ওয়াশিংটন পোস্টের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, মার্কিন কংগ্রেসম্যান ম্যাক্স মিলারের দুই বছর বয়সী মেয়ের কলারবোন ভাঙার ঘটনায় কয়েক মাসের তদন্তের পরও দায়ী ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ ও শিশু কল্যাণ কর্তৃপক্ষ। শিশুটির শরীরে পাওয়া একটি কালশিটে চিকিৎসকদের কাছে হাতের ছাপের মতো মনে হয়েছিল। এ ঘটনায় মিলার ও তাঁর সাবেক স্ত্রী এমিলি মোরেনোর পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং চলমান সন্তানের হেফাজত বিরোধও সামনে এসেছে।
সন্দেহের সূত্র হাতের ছাপের মতো কালশিটে
১৯ ফেব্রুয়ারি এক্স-রে পরীক্ষায় শিশুটির ডান দিকের কলারবোন ভাঙা ধরা পড়ে। তবে চিকিৎসকদের সবচেয়ে বেশি সন্দেহ তৈরি করে ডান কাঁধের কাছে থাকা কালশিটে। পুলিশি নথি অনুযায়ী, ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের এক চিকিৎসকের ধারণা ছিল, পেছন থেকে বাঁ হাত দিয়ে শিশুটিকে ধরলে এমন দাগ তৈরি হতে পারে। কালশিটেটিতে বুড়ো আঙুলের ছাপের মতো চিহ্নও দেখা গিয়েছিল। চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানটি পরে বিষয়টি শিশু কল্যাণ সংস্থাকে জানায় এবং সেখান থেকে পুলিশকে অবহিত করা হয়।
ঘটনার আগের কয়েক দিনও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। ১৬ ফেব্রুয়ারি শিশুটিকে বাড়িতে পরীক্ষা করেছিলেন এক শিশু বিশেষজ্ঞ। স্ট্রেপ গলার সংক্রমণ ধরা পড়লেও তখন কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। পরদিন মিলার মেয়েকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। ১৮ ফেব্রুয়ারি সকালে ন্যানির সঙ্গে শিশুটি মায়ের বাড়িতে ফেরে। ওই বিকেলে গোসলের সময় মোরেনো ঘাড়ের কাছে বড় কালশিটে দেখতে পান। চাপ দিলে শিশুটি কেঁদে ওঠে এবং ডান হাত তুলতে অস্বস্তি প্রকাশ করে।
মা-বাবার পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
ঘটনার পর মিলার প্রথমে ধারণা করেন, গাড়ির সিটের কারণে আঘাতটি হয়ে থাকতে পারে। পরে তিনি তাঁর সাবেক স্ত্রীকে দায়ী করতে শুরু করেন। পুলিশকে তিনি বলেন, মোরেনোই হয়তো মেয়েকে আঘাত করেছেন। অন্যদিকে মোরেনোর সন্দেহ ছিল, মিলারের হেফাজতে থাকার সময়ই শিশুটি আহত হয়ে থাকতে পারে।
মোরেনো তদন্তকারীদের বলেন, মিলার রেগে গেলে তাঁকে ভয় পেতে হতো। তাঁর দাবি, একবার শিশুর ডায়াপার বদলানোর সময় মিলার তাঁর মাথায় বন্দুক ধরেছিলেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, অন্য এক ঘটনায় মিলার তাঁকে দেয়ালে ছুড়ে ফেলেছিলেন। মিলার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। পুলিশি নথি অনুযায়ী, মোরেনো এ অভিযোগগুলোর একটি নিয়ে আনুষ্ঠানিক পুলিশ প্রতিবেদনও করেননি।
তদন্তে চারজনের ওপর নজর
শিশুটির কাছে থাকার সুযোগ ছিল এমন চারজন প্রাপ্তবয়স্ক—মোরেনো, মিলার, মিলারের বান্ধবী ও ন্যানিকে তদন্তকারীরা জিজ্ঞাসাবাদ করেন। সবাই শিশুটিকে আঘাত করার কথা অস্বীকার করেন এবং আঘাতটি কীভাবে হয়েছে তা জানেন না বলে জানান।
