উত্তর আমেরিকায় নতুন গাড়ি তৈরির কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছে জাপানের গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হোন্ডা। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে বিদ্যমান মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো না হলে নতুন কারখানা নির্মাণের পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে হতে পারে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
নতুন কারখানার প্রয়োজন হোন্ডার
হোন্ডার নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট নোরিয়া কাইহারা জানিয়েছেন, উত্তর আমেরিকায় প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় পূর্ণ হয়ে এসেছে। ফলে ভবিষ্যতের চাহিদা সামাল দিতে নতুন একটি গাড়ি তৈরির কারখানা প্রয়োজন। তবে উত্তর আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ভবিষ্যৎ নিশ্চিত না হলে সেই বিনিয়োগ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।
ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক আলোচনায় কাইহারা বলেন, আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। হোন্ডা চায়, নতুন কারখানাটি প্রায় ২০৩০ সালের মধ্যে উৎপাদনে আসুক।

বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তা
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন কানাডা ও মেক্সিকোর সঙ্গে উত্তর আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করছে। এই চুক্তির আওতায় তিন দেশের মধ্যে গাড়ি ও বিভিন্ন পণ্যের বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা রয়েছে।
চুক্তির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় বড় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে গাড়ি নির্মাতাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হোন্ডার ক্ষেত্রেও সেই অনিশ্চয়তা নতুন কারখানা নির্মাণের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।
এরই মধ্যে কানাডার কিছু পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। এর জবাবে কানাডাও যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে সেই পাল্টা ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার কথা।
শুল্কের চাপ এখনো ক্রেতাদের ওপর দিচ্ছে না হোন্ডা
হোন্ডার কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমানে উত্তর আমেরিকায় শুল্ক বৃদ্ধির অতিরিক্ত খরচ গাড়ির ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে না প্রতিষ্ঠানটি। তবে দীর্ঘমেয়াদে বাণিজ্যনীতির অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ ও উৎপাদন পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
এর আগে আরেক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হুন্দাইও বাণিজ্য চুক্তির অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছিল।
হাইব্রিড গাড়িতে বাড়ছে হোন্ডার গুরুত্ব
জ্বালানি তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকায় জ্বালানি সাশ্রয়ী গাড়ির প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বেড়েছে। এর ফলে হোন্ডার হাইব্রিড গাড়ির চাহিদাও শক্তিশালী হয়েছে।
জুলাই মাসে প্রতিষ্ঠানটির গাড়ি বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৬ শতাংশ বেড়েছে, যা সাত বছরের মধ্যে জুলাই মাসের সেরা বিক্রির ফল।
হোন্ডা অবশ্য বৈদ্যুতিক গাড়ি নিয়ে আগের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন এনেছে। চলতি বছরের মে মাসে প্রতিষ্ঠানটি ২০৩০ সালের মধ্যে নতুন গাড়ি বিক্রির এক-পঞ্চমাংশ বৈদ্যুতিক গাড়ি করার লক্ষ্য বাতিল করে। পরিবর্তে ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫টি নতুন হাইব্রিড গাড়ি বাজারে আনার পরিকল্পনা করছে।
কানাডার বৈদ্যুতিক গাড়ি প্রকল্পও স্থগিত
হোন্ডা কানাডায় প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ব্যাটারি উৎপাদন প্রকল্প অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের জন্য পরিকল্পনা করা তিনটি বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রকল্পও বাতিল করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের জন্য জাপানে উৎপাদিত পাঁচ দরজার সিভিক হাইব্রিড গাড়ির উৎপাদন ইন্ডিয়ানায় সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে হোন্ডা।
সব মিলিয়ে উত্তর আমেরিকার বাণিজ্যনীতির ভবিষ্যৎ এখন হোন্ডার বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে দ্রুত নিশ্চয়তা না এলে নতুন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন আসতে পারে।
বাণিজ্য চুক্তির অনিশ্চয়তা, শুল্ক বৃদ্ধি এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে কৌশল বদলের মধ্যে হোন্ডার এই অবস্থান উত্তর আমেরিকার গাড়ি শিল্পে বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















