চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষাগত বৈষম্যের চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বড় শহরগুলোর শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক ভালো ফল করলেও প্রত্যন্ত ও গ্রামীণ এলাকার অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাসের হার নেমে গেছে আশঙ্কাজনক পর্যায়ে। এমনকি দেশের ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এবার একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি।
ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এবার গড় পাসের হার প্রায় ৬৪ শতাংশ। এর বিপরীতে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় গড় পাসের হার প্রায় ৭৮ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ শহরাঞ্চলের সঙ্গে গ্রামীণ ও ছোট শহরগুলোর শিক্ষার্থীদের ফলাফলে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে।
ঢাকার সঙ্গে জেলার ফলাফলে বড় ফারাক
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ঢাকা মহানগর এলাকায় এবার পাসের হার ৮৩ শতাংশের বেশি। অথচ একই বোর্ডের মাদারীপুর জেলায় এই হার প্রায় ৫৮ শতাংশ। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ ও নরসিংদীর মতো মহানগরসংলগ্ন জেলাগুলোতে পাসের হার ৭২ থেকে ৮৩ শতাংশের মধ্যে থাকলেও মহানগরের বাইরে অনেক জেলার ফলাফল ৫৮ থেকে ৬৬ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
ঢাকা মহানগর এলাকায় যেখানে ১৯ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ ফল অর্জন করেছে, সেখানে শরীয়তপুরে এই সংখ্যা মাত্র ২১২। এই ব্যবধান থেকেই বোঝা যায়, ভালো ফলের ক্ষেত্রে শহরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা কতটা এগিয়ে রয়েছে।
চট্টগ্রাম মহানগর এলাকাতেও পাসের হার প্রায় ৭৪ শতাংশ। কিন্তু মহানগর বাদ দিয়ে চট্টগ্রাম জেলায় এই হার নেমে এসেছে প্রায় ৫৭ শতাংশে। খাগড়াছড়িতে পরিস্থিতি আরও খারাপ। সেখানে পাসের হার প্রায় ৩৫ শতাংশ, যেখানে গত বছর ছিল প্রায় ৬১ শতাংশ।

শিক্ষক সংকট বড় বাধা
শহর ও গ্রামের ফলাফলের এই ব্যবধানের পেছনে শিক্ষকদের ঘাটতি, পর্যাপ্ত পাঠদান না হওয়া, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাব এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তদারকির দুর্বলতাকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গ্রামীণ এলাকার অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজন অনুযায়ী বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই। ফলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক বিষয়ের শিক্ষককে অন্য বিষয় পড়াতে হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় মানের পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
অন্যদিকে শহরাঞ্চলের অনেক পরিবার সন্তানদের পড়াশোনায় তুলনামূলক বেশি অর্থ ব্যয় করতে পারে। কোচিং, ব্যক্তিগত শিক্ষক এবং অন্যান্য শিক্ষাসহায়তা পাওয়ার সুযোগও সেখানে বেশি। গ্রামীণ পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য তুলনামূলক কম হওয়ায় শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি সহায়তার সুযোগও সীমিত।
শিক্ষাবিদদের মতে, শুধু শিক্ষার্থীদের মেধা দিয়ে এই ফলাফলের ব্যাখ্যা করা যাবে না। শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষকসংখ্যা, পরিবারের আর্থিক সক্ষমতা এবং প্রতিষ্ঠান পরিচালনার মান—সবকিছু মিলিয়েই ফলাফলের পার্থক্য তৈরি হচ্ছে।
শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই গ্রামে
এবার ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। এর মধ্যে ২২৬টি মাদ্রাসা, ৫৭টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের স্কুল এবং ২৯টি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
গত বছর সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ৪৮টি স্কুলে শূন্য পাসের ঘটনা থাকলেও এবার তা বেড়ে হয়েছে ৫৭টি। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই ঢাকার বাইরে।
মাদ্রাসাগুলোর পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। গত বছর যেখানে ৮৬টি মাদ্রাসায় কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি, এবার সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২৬টিতে। প্রাথমিক যাচাইয়ে দেখা গেছে, এসব মাদ্রাসার সবগুলোই ঢাকার বাইরে অবস্থিত।

জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার পুর মেছাবুল উলুম ফাজিল মাদ্রাসায় এবার পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ২১ জন শিক্ষার্থীর সবাই ফেল করেছে। ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি সরকারি বেতন-সহায়তার আওতাভুক্ত। এখানে প্রাথমিক থেকে ফাজিল পর্যন্ত মোট শিক্ষার্থী প্রায় ৪৬৬ জন এবং শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন ৩৭ জন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটিতে নিয়মিত ও যথাযথভাবে পাঠদান হয় না। কয়েকজন শিক্ষক রাজনীতিতেও ব্যস্ত থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ জানিয়েছেন, ৭৬ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম এমন শতভাগ অকৃতকার্যের ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে এবং পরীক্ষার খাতা পুনর্মূল্যায়নের জন্য বোর্ডে আবেদন করা হবে।
শিক্ষকের অভাবে বিপর্যস্ত অনেক স্কুল
পিরোজপুর সদর উপজেলার কদমতলা পরগলা উচ্চবিদ্যালয়েও এবার পরীক্ষায় অংশ নেওয়া আটজন শিক্ষার্থীর কেউ পাস করতে পারেনি। বিদ্যালয়টিতে শিক্ষক রয়েছেন সাতজন। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয়দের অভিযোগ, সেখানে নিয়মিত পাঠদান হয় না। বিশেষ করে গণিত ও ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় শিক্ষকের জন্য বারবার জানানো হলেও সময়মতো শিক্ষক পাওয়া যায়নি। সরকারি পর্যায় থেকে শিক্ষক না দিলে প্রতিষ্ঠানের পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন।
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডে শূন্য পাসের স্কুল সবচেয়ে বেশি—১৮টি। যশোর বোর্ডে ১১টি, চট্টগ্রামে ৮টি, রাজশাহীতে ৫টি, বরিশালে ৫টি এবং ময়মনসিংহ বোর্ডে ৪টি স্কুলে কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি।
৩১২ প্রতিষ্ঠানের ফল নিয়ে গভীর তদন্তের দাবি

এবার এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় মোট ৩০ হাজার ৪০২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। এর মধ্যে ৩৮৪টি প্রতিষ্ঠানের পাসের হার ছিল শূন্য থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে। ১০ থেকে ২০ শতাংশ পাসের হার ছিল ১ হাজার ২৬৫টি প্রতিষ্ঠানে। ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পাসের হার ছিল ১৪ হাজার ৯১৮টি প্রতিষ্ঠানে। আর ৫০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী পাস করেছে ২৮ হাজার ৪৭০টি প্রতিষ্ঠানে। সব শিক্ষার্থী পাস করেছে এমন প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৬৬৯টি।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, যেসব প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থীই পাস করেনি, সেগুলোকে শুধু খারাপ ফলের তালিকায় রেখে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকসংখ্যা, পাঠদানের পরিবেশ, ব্যবস্থাপনা, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, পরিবারের আর্থিক অবস্থা এবং তদারকির ব্যবস্থা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ইতোমধ্যে শূন্য পাসের ২২৬টি মাদ্রাসার অধ্যক্ষদের ডাকার উদ্যোগ নিয়েছে। আঞ্চলিক পর্যায়ে তাদের কাছ থেকে প্রতিষ্ঠানের সমস্যা ও ফল বিপর্যয়ের কারণ জানার পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের প্রস্তাব পাঠানো হবে।
শুধু ফল নয়, পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতাও সামনে এসেছে
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার গত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। শহরাঞ্চলেও আগের বছরের তুলনায় ফল কমেছে। তবে শহরের তুলনায় গ্রামীণ এলাকার পিছিয়ে পড়ার মাত্রা অনেক বেশি।
শিক্ষাবিদদের মতে, এই ফলাফলকে কেবল একটি পরীক্ষার ফল হিসেবে দেখলে চলবে না। শহর ও গ্রামের শিক্ষার সুযোগের বৈষম্য, শিক্ষক সংকট, পরিবারগুলোর আর্থিক সক্ষমতার পার্থক্য এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর তদারকির দুর্বলতা—সবকিছুর সম্মিলিত চিত্র এই ফলাফলে উঠে এসেছে।
তাই শূন্য পাসের ৩১২টি প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে নিরপেক্ষ ও বিস্তারিত গবেষণা করা জরুরি। এতে শুধু ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যাই চিহ্নিত হবে না, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার কোথায় কোথায় কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে, সেটিও স্পষ্ট হতে পারে। আর সেই তথ্যের ভিত্তিতেই শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হওয়া বৈষম্য কমানোর কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব।
শহরের শিক্ষার্থী যেখানে বাড়তি সুযোগ-সুবিধা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে গ্রামের একজন শিক্ষার্থী যেন শুধু জন্মস্থান বা পারিবারিক আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে পিছিয়ে না পড়ে—এটাই এখন শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















