কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে আসক্তি তৈরি এবং তাদের নিরাপত্তা নিয়ে চলমান বহুল আলোচিত মামলায় ইনস্টাগ্রামের প্রধান অ্যাডাম মোসেরি স্বীকার করেছেন, কিশোরদের জন্য চালু করা গুরুত্বপূর্ণ একটি নিরাপত্তা সুবিধা ব্যবহারের হার দীর্ঘ সময় ধরে ছিল খুবই কম। মামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ২৯টি অঙ্গরাজ্যের অভিযোগ, শিশু-কিশোরদের বেশি সময় ধরে প্ল্যাটফর্মে আটকে রাখতে মেটা ইচ্ছাকৃতভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নকশা করেছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার অকল্যান্ডের একটি ফেডারেল আদালতে মামলার চতুর্থ দিনের শুনানিতে সাক্ষ্য দেন মোসেরি। ২০১৮ সাল থেকে ইনস্টাগ্রামের নেতৃত্বে থাকা এই কর্মকর্তা বলেন, কিশোরদের জন্য চালু করা ‘বিরতি নাও’ সুবিধাটি তারা শুরুতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু রাখেননি, যদিও জানতেন এতে ব্যবহারকারীদের অংশগ্রহণ কম হতে পারে।
কিশোরদের অধিকাংশই সুবিধাটি ব্যবহার করত না
মামলায় কিশোরদের পক্ষে আইনজীবীর জেরার মুখে মোসেরি জানান, স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুবিধাটি চালু করার আগে মাত্র এক অঙ্কের শতাংশ কিশোর এটি ব্যবহার করত। অর্থাৎ, কিশোর ব্যবহারকারীদের খুব সামান্য অংশই নিজেদের ব্যবহারের সময় নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই সুবিধা সক্রিয় করেছিল।

২০২১ সালের ডিসেম্বরে সুবিধাটি চালুর সময় মোসেরি জানিয়েছিলেন, প্রাথমিক পরীক্ষায় যেসব কিশোর এটি চালু করেছিল, তাদের ৯০ শতাংশের বেশি পরে সেটি চালু রেখেছিল। নির্দিষ্ট সময় ধরে ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারের পর ব্যবহারকারীকে অ্যাপটি বন্ধ করার জন্য উৎসাহিত করাই ছিল এই সুবিধার মূল উদ্দেশ্য।
তবে আদালতে মোসেরি বলেন, অধিকাংশ কিশোর তখন এই সুবিধাটি চাইত না। এরপরও প্রতিষ্ঠানটি এটি চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।
২৯ অঙ্গরাজ্যের গুরুতর অভিযোগ
মেটার বিরুদ্ধে করা মামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ২৯টি অঙ্গরাজ্য অভিযোগ করেছে, প্রতিষ্ঠানটি ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্য যথাযথ অনুমতি ছাড়া সংগ্রহ ও ব্যবহার করেছে।
এর পাশাপাশি ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, কেনটাকি ও নিউ জার্সি অভিযোগ করেছে, শিশু-কিশোরদের দীর্ঘ সময় প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখতে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের নকশা করা হয়েছিল। এর ফলে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং এমনকি আত্মহত্যার মতো গুরুতর সমস্যাও বাড়তে পারে বলে রাজ্যগুলোর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

