প্রায় ছয় বছর বয়সে নিজের প্রিয় ভুট্টার খড় দিয়ে তৈরি পুতুলকে নিয়ে প্রথম গান লিখেছিলেন ডলি পার্টন। ছোট্ট সেই পুতুলের নাম ছিল ‘লিটল টিনি ট্যাসেলটপ’। মায়ের যত্নে সেই গানের লেখা বহুদিন একটি জুতার বাক্সে সংরক্ষিত ছিল। সেই শৈশবের সৃষ্টিশীলতা থেকেই শুরু হয়েছিল যে পথচলা, তা শেষ পর্যন্ত তাকে নিয়ে যায় বিশ্বসংগীতের সর্বোচ্চ সম্মানের আসনে।
দেশীয় সংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী, গীতিকার ও অভিনেত্রী ডলি পার্টন আর নেই। মঙ্গলবার ৮০ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যের ন্যাশভিলে তার মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে তার পরিবার। তার মৃত্যুর কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। তবে তার প্রচার প্রতিনিধি জানিয়েছেন, তিনি শান্তিপূর্ণভাবে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মৃত্যুর আগে তিনি স্বাস্থ্যের জটিলতার সঙ্গে লড়াই করছিলেন।
প্রায় ছয় দশকের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ডলি পার্টন শুধু একজন সংগীতশিল্পী ছিলেন না, তিনি হয়ে উঠেছিলেন একটি সাংস্কৃতিক প্রতীক। তার কণ্ঠ, আবেগঘন গান, অনন্য সাজসজ্জা, প্রাণবন্ত ব্যক্তিত্ব এবং অসাধারণ ব্যবসায়িক দক্ষতা তাকে প্রজন্মের পর প্রজন্মের মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে।
গানের জগতে অবিস্মরণীয় এক নাম
‘কোট অব মেনি কালার্স’, ‘জোলিন’ এবং ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’-এর মতো কালজয়ী গান ডলি পার্টনকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করে। তার লেখা ও পরিবেশিত গান বিক্রি হয়েছে ১০ কোটিরও বেশি কপি। তিনি পেয়েছেন ১১টি গ্র্যামি পুরস্কার, যার মধ্যে রয়েছে আজীবন সম্মাননা।

তার গান শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই জনপ্রিয় ছিল না। বিশ্বের নানা দেশের শিল্পীরা তার গান নতুন করে পরিবেশন করেছেন। বিশেষ করে ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’ গানটি হুইটনি হিউস্টনের কণ্ঠে নতুন মাত্রা পায়। ‘জোলিন’ গানটিও পরবর্তী সময়ে বিয়ন্সে ও দ্য হোয়াইট স্ট্রাইপসের মতো ভিন্নধারার শিল্পীদের কণ্ঠে নতুন জীবন পেয়েছে।
ডলি পার্টনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার গানের কথা। জীবদ্দশায় তিনি প্রায় তিন হাজার গান লিখেছেন, যদিও তার নিজের কণ্ঠে রেকর্ড হয়েছে আনুমানিক ৪৫০টি গান। মানুষের জীবন, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ, দারিদ্র্য, স্বপ্ন ও সংগ্রামকে তিনি সহজ অথচ গভীর ভাষায় গানে তুলে ধরতেন।
দারিদ্র্যের ঘর থেকে বিশ্বমঞ্চে
১৯৪৬ সালের ১৯ জানুয়ারি টেনেসির পিটম্যান সেন্টারে জন্ম ডলি রেবেকা পার্টনের। ১২ সন্তানের পরিবারে বেড়ে ওঠা ডলির শৈশব ছিল দারিদ্র্য আর সংগ্রামে ভরা। কাছের লোকাস্ট রিজ এলাকায় একটি ছোট এককক্ষের কুটিরে পরিবারের সঙ্গে তার বেড়ে ওঠা।
তার বাবা রবার্ট লি পার্টন ছিলেন তামাকচাষি। মা অ্যাভি লি নিয়মিত গান গাইতেন। ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও ওয়েলসের লোকগানের সুরে গল্প বলার সেই পারিবারিক ঐতিহ্য ডলির সংগীতজীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
আট বছর বয়সে তিনি প্রথম একটি সত্যিকারের গিটার পান। ১১ বছর বয়সেই স্থানীয় বেতারকেন্দ্রে গান গাইতে শুরু করেন। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি ন্যাশভিলের বিখ্যাত গ্র্যান্ড ওলে অপ্রিতে গান পরিবেশন করেন।
উচ্চবিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে সংগীতের স্বপ্ন নিয়ে তিনি ন্যাশভিলে চলে যান। সেখানে দেশীয় সংগীতশিল্পী পোর্টার ওয়াগনেরের সঙ্গে তার বিখ্যাত জুটি গড়ে ওঠে। তার অনুষ্ঠানে দীর্ঘদিন কাজ করার পাশাপাশি দুজন মিলে ১৪টি জনপ্রিয় দ্বৈত গান উপহার দেন।
পরে একক ক্যারিয়ার শুরু করার সিদ্ধান্ত নিলে পোর্টার ওয়াগনেরকে বিদায় জানিয়ে ডলি লিখেছিলেন ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’। গানটি পরবর্তী সময়ে সংগীত ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় গানে পরিণত হয়।
নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছিলেন
ডলি পার্টনের বাহ্যিক সাজসজ্জাও তার পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল। উঁচু স্বর্ণালি চুল, ঝলমলে পোশাক, উজ্জ্বল প্রসাধন এবং আকর্ষণীয় উপস্থিতি তাকে অন্য শিল্পীদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।

