বিরল পূর্ণ সূর্যগ্রহণকে ঘিরে বুধবার উৎসবে মেতে উঠেছিল স্পেন ও আইসল্যান্ড। দীর্ঘ ২৭ বছর পর পশ্চিম ইউরোপে দেখা দেওয়া এই মহাজাগতিক দৃশ্য দেখতে স্পেনের উত্তরাঞ্চল ও আইসল্যান্ডে জড়ো হন লাখো মানুষ। কোথাও উচ্ছ্বাস, কোথাও বিস্ময়—দিনের আলো মুহূর্তেই গোধূলির অন্ধকারে ঢেকে যাওয়ার দৃশ্য দর্শকদের অভিভূত করে।
স্পেনের বিভিন্ন গ্রামীণ এলাকায় সূর্যগ্রহণ দেখার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। রাজধানী মাদ্রিদের উত্তরের বুইত্রাগো দে লোসোয়া এলাকায় সন্ধ্যার পর আকাশ অন্ধকার হয়ে এলে দর্শকেরা করতালি ও উল্লাসে ফেটে পড়েন। পূর্ণগ্রহণের সময় সূর্যের চারপাশে চাঁদের কিনার ঘেঁষে ক্ষণিকের জন্য দেখা যায় উজ্জ্বল আলোর বিন্দু, যা মহাজাগতিক দৃশ্যটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
অনেক দর্শক জানান, পূর্ণগ্রহণ শেষ হওয়ার পর ধীরে ধীরে আকাশের রং ফিরে আসার দৃশ্য ছিল অবিশ্বাস্য। প্রথমে লালচে আভা, পরে নীল রং—সব মিলিয়ে যেন সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয়ের অনুভূতি একসঙ্গে তৈরি হয়েছিল।
মাদ্রিদের বাসিন্দা রাফায়েল হিমেনেসের কাছে পুরো ঘটনাটি মনে হয়েছে কল্পবিজ্ঞানের কোনো দৃশ্যের মতো। তিনি জানান, গ্রহণ দেখার সময় হঠাৎ বাগানের পানির ছিটানো যন্ত্র চালু হয়ে যাওয়ায় তারা ভিজেও গিয়েছিলেন। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই আবার চারপাশ স্বাভাবিক হয়ে যায়।
ছয় লাখ নয়, ছয় মিলিয়ন দর্শকের প্রস্তুতি
সূর্যগ্রহণের পথ ধরে স্পেনের উত্তরাঞ্চল ও বালিয়ারিক দ্বীপপুঞ্জে প্রায় ৬০ লাখ দর্শনার্থী আসতে পারেন বলে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছিল দেশটির কর্তৃপক্ষ। বিপুল জনসমাগম সামলাতে প্রায় ২৫ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি প্রায় ১০০টি বিমান ও হেলিকপ্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছিল।
গ্রহণের সময়টি ছিল স্পেনে দাবানলের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মৌসুম। তাই বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঠেকাতে নেওয়া হয় বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা। ভ্যালেন্সিয়া অঞ্চলের পেনিসকোলায় একটি গ্রহণ পর্যবেক্ষণস্থলের কাছে একটি ছোট আগুনও ছড়িয়ে পড়ে। একটি গাড়ি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে আশপাশের আরও ৩৩টি গাড়িতে তা ছড়িয়ে পড়ে। পরে দমকলকর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।
তবে বুধবার রাত পর্যন্ত সূর্যগ্রহণ দেখতে আসা মানুষের কারণে বড় কোনো দাবানলের ঘটনা ঘটেনি বলে জানানো হয়েছে।
আইসল্যান্ডেও গ্রহণ ঘিরে উন্মাদনা
স্পেনের কিছুক্ষণ আগে আইসল্যান্ডের আকাশেও দেখা যায় সূর্যগ্রহণ। দেশটির অনেক এলাকায় মেঘ থাকায় দৃশ্যটি পুরোপুরি উপভোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে পশ্চিমাঞ্চলের কিছু জায়গায় মেঘ সরে গেলে স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকেরা মহাজাগতিক দৃশ্যটি দেখার সুযোগ পান।
রাজধানী রেইকিয়াভিকে মেঘের আড়ালে সূর্যগ্রহণের পূর্ণ দৃশ্য দেখা না গেলেও দিনের আলো হঠাৎ কমে যাওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়। মাত্র প্রায় ৪ লাখ জনসংখ্যার দেশটিতে এ উপলক্ষে ৮০ হাজার পর্যন্ত দর্শনার্থী আসেন। নিরাপদে গ্রহণ দেখার বিশেষ চশমাও কয়েক দিন আগেই দোকানগুলোতে শেষ হয়ে যায়।
আইসল্যান্ডের পশ্চিম প্রান্তে স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ৪৪ মিনিটের দিকে পূর্ণগ্রহণ শুরু হয়। সেখানে সর্বোচ্চ প্রায় ২ মিনিট ১৩ সেকেন্ড পর্যন্ত চারপাশ পুরো অন্ধকারে ঢেকে যায়।
দূরদেশ থেকে ছুটে এলেন গ্রহণপ্রেমীরা
এই মহাজাগতিক ঘটনা দেখতে শুধু স্থানীয় মানুষই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন সূর্যগ্রহণপ্রেমীরা। এ ধরনের মানুষদের অনেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ঘুরে ঘুরে পূর্ণগ্রহণের পথ অনুসরণ করেন।
বিখ্যাত ব্রিটিশ সংগীতশিল্পী ও কুইনের সাবেক গিটারবাদক ব্রায়ান মে-ও ছিলেন দর্শকদের মধ্যে। তিনি স্পেনের তেরুয়েল প্রদেশের একটি পর্যবেক্ষণকেন্দ্র থেকে গ্রহণের মুহূর্তের অভিজ্ঞতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরেন। পূর্ণগ্রহণের চূড়ান্ত মুহূর্তে দর্শকদের উল্লাস ও করতালির মধ্য দিয়ে শেষ হয় সেই অসাধারণ দৃশ্য।
সামনে আরও দুটি মহাজাগতিক আয়োজন
স্পেনের ইবেরীয় উপদ্বীপে এর আগে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা গিয়েছিল ১৯১২ সালে। এবার প্রায় ১১৪ বছর পর সেই বিরল দৃশ্য আবার ফিরল। তবে এই অঞ্চলের আকাশপ্রেমীদের জন্য অপেক্ষা আরও আছে। ২০২৭ সালের ২ আগস্ট আবারও পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে। এরপর ২০২৮ সালের জানুয়ারিতে হবে বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ।
পরপর এই তিন মহাজাগতিক ঘটনাকে ঘিরে ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে বিশেষ আগ্রহ। স্পেনের পর্যটন কর্তৃপক্ষও এর মাধ্যমে দেশটির তুলনামূলক কম পরিচিত অঞ্চলগুলোকে বিশ্বের পর্যটকদের সামনে তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে।
অনেকের কাছে সূর্যগ্রহণ শুধু একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা নয়, বরং মহাবিশ্বের বিশালত্ব উপলব্ধি করার এক অনন্য মুহূর্ত। দিনের আলো হঠাৎ মিলিয়ে গিয়ে কয়েক মিনিটের জন্য চারপাশে নেমে আসা অন্ধকার তাই দর্শকদের মনে তৈরি করেছে বিস্ময়, আবেগ এবং জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবার অনুভূতি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















