ওজন কমানোর ওষুধে দ্রুত ওজন কমিয়ে নতুন শরীর পাওয়ার পর এবার চেহারা ও শারীরিক গঠন আরও আকর্ষণীয় করতে প্রসাধনী চিকিৎসার দিকে ঝুঁকছেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সংখ্যক পুরুষ। অতিরিক্ত ওজন ঝরে যাওয়ার পর ঝুলে পড়া চামড়া, মুখের মেদ কমে যাওয়া, চুল পড়া এবং দাঁতের সমস্যার সমাধানে তারা বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের সাহায্য নিচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব, পুরুষের সৌন্দর্য নিয়ে বদলে যাওয়া ধারণা এবং দ্রুত ওজন কমানোর ওষুধের জনপ্রিয়তা—এই তিনটি বিষয় পুরুষদের প্রসাধনী চিকিৎসার প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ওজন কমল, বদলে গেল মুখের গড়ন
নিউ জার্সির ৫৭ বছর বয়সী মার্ক গত পাঁচ বছরে স্থূলতার চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ গ্রহণ করে প্রায় ২৩ কেজি ওজন কমিয়েছেন। প্রথমে তিনি ওয়েগোভি এবং পরে জেপবাউন্ড ব্যবহার করেন। ওজন কমার পর নিজের শরীর নিয়ে ভালো বোধ করলেও আয়নায় মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি দেখতে পান, আগের তুলনায় মুখের স্বাভাবিক ভরাটভাব অনেকটাই কমে গেছে।
এই পরিবর্তন দূর করতে চলতি বছরের এপ্রিলে তিনি মুখের গভীর স্তরের উত্তোলন অস্ত্রোপচার করান। এই পদ্ধতিতে মুখের ভেতরের পেশি ও চর্বির অবস্থান পুনর্বিন্যাস করে মুখের গঠনকে আগের তুলনায় টানটান ও স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করা হয়।

তার চিকিৎসক নিউইয়র্কের মুখমণ্ডলীয় প্লাস্টিক অস্ত্রোপচার বিশেষজ্ঞ শন আলেমি জানিয়েছেন, গত এক থেকে দুই বছরে তার পুরুষ রোগীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তাদের বড় একটি অংশ দ্রুত ওজন কমানোর পর প্রসাধনী চিকিৎসার জন্য তার কাছে এসেছেন।
পুরুষদের সৌন্দর্যচর্চায় বড় পরিবর্তন
প্রসাধনী চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে এখনো নারীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। তবে পুরুষদের অংশগ্রহণ দ্রুত বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্লাস্টিক অস্ত্রোপচার বিশেষজ্ঞদের সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশটিতে পুরুষরা প্রায় ১৭ লাখ প্রসাধনী চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে অস্ত্রোপচার এবং অস্ত্রোপচার ছাড়াই করা বিভিন্ন চিকিৎসা—দুই ধরনের পদ্ধতিই রয়েছে। আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা বেড়েছিল ২ দশমিক ৭ শতাংশ।
পুরুষদের মধ্যে চোখের পাতার অস্ত্রোপচার, শরীরের অতিরিক্ত চর্বি অপসারণ এবং পেটের ঝুলে যাওয়া চামড়া ঠিক করার অস্ত্রোপচার ছিল বেশি প্রচলিত।
চিকিৎসকেরা মনে করছেন, নতুন নতুন ওজন কমানোর ওষুধ বাজারে আসায় এই প্রবণতা আরও বাড়বে। বিশেষ করে মুখে খাওয়ার নতুন ধরনের ওষুধ সহজলভ্য হলে দ্রুত ওজন কমানোর মানুষের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে অস্ত্রোপচার করা পুরুষদের প্রায় ৭০ শতাংশের আগে ওজন কমানোর বিশেষ ওষুধ ব্যবহারের ইতিহাস ছিল বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির সভাপতি চিকিৎসক বব বাসু।
তরুণদের লক্ষ্য শরীরের গঠন, বয়স্কদের মুখ ও ঘাড়
চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে বয়সভেদেও পুরুষদের চাহিদায় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
তরুণ পুরুষেরা সাধারণত দ্রুত ওজন কমানোর পর ঝুলে যাওয়া চামড়া সরিয়ে শরীরের পেশিবহুল ও ক্রীড়াবিদসুলভ গঠন ফুটিয়ে তুলতে চান। অন্যদিকে বয়স্ক পুরুষদের আগ্রহ বেশি মুখ ও ঘাড়ের বয়সের ছাপ কমানোর দিকে।