নিজের এই চেহারার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন টেনেসির নিজ শহরে দেখা এক নারীর কাছ থেকে। সেই নারীকে তিনি খুব সুন্দর মনে করলেও আশপাশের মানুষ তাকে অবজ্ঞা করত। ডলি বরং সেই চেহারাকেই নিজের স্বতন্ত্র পরিচয়ের অংশ করে নিয়েছিলেন।
তবে তিনি সবসময় স্পষ্ট করে বলতেন, তার বাহ্যিক পরিচয়ের আড়ালে যেন তার শিল্পীসত্তা হারিয়ে না যায়। তার কাছে সাজসজ্জা ছিল মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের একটি উপায়, কিন্তু গানই ছিল তার প্রকৃত পরিচয়।
সংগীতের বাইরে বহুমুখী সাফল্য
ডলি পার্টনের সাফল্য শুধু গানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন, টেলিভিশন অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেছেন এবং নিজের নামে একটি বিনোদনকেন্দ্রও গড়ে তুলেছেন।
১৯৮০ সালের ‘নাইন টু ফাইভ’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় তার অভিষেক হয়। চলচ্চিত্রটির নামগান তাকে গীতিকার হিসেবে অস্কারের মনোনয়ন এনে দেয়। পরে ‘ট্রাভেলিন থ্রু’ গানটির জন্যও তিনি অস্কারের মনোনয়ন পান।
‘দ্য বেস্ট লিটল হোরহাউস ইন টেক্সাস’, ‘স্টিল ম্যাগনোলিয়াস’, ‘রাইনস্টোন’ ও ‘স্ট্রেইট টক’-এর মতো চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন তিনি।

দেশীয় সংগীতের তালিকায় তার ২৫টি গান শীর্ষস্থান অর্জন করে। গীতিকারদের মর্যাদাপূর্ণ সংগঠনের সর্বোচ্চ সম্মানও পেয়েছেন তিনি। ২০২২ সালে তাকে রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
সাধারণ মানুষের পাশে থাকা এক তারকা
ডলি পার্টনের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ ছিল মানুষের সঙ্গে তার গভীর যোগাযোগ। দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসার অভিজ্ঞতা তাকে সাধারণ কর্মজীবী মানুষের অনুভূতির কাছাকাছি রেখেছিল।
২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির সময় তিনি ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের টিকা গবেষণায় ১০ লাখ ডলার দান করেন। এর মাধ্যমে তিনি টিকা উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সহায়তাকারী হয়ে ওঠেন।
শিশুদের পড়াশোনার প্রতি তার বিশেষ আগ্রহ ছিল। যুক্তরাষ্ট্রসহ কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও আয়ারল্যান্ডে শিশুদের জন্য পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার কর্মসূচি পরিচালনা করেন। নিজের জন্মভূমির টেনেসি এলাকার উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তিও দিয়েছেন।
তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জন্মস্থানীয় এলাকায় তার পূর্ণাঙ্গ মূর্তি স্থাপন করা হয়। তবে ২০২১ সালে ন্যাশভিলে নিজের আরেকটি মূর্তি স্থাপনের প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তার বক্তব্য ছিল, পৃথিবীতে এত সংকটের সময়ে নিজেকে বিশেষ মর্যাদায় তুলে ধরা উপযুক্ত নয়।

ভালোবাসা, সম্পর্ক ও ‘জোলিন’
ন্যাশভিলে যাওয়ার প্রথম দিনই ডলি পার্টনের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল কার্ল ডিনের। দুই বছর পর ১৯৬৬ সালে তারা বিয়ে করেন। দীর্ঘ দাম্পত্যজীবনে কার্ল ডিন প্রচারের আলো থেকে দূরে ছিলেন এবং ডলির সঙ্গে সংগীত সফরেও যেতেন না।
তবে তার ব্যক্তিগত জীবন ডলির অনেক গানের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছিল। ‘জোলিন’ গানটির পেছনেও রয়েছে এমন এক বাস্তব ঘটনা। লালচুলো এক ব্যাংককর্মীর কার্ল ডিনের প্রতি আগ্রহ থেকেই গানের গল্পের অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন ডলি।
মানুষের হৃদয়ে থেকে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা

অসংখ্য পুরস্কার, কোটি কোটি রেকর্ড বিক্রি এবং বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জনের পরও নিজের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে ডলি পার্টন দেখতেন গান লেখাকে।
তিনি বিশ্বাস করতেন, গান লেখার সময়ই তিনি সৃষ্টিশীলতার সবচেয়ে গভীর অনুভূতি পান। তার কাছে গান ছিল মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম।
তার দীর্ঘ সংগীতজীবনের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার তাই শুধু পুরস্কার বা রেকর্ড বিক্রির সংখ্যা নয়। মানুষের জীবনের গল্পকে সুর ও কথায় রূপ দেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতাই তাকে অমর করে রাখবে।
দারিদ্র্যের ছোট্ট কুটির থেকে বিশ্বসংগীতের সর্বোচ্চ মঞ্চে উঠে আসা ডলি পার্টনের জীবন ছিল স্বপ্ন, শ্রম, প্রতিভা ও মানবিকতার এক অনন্য গল্প। তার গান হয়তো আর নতুন করে তার কণ্ঠে শোনা যাবে না, কিন্তু তার সৃষ্টি বহু প্রজন্মের কণ্ঠে ও স্মৃতিতে বেঁচে থাকবে।


সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