ন্যানি দুর্ঘটনার সম্ভাবনাকে বেশি মনে করেছিলেন। তদন্তকারীরা ১৮ ফেব্রুয়ারি শিশুটিকে নিয়ে তাঁর লাইব্রেরিতে যাওয়ার ভিডিওও বিশ্লেষণ করেন। সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে শিশুটিকে দুই হাত ব্যবহার করে ছবি আঁকতে, ১০টা ৫০ মিনিটে দুই হাত ওপরে তুলতে এবং ১১টা ১৯ মিনিটে ডান হাত ব্যবহার করতে দেখা যায়। তবে প্রায় সাত মিনিট তারা ক্যামেরার বাইরে ছিল। ফলে শিশুটি লাইব্রেরিতে নাকি তার আগেই আহত হয়েছিল, তা নির্ধারণ করতে পারেনি পুলিশ।
তদন্তে মিলারের বিরুদ্ধেও অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি
২৬ ফেব্রুয়ারি মিলার দুই আইনজীবীকে সঙ্গে নিয়ে পুলিশের কাছে হাজির হন। তিনি বলেন, মেয়ের কী হয়েছে তিনি জানেন না এবং জানলে দায়িত্ব নিতেন। পরে তিনি মোরেনোর বিরুদ্ধে শিশুকে মানসিক বা আবেগগতভাবে নির্যাতনের সম্ভাবনার কথা বলেন এবং শেষ পর্যন্ত মেয়ের আঘাতের জন্য তাঁকেই সন্দেহ করতে শুরু করেন।
মিলার পুলিশকে এমন একটি ছবিও দেন, যেখানে ঘটনার আগের দিন শিশুটিকে গোসলের সময় হাত ওপরে তোলা অবস্থায় দেখা যায় এবং কোনো দৃশ্যমান কালশিটে ছিল না। এর আগে ২০২৫ সালে শিশুটি দুই দিন হাসপাতালে থাকার ঘটনায়ও মোরেনো তাঁকে নির্যাতনের অভিযোগ করেছিলেন বলে মিলার জানান। ওই অভিযোগকে শিশু ও পরিবার কল্যাণ সংস্থা ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছিল এবং তখন দুই ডে-কেয়ার কর্মীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত অমীমাংসিত রয়ে গেল রহস্য
১৮ মার্চ পুলিশ, শিশু ও পরিবার কল্যাণ সংস্থা এবং ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের প্রতিনিধিরা তদন্তের তথ্য পর্যালোচনা করেন। তাঁদের আলোচনায় কালশিটেটিকে সন্দেহজনক এবং উচ্চমাত্রার আঘাতের সম্ভাব্য ফল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আঘাতটি কখন ঘটেছে, তা নির্ধারণ করা যায়নি। কালশিটের ধরন বিবেচনায় গাড়ির সিটের তত্ত্বও বাদ দেওয়া হয়।
এপ্রিলে শিশু ও পরিবার কল্যাণ সংস্থা জানায়, মিলারের বিরুদ্ধে শিশুকে নির্যাতনের অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে সংস্থাটি এমন একটি সিদ্ধান্ত দেয়, যাতে বলা হয় শিশুনির্যাতন ঘটে থাকতে পারে, কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তি অজ্ঞাত। একই সঙ্গে পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগটিও ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করা হয়।
মে মাসে প্রসিকিউটর কার্যালয় পুলিশকে জানায়, মামলাটি গ্র্যান্ড জুরির কাছে নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত গ্রহণযোগ্য প্রমাণ নেই। পুলিশি প্রতিবেদনের শেষ কথাই ছিল—মামলা বন্ধ, এবং বিচারিক কার্যক্রম না চালানোর সিদ্ধান্ত।
এদিকে তদন্তের তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর মিলারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও চাপ তৈরি হয়। জুলাইয়ে তাঁকে নভেম্বরের নির্বাচনের দৌড় থেকে সরে দাঁড়ানোর চাপ দেওয়া হলেও ১০ আগস্ট প্রার্থীতা প্রত্যাহারের সময়সীমা পার হয়ে যায়। তিনি পুনর্নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবং একই সময়ে হাউস এথিকস তদন্তের মুখেও রয়েছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