ওজন কমানোর ওষুধ ব্যবহারকারীদের মধ্যে পুরুষের অংশও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৬ সালে ওজন কমানোর ওষুধের ব্যবস্থাপত্র পূরণকারীদের ২৮ দশমিক ৩ শতাংশ ছিলেন পুরুষ। চার বছর আগে এই হার ছিল ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ।
মিয়ামির প্লাস্টিক অস্ত্রোপচার বিশেষজ্ঞ রিয়ান মারক্সের মতে, আগে যে পুরুষ কখনো প্লাস্টিক অস্ত্রোপচারের কথা ভাবেননি, তিনি ২৩ বা ৩৬ কেজি ওজন কমানোর পর নিজের শরীরকে নতুনভাবে দেখতে শুরু করছেন। শরীরচর্চা, পোশাক এবং জীবনযাত্রায় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আগের শরীরের কিছু অংশের সঙ্গে নতুন চেহারার অমিল তার কাছে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
মারক্স জানিয়েছেন, তার রোগীদের প্রায় ৬০ শতাংশ এখন পুরুষ। গত বছর এই হার ছিল ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ।
নিজের শরীর নিয়ে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার চেষ্টা
ক্যালিফোর্নিয়ার ৪৫ বছর বয়সী ট্রাকচালক ওয়াল্টার বারিয়েন্তোস শরীরচর্চার মাধ্যমে ওজন কমানোর একটি পর্যায়ে গিয়ে আর কাঙ্ক্ষিত ফল পাচ্ছিলেন না। পরে তিনি একটি পরীক্ষামূলক ওষুধের পরীক্ষায় অংশ নেন। সব মিলিয়ে তার ওজন প্রায় ২৯ কেজি কমেছে এবং বর্তমানে তার ওজন প্রায় ৮৯ কেজি।
ওজন কমানোর পর তিনি পেট, কোমর ও বুকের অতিরিক্ত চামড়া ও চর্বি নিয়ে অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করেন। তাই জুলাইয়ে তিনি পেটের চামড়া টানটান করার অস্ত্রোপচার, পেট, কোমর ও বুকের অতিরিক্ত চর্বি অপসারণসহ কয়েকটি চিকিৎসা নেন।
এখন তার পরবর্তী পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে দাঁতে কৃত্রিম প্রতিস্থাপন।
বারিয়েন্তোসের ভাষায়, তিনি সমুদ্রসৈকত বা সুইমিংপুলে গিয়ে জামা খুলে নিজের শরীর নিয়ে আরও আত্মবিশ্বাসী হতে চেয়েছেন।

খরচও কম নয়
পুরুষদের প্রসাধনী চিকিৎসার অন্যতম বড় বাধা হলো এর বিপুল ব্যয়। এসব চিকিৎসার বেশির ভাগই স্বাস্থ্যবিমার আওতায় পড়ে না।
যুক্তরাষ্ট্রে পুরুষের স্তন ছোট করার অস্ত্রোপচারে শুধু অস্ত্রোপচার বিশেষজ্ঞের পারিশ্রমিকই গড়ে প্রায় ৫ হাজার থেকে ৯ হাজার ডলার হতে পারে। মুখের ত্বক ও গঠন ঠিক করার অস্ত্রোপচারে এই পারিশ্রমিক ১৯ হাজার ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এর সঙ্গে অবেদন, অস্ত্রোপচার কক্ষ এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় যোগ হলে মোট খরচ আরও বাড়ে।
তবু অনেক রোগী মনে করছেন, নিজেদের চেহারা ও শরীর নিয়ে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার জন্য এই ব্যয় সার্থক।
মার্ক জানিয়েছেন, চিকিৎসার মোট খরচ জানার পর প্রথমে তিনি বেশ অবাক হয়েছিলেন। কিন্তু চিকিৎসা নেওয়ার পর তার কোনো আফসোস নেই।

ওজন কমার সঙ্গে চুল পড়ার সমস্যাও বাড়ছে
দ্রুত ওজন কমানোর পর শুধু ত্বক ও শরীরের গঠনেই পরিবর্তন আসে না, সাময়িকভাবে চুল পড়ার সমস্যাও দেখা দিতে পারে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক দিলিলা ফৌলাদ জানিয়েছেন, দ্রুত ওজন কমার ফলে শরীরে যে শারীরিক চাপ তৈরি হয়, তার প্রভাবে এ ধরনের চুল পড়া হতে পারে।
চিকিৎসকেরা এ সমস্যায় রক্ত থেকে সংগৃহীত প্লেটলেটসমৃদ্ধ উপাদানের প্রয়োগ কিংবা চুল গজাতে ব্যবহৃত ওষুধের মতো চিকিৎসা দিচ্ছেন। কিছু ক্ষেত্রে অনুমোদন না পাওয়া বিশেষ উপাদানও ব্যবহারের প্রবণতা রয়েছে।
চুল পড়ার চিকিৎসা নিয়ে নতুন ব্যবসার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নতুন চিকিৎসা উদ্ভাবনে কাজ করছে। এমনকি একটি বড় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বাধীন একটি দল চুল পড়া ঠেকানোর বিশেষ প্রতিরোধী পদার্থ নিয়ে গবেষণার জন্য একটি জৈবপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে ১০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে।
চিকিৎসকদের মতে, যারা ওজন কমিয়ে নিজেদের চেহারা আরও আকর্ষণীয় করতে চাইছেন, তাদের কাছে চুলের স্বাস্থ্যও স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ফলে ওজন কমানোর ওষুধের যুগে পুরুষদের সৌন্দর্যচর্চার ধারণাতেও বড় পরিবর্তন আসছে। শুধু ওজন কমানোতেই থেমে না থেকে অনেকে এখন শরীরের গঠন, মুখের আকৃতি, চুল ও দাঁত—সবকিছুকে মিলিয়ে নিজেদের কাঙ্ক্ষিত চেহারা তৈরির চেষ্টা করছেন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















