গ্রিনল্যান্ডের নারীদের ওপর কয়েক দশক ধরে চালানো জোরপূর্বক জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। তবে এর মাধ্যমে গণহত্যা সংঘটনের আইনি সংজ্ঞা পূরণ হয়েছে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। শুক্রবার প্রকাশিত দুটি বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদনে এমন সিদ্ধান্ত উঠে এসেছে।
সম্মতি ছাড়াই জন্মনিয়ন্ত্রণ
১৯৬০-এর দশক থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির আওতায় অন্তত ৪ হাজার গ্রিনল্যান্ডিক নারী ও কিশোরীর শরীরে জরায়ুর ভেতরে স্থাপিত জন্মনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বসানো বা জন্মনিয়ন্ত্রণের ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের যথাযথ সম্মতি নেওয়া হয়নি। আক্রান্তদের মধ্যে ১২ বছর বয়সী কিশোরীও ছিল।
১৯৬৬ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত এই কার্যক্রম চলেছে বলে ২০২৫ সালের একটি যৌথ অনুসন্ধানে উঠে আসে। তৎকালীন ডেনিশ কর্তৃপক্ষ গ্রিনল্যান্ডে জন্মহার ও পরিবারের আকার কমিয়ে জীবনযাত্রার মান এবং সামাজিক ও স্বাস্থ্য পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে চেয়েছিল।
তবে এই কর্মসূচির কারণে অনেক নারী গুরুতর শারীরিক ক্ষতির শিকার হন। অতিরিক্ত রক্তপাত, সংক্রমণ, জরায়ু ও ডিম্বনালিতে ক্ষত, এমনকি জরায়ু অপসারণ এবং সন্তান ধারণের সক্ষমতা হারানোর ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ

দুটি প্রতিবেদনের বিশেষজ্ঞরাই একমত হয়েছেন যে নারীদের বৈধ সম্মতি ছাড়া জন্মনিয়ন্ত্রণ প্রয়োগ তাদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করেছে। এর মধ্যে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের প্রতি সম্মানের অধিকার, সমতা ও বৈষম্য থেকে মুক্ত থাকার অধিকার এবং নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ থেকে মুক্ত থাকার অধিকার রয়েছে।
তবে এই লঙ্ঘন কতটা পরিকল্পিত ও প্রাতিষ্ঠানিক ছিল, সে বিষয়ে প্রতিবেদনের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
আলাস্কার আইনজীবী দালি সাম্বো ডোরো এবং কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অধ্যাপক মিরিয়াম কালেন মনে করেন, গ্রিনল্যান্ডের কালাল্লিত ইনুইট নারীদের অনিচ্ছাকৃত জন্মনিয়ন্ত্রণের শিকার হওয়ার বিষয়ে যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমানোও চিকিৎসকদের জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবহারের অন্যতম বিবেচনা ছিল বলে তারা মনে করেন।
অন্যদিকে ডেনিশ মানবাধিকার ইনস্টিটিউটের সাবেক প্রধান জোনাস ক্রিস্টোফারসেন ও মনোবিজ্ঞানী জেনসিনে নেদারগার্ড বলেন, নারীদের প্রতি অন্যায় হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু এর ব্যাপ্তি নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তাদের মতে, গ্রিনল্যান্ডের জনগোষ্ঠী ধ্বংস করার উদ্দেশ্য কোনো কর্তৃপক্ষ বা স্বাস্থ্যকর্মীর ছিল—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
কেন গণহত্যা বলা যাচ্ছে না
জাতিসংঘের গণহত্যা সনদে কোনো জাতীয়, জাতিগত, বর্ণগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে জন্ম ঠেকানোর উদ্দেশ্যে ব্যবস্থা নেওয়াকেও গণহত্যার সম্ভাব্য কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তবে শুধু এমন কর্মকাণ্ড সংঘটিত হলেই গণহত্যা প্রমাণিত হয় না। সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যও প্রমাণ করতে হয়।
বিশেষজ্ঞ ডোরো ও কালেন বলেছেন, শুধু জন্মনিয়ন্ত্রণের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে ডেনিশ কর্তৃপক্ষের এমন উদ্দেশ্য প্রমাণ করা সম্ভব নয়।
তবে তারা মনে করেন, গণহত্যার অভিযোগ পুরোপুরি নির্ধারণ করতে গ্রিনল্যান্ডে ডেনমার্কের বিরুদ্ধে ওঠা অন্যান্য অভিযোগও বিবেচনা করা প্রয়োজন। এর মধ্যে ইনুইট শিশুদের ডেনিশ পরিবারে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও রয়েছে। এই বিষয়টি তাদের প্রতিবেদনের আওতার বাইরে ছিল।
