাত্রা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