রাজ্যগুলো জানিয়েছে, মামলায় মেটার বিরুদ্ধে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত দেওয়ানি জরিমানা চাওয়া হতে পারে।
তবে মেটা এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার এবং তাদের সুস্থতার অবনতির মধ্যে সরাসরি ও স্পষ্ট সম্পর্কের প্রমাণ তাদের গবেষণায় পাওয়া যায়নি।
নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য গোপনের অভিযোগ অস্বীকার
মোসেরির বিরুদ্ধে জেরার আরেক পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ তথ্য গোপন বা পরিবর্তনের অভিযোগও তোলা হয়। তিনি এমন কোনো নীতি সম্পর্কে জানতেন যে আইনজীবীদের পর্যালোচনার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ উপস্থাপনা থেকে নেতিবাচক তথ্য বাদ দেওয়া হতো—এমন ধারণা প্রত্যাখ্যান করেন।
মোসেরি বলেন, শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে ইনস্টাগ্রামের কাছে থাকা তথ্য প্রকাশ্যে এলে সেটি যেন মানসম্পন্ন এবং বিশেষজ্ঞদের সমর্থিত হয়, সেটিই তিনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন।
তিনি আরও বলেন, তার উদ্দেশ্য কখনোই দলের সদস্যদের কাছ থেকে তথ্য গোপন করা ছিল না। বরং কোনো বিষয় কীভাবে কাজ করে, তা বোঝার জন্য তিনি তার দলের কাছ থেকে আরও তথ্য পেতে চেয়েছেন।
২০২১ সালের তথ্য ফাঁসের পর গবেষণায় পরিবর্তন
২০২১ সালে সাবেক কর্মী ফ্রান্সেস হাউগেনের মাধ্যমে মেটার অভ্যন্তরীণ নানা নথি প্রকাশ্যে আসার পর কিশোরদের নিরাপত্তা নিয়ে কোম্পানির অভ্যন্তরীণ গবেষণা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়।
মোসেরি জানান, এরপর কিশোরদের নিরাপত্তা নিয়ে সংবেদনশীল গবেষণায় কাজ করা ব্যক্তিদের একটি নির্দিষ্ট দলের অধীনে কেন্দ্রীভূত করা হয় এবং পুরো প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এসব তথ্যের প্রবেশাধিকারও কমিয়ে দেওয়া হয়।

হাউগেন তখন অভিযোগ করেছিলেন, মেটা তাদের পণ্য শিশুদের জন্য নিরাপদ নয় বলে জানলেও বেশি মুনাফার স্বার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়নি।
উপস্থাপনা থেকে নেতিবাচক তথ্য বাদ দেওয়ার অভিযোগ
মোসেরির সাক্ষ্যের আগে ইনস্টাগ্রামের পণ্য নকশা বিভাগের পরিচালক ফ্রান্সেসকো ফোগু আদালতে সাক্ষ্য দেন। তিনি জানান, ২০২৩ সালে তার দল ইনস্টাগ্রামের নেতৃত্বের জন্য কিশোরদের নিরাপত্তা নিয়ে একটি উপস্থাপনা তৈরি করেছিল।
জেরার সময় ফোগু স্বীকার করেন, ওই উপস্থাপনার একটি পাতায় থাকা কিছু তথ্য পরে বাদ দেওয়া হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, প্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের তুলনায় কিশোর ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারীরা দেড় গুণ বেশি হয়রানি, আত্মহত্যাসংক্রান্ত বিষয়, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, নগ্নতা ও সহিংস বিষয়বস্তুর মুখোমুখি হচ্ছিল।
তবে মেটার আইনজীবীর প্রশ্নের জবাবে ফোগু বলেন, ওই পরিসংখ্যানটি উপস্থাপনার অন্য একটি পাতায় ছিল।
তিনি আরও স্বীকার করেন, ‘বিরতি নাও’ সুবিধাটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু না করলে এটি কম মানুষ ব্যবহার করবে—এ বিষয়টি ইনস্টাগ্রাম কর্তৃপক্ষ জানত।
বিচারকই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন

মামলার শুনানি প্রায় ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে। বিচারকদের কাছ থেকে একটি পরামর্শমূলক রায় পাওয়ার পর মেটা দায়ী কি না, তা নির্ধারণ করবেন মার্কিন জেলা বিচারক ইভন গনজালেজ রজার্স। দায় প্রমাণিত হলে দেওয়ানি জরিমানা এবং ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের কার্যক্রমে কী ধরনের পরিবর্তন আনা হবে, সেটিও বিচারক নির্ধারণ করবেন।
শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা নিয়ে মেটার বিরুদ্ধে এটি সর্বশেষ নয়, বরং ধারাবাহিক আইনি লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। চলতি মাসের শুরুতে নিউ মেক্সিকোর এক বিচারক কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি মোকাবিলায় মেটাকে ৫৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার দেওয়ার নির্দেশ দেন।
এদিকে টেনেসিও ইনস্টাগ্রাম নিয়ে একই ধরনের অভিযোগে মেটার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। সেই মামলার শুনতিও চলছে।
মোসেরির সাক্ষ্য বুধবারও অব্যাহত থাকার কথা রয়েছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















