ইন্দোনেশিয়ার বোর্নিও দ্বীপের কালিমান্তান অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক মৌসুমের মধ্যে বন ও ভূমিতে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। জমি পরিষ্কারে আগুন ব্যবহার, সীমিত স্থানীয় সক্ষমতা এবং আবহাওয়া পরিবর্তন কর্মসূচির কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। শুক্রবার দ্বীপটির পাঁচটি প্রদেশেই অগ্নিকাণ্ডের হটস্পট শনাক্ত হয়েছে।
পূর্ব কালিমান্তানের কুতাই কার্তানেগারা এলাকার স্থানীয় বন বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, সেখানে আগুন লাগার ঘটনা আগের তুলনায় ঘন ঘন ঘটছে এবং তীব্রতাও বাড়ছে। তাঁর আশঙ্কা, বন ও ভূমির আগুন এখনো সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
আগুনের পেছনে জমি পরিষ্কারের অভিযোগ
স্থানীয় প্রশাসন নজরদারি ও অগ্নিনির্বাপণ তৎপরতা বাড়ালেও তাদের সক্ষমতা সীমিত বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা। তাঁর দাবি, তেলপাম বাগানসহ বিভিন্ন কাজে জমি পরিষ্কারের জন্য ব্যক্তি ও কোম্পানির পক্ষ থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন ব্যবহারের ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
কিছু এলাকায় আবহাওয়া পরিবর্তন কর্মসূচির মাধ্যমে বৃষ্টি নামানো সম্ভব হলেও বাড়তে থাকা অগ্নিকেন্দ্র সামাল দিতে আরও অর্থ, সরঞ্জাম ও জনবল প্রয়োজন। বিশেষ করে অগ্নিনির্বাপণকর্মীদের জন্য অতিরিক্ত পানির পাম্পের প্রয়োজন রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয়সংকোচন নীতির কারণে স্থানীয় প্রশাসনের বাজেট কমে যাওয়ায় আগুন মোকাবিলার সক্ষমতাও কমেছে বলে ওই কর্মকর্তা জানান।
নাসার অগ্নিনজরদারি ব্যবস্থায় কালিমান্তানের বিস্তীর্ণ এলাকায় হটস্পটের ঘনত্ব দেখা গেছে, যার মধ্যে পশ্চিম কালিমান্তানে সবচেয়ে বেশি কেন্দ্র শনাক্ত হয়েছে। বন মন্ত্রণালয়ের নজরদারি ব্যবস্থায় শুক্রবার পাঁচ প্রদেশজুড়ে ৩ হাজারের বেশি হটস্পট রেকর্ড করা হয়। তবে মন্ত্রণালয়ের হিসাবে উচ্চমাত্রায় নিশ্চিত হটস্পটের সংখ্যা বৃহস্পতিবারের ১ হাজার ৫৬৩ থেকে শুক্রবার কমে ১১৬ হয়েছে।
ধোঁয়ায় কমছে দৃশ্যমানতা, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
আগুনের ধোঁয়ায় কালিমান্তানের বিভিন্ন এলাকায় দৃশ্যমানতা ও বায়ুর মান দ্রুত অবনতি হয়েছে। পশ্চিম কালিমান্তানের পন্তিয়ানাকে বৃহস্পতিবার দৃশ্যমানতা ছিল ৪ কিলোমিটার এবং মধ্য কালিমান্তানের পালাংকারায়ায় ৬ কিলোমিটার। ধোঁয়ার কারণে পালাংকারায়ার তজিলিক রিউত বিমানবন্দরে সাময়িকভাবে উড়োজাহাজ চলাচলও বিঘ্নিত হয়।
বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ার শুক্রবার সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় অস্বাস্থ্যকর বায়ু পরিস্থিতির কথা জানিয়েছে। পশ্চিম কালিমান্তানের কিছু এলাকায় বায়ুর মান বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছায়। পাশের মালয়েশিয়ার সারাওয়াক রাজ্যেও ধোঁয়ার কারণে গত সপ্তাহে ১০০টির বেশি স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছিল।
আগুন নেভাতে ৫২টি উড়োজাহাজ
পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় সরকার উচ্চঝুঁকির এলাকাগুলোতে অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম জোরদার করেছে। দেশজুড়ে পানি ছিটানো, আবহাওয়া পরিবর্তনসহ বিভিন্ন অভিযানে ৫২টি উড়োজাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে।
তবে ইন্দোনেশিয়ার আবহাওয়া, জলবায়ু ও ভূ-ভৌতবিদ্যা সংস্থা সতর্ক করেছে, আগামী ১০ দিন আবহাওয়া পরিবর্তন কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় মেঘের উপস্থিতি সীমিত থাকতে পারে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, কালিমান্তানে বর্ষা শুরু হতে পারে অক্টোবরের মাঝামাঝি। ফলে এর আগের কয়েক সপ্তাহেও আগুন ও ধোঁয়ার ঝুঁকি অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
পরিবেশবাদীদের প্রশ্ন, একই পদ্ধতি কতদিন?
ইন্দোনেশিয়ান ফোরাম ফর দ্য এনভায়রনমেন্টের কর্মী উলি আর্থা সিয়াগিয়ান বলেছেন, প্রতিবছর শুধু আবহাওয়া পরিবর্তন কর্মসূচির ওপর নির্ভর না করে আগুনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি ও কনসেশনধারীদের কর্মকাণ্ডও কঠোরভাবে মোকাবিলা করা প্রয়োজন।
পশ্চিম কালিমান্তানের পরিবেশবাদীরা জানিয়েছেন, প্রাকৃতিকভাবে পানি ধরে রাখার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী পিটভূমি ইতোমধ্যেই সংকটে রয়েছে। শত শত তেলপাম বাগানের অনুমতি ও অন্যান্য বন ব্যবহারের কনসেশনের কারণে এসব এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তাদের দাবি।
বন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগুনের কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন দেওয়া, অবহেলা বা বন ও ভূমির আগুন নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে পরিবেশ মন্ত্রণালয় দক্ষিণ সুমাত্রার ওগান কোমেরিং ইলির একটি তেলপাম কোম্পানির কনসেশনের অংশ সিল করে দিয়েছে। পরিদর্শনে সেখানে দুটি অগ্নিকবলিত এলাকা শনাক্ত হয়েছে, যার একটি প্রায় ৪৫৪ হেক্টরজুড়ে কোম্পানিটির কনসেশনের ভেতরে অবস্থিত। আগুনের কারণ নিয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