ডেনমার্কের বিরুদ্ধে সনদ লঙ্ঘনের অভিযোগ
গুরুত্বপূর্ণভাবে, ডোরো ও কালেনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৬৯ সালের মধ্যেই ডেনমার্ক জানতে পেরেছিল যে এই কর্মসূচি কোনো জনগোষ্ঠীর জন্ম ঠেকানোর পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ার গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করেছে। এরপরও নিজেদের ক্ষমতার মধ্যে থাকা সব ধরনের ব্যবস্থা না নেওয়ায় ডেনমার্ক গণহত্যা সনদ লঙ্ঘন করে থাকতে পারে বলে তারা মনে করেন।
ডেনমার্ক ১৯৫১ সালে ওই সনদ অনুমোদন করেছিল। সনদ অনুযায়ী গণহত্যা প্রতিরোধ ও শাস্তির পাশাপাশি তা সংঘটিত না করারও অঙ্গীকার রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করেছেন, ডেনমার্ক সনদ লঙ্ঘন করেছে কি না—এর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার আদালতের।
‘আমাদের পশুর মতো আচরণ করা হয়েছিল’
এই কর্মসূচির শিকার ৭০ বছর বয়সী ইঙ্গের প্লাতু জানান, তাকে বলা হয়েছিল ছোট একটি অস্ত্রোপচার করা হবে। কিন্তু জ্ঞান ফেরার পর তিনি জানতে পারেন, তার সম্মতি ছাড়াই জরায়ুর ভেতরে জন্মনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বসানো হয়েছে।
পরে চিকিৎসক তাকে জানান, ওই যন্ত্রের কারণে তৈরি জটিলতার ফলে তিনি আর গর্ভধারণ করতে পারবেন না। শেষ পর্যন্ত কলম্বিয়া থেকে দুটি শিশুকে দত্তক নেন তিনি।
প্লাতুর ভাষায়, কর্তৃপক্ষের প্রতি উপনিবেশিক মানসিকতার কারণে গ্রিনল্যান্ডের মানুষ অনেক সময় প্রশ্ন না করে তাদের নির্দেশ মেনে নিতেন।

ক্ষতিপূরণ ও পুনর্মিলনের উদ্যোগ
২০২৫ সালে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন ওই নারীদের কাছে ক্ষমা চান এবং ঘটনাগুলোকে ‘পদ্ধতিগত বৈষম্য’ হিসেবে উল্লেখ করেন। ১৯৯২ সালে গ্রিনল্যান্ড নিজেদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দায়িত্ব নেওয়ার পরও কিছু ঘটনা ঘটেছিল। সেসবের জন্য গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীও ক্ষমা চেয়েছেন।
বৃহস্পতিবার ডেনমার্ক ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত একটি আইন পাস করেছে। এর আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেক নারীকে ৩ লাখ ডেনিশ ক্রোনার দেওয়ার কথা রয়েছে।
গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইয়েনস-ফ্রেডেরিক নিলসেন একটি পুনর্মিলন কমিশন গঠনের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন। তার মতে, এর উদ্দেশ্য কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা নয়; বরং অতীতের সত্য উদঘাটন করে প্রকৃত পুনর্মিলনের পথ তৈরি করা।
তবে গ্রিনল্যান্ডের সিউমুত দল বলেছে, গণহত্যার প্রশ্নটি একটি স্বাধীন ও উপযুক্ত আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা উচিত।
গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের মধ্যেই প্রতিবেদন দুটি প্রকাশিত হওয়ায় বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে আসছেন। তার প্রশাসন ডেনিশ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অতীতের নানা অভিযোগও তুলে ধরেছে।
তবে প্রতিবেদনগুলোর সঙ্গে গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রশ্নকে এক করে না দেখার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও ভুক্তভোগীরা। তাদের মতে, বহু বছর ধরে নারীদের যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, সেটিকে আলাদাভাবে স্বীকৃতি দেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রিনল্যান্ডে জোরপূর্বক জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি নারীদের অধিকার মারাত্মকভাবে লঙ্ঘন করেছে—এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ঐকমত্য থাকলেও, এটিকে গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করার মতো প্রয়োজনীয় উদ্দেশ্য ও প্রমাণ এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















