ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ যখন সৌদি আরবের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, ঠিক তখনই নিজেদের প্রতিরক্ষা শক্তি বাড়াতে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে রিয়াদ। মুসলিম বিশ্বের দুই শক্তিশালী সামরিক দেশ পাকিস্তান ও তুরস্ককে সঙ্গে নিয়ে একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে সৌদি আরব।
মক্কায় শুক্রবার স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলা হলে সেটিকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ফলে সৌদি আরবে বড় ধরনের হামলা হলে পাকিস্তান ও তুরস্কও সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।
ন্যাটোর আদলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
চুক্তির ঘোষিত লক্ষ্য হলো সম্ভাব্য আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ শক্তিশালী করা এবং তিন দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সব ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত করা। তবে কোন পরিস্থিতিতে কোন দেশ কী ধরনের সামরিক সহায়তা দেবে, সে বিষয়ে চুক্তিতে বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করা হয়নি।
এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সহযোগিতার পাশাপাশি রিয়াদ আরও একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বলয় পেল। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়ে নানা প্রশ্নের মধ্যে সৌদি আরবের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তুরস্কের রয়েছে উত্তর আটলান্টিক জোটের দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তি। অন্যদিকে পাকিস্তান মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ। ফলে দুই দেশের সামরিক সক্ষমতা সৌদি আরবের প্রতিরোধ ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে।
ইরানকে ঘিরে বাড়ছে উত্তেজনা
চুক্তিটি সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয় বলে তুরস্কের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বলেছে, এটি কোনো সামরিক অক্ষ বা সাম্প্রদায়িক জোট গঠনের উদ্যোগ নয়। এমনকি ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলোকেও এই জোটে যুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।
তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে চুক্তিটির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে ইরানের ওপর। যুদ্ধ চলাকালে ইরান সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো এবং মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এপ্রিলের ৮ তারিখের যুদ্ধবিরতির পর সরাসরি হামলা অনেকটা কমলেও ইরান-সমর্থিত ইয়েমেন ও ইরাকের বিভিন্ন গোষ্ঠী সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
সৌদি কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর সহায়তায় ইরান-সমর্থিত ইয়েমেন ও ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সমন্বিত বড় ধরনের হামলা চালাতে পারে।
পাকিস্তান ও তুরস্কও ঝুঁকির মধ্যে
পাকিস্তান ও তুরস্ক—দুই দেশই ইরানের সঙ্গে সীমান্ত ভাগ করে। ফলে কোনোভাবেই যুদ্ধের বিস্তার চায় না তারা। পাকিস্তানকে একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক এবং দেশের বড় শিয়া জনগোষ্ঠীর বিষয়টি সামলাতে হচ্ছে।
অন্যদিকে তুরস্ক ও ইরানের মধ্যে বিভিন্ন আঞ্চলিক বিষয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদ নিয়ে দুই দেশের অভিন্ন উদ্বেগ রয়েছে। ফলে তুরস্কও সরাসরি ইরান-সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে সতর্ক।
তবু নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি পরিস্থিতিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। সৌদি আরবে বড় ধরনের হামলা হলে চুক্তির আওতায় পাকিস্তান ও তুরস্ককে সামরিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হতে পারে। এতে বর্তমান যুদ্ধ দ্রুত আরও বড় আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
তেহরানের কড়া প্রতিক্রিয়া

মক্কার চুক্তিতে ইরানের অসন্তোষও প্রকাশ পেয়েছে। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সদস্য ইব্রাহিম রেজাই বলেছেন, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে কাগজে-কলমে চুক্তি করলেই সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘদিনের একতরফা নির্ভরতার মতো এই নতুন চুক্তিও সৌদি আরবকে প্রকৃত নিরাপত্তা দিতে পারবে না।
যুদ্ধের পরিধি বাড়ার আশঙ্কা
সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে ইরান-সংঘাত আরও তীব্র করার বিরোধিতা করে আসছে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে উত্তেজনা বাড়ানো থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেছে। কিন্তু একাধিক দিক থেকে সৌদি ভূখণ্ডে হামলার আশঙ্কা রিয়াদের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই বাস্তবতায় পাকিস্তান ও তুরস্ককে সঙ্গে নিয়ে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি তেহরানের জন্য স্পষ্ট একটি সতর্কবার্তা। সৌদি আরবে বড় ধরনের হামলা হলে তা শুধু সৌদি-ইরান সংঘাত হিসেবে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে; এতে পাকিস্তান ও তুরস্কও জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। আর তখন মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ আরও বিস্তৃত ও ভয়াবহ আঞ্চলিক সংঘাতে পরিণত হতে পারে।
সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সামরিক সম্পর্ক অবশ্য নতুন নয়। গত বছরের সেপ্টেম্বরেই দুই দেশ আনুষ্ঠানিক পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছিল। এবার তুরস্ক যুক্ত হওয়ায় সেই নিরাপত্তা কাঠামো আরও শক্তিশালী রূপ পেল।
ইরান-সংঘাত যত ঘনীভূত হচ্ছে, মক্কার এই চুক্তি ততই মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সামরিক সমীকরণের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















