ভয়, উদ্বেগ কিংবা অতিরিক্ত মানসিক চাপের মুহূর্তে অনেকেই নিজেকে স্বাভাবিক রাখার উপায় খোঁজেন। এমন পরিস্থিতিতে সহজ একটি শ্বাস-প্রশ্বাসের কৌশল ‘বক্স ব্রিদিং’ অনেকের জন্য কার্যকর হয়ে উঠেছে। এই পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট ছন্দে শ্বাস নেওয়া, শ্বাস ধরে রাখা এবং শ্বাস ছাড়ার মাধ্যমে শরীর ও মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়।
দুশ্চিন্তায় ঘুম হারাম, ভরসা বক্স ব্রিদিংয়ে
ভেনেজুয়েলার লা গুয়াইরা শহরে ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর নিজের পরিবার ও বন্ধুদের জন্য দুশ্চিন্তায় ছিলেন মারিয়া মেদিনা। দুর্ঘটনার সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় ছিলেন, নিজের শহর থেকে প্রায় দেড় হাজার মাইল দূরে। উদ্বেগে রাতে ঘুমানোও কঠিন হয়ে পড়েছিল তার।
সে সময় ঘুমহীন রাত কাটাতে তাকে সাহায্য করে বক্স ব্রিদিং। ৩১ বছর বয়সী মারিয়া বলেন, এমন মুহূর্তে যখন মনে হয় নিজের করার মতো তেমন কিছু নেই, তখন রাতে বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকার বদলে তিনি জানেন, এই শ্বাস-প্রশ্বাসের কৌশল তাকে কিছুটা স্বস্তি দেবে।
২০২০ সালে প্রথম বক্স ব্রিদিংয়ের সঙ্গে পরিচিত হন মারিয়া। তখন তিনি স্নাতকোত্তর পড়াশোনার পাশাপাশি পূর্ণকালীন চাকরি করছিলেন। করোনাভাইরাস মহামারি শুরু হওয়ার পর পড়াশোনা ও চাকরির চাপ তার জন্য অসহনীয় হয়ে ওঠে। পরে একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ তাকে এই পদ্ধতি শেখান।
কীভাবে করতে হয় বক্স ব্রিদিং
শ্বাস-প্রশ্বাস প্রশিক্ষক স্টুয়ার্ট স্যান্ডেমানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বক্স ব্রিদিংয়ের মূল কাঠামো খুবই সহজ। প্রথমে চার সেকেন্ড ধরে শ্বাস নিতে হবে। এরপর চার সেকেন্ড শ্বাস আটকে রাখতে হবে। তারপর চার সেকেন্ড ধরে শ্বাস ছাড়তে হবে। সবশেষে আবার চার সেকেন্ড শ্বাস না নিয়ে অপেক্ষা করতে হবে।
এরপর একইভাবে পুরো প্রক্রিয়াটি আবার শুরু করতে হয়।
তবে চার সেকেন্ডই যে সবসময় নির্দিষ্ট থাকতে হবে, এমন নয়। সময় কিছুটা কম-বেশি করা যেতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রতিটি ধাপের সময় সমান রাখা। চারটি সমান ধাপের এই কাঠামোর কারণেই এর নাম হয়েছে বক্স ব্রিদিং।
স্টুয়ার্টের মতে, পরীক্ষা, উপস্থাপনা কিংবা অন্য কোনো উদ্বেগ তৈরি করতে পারে এমন পরিস্থিতির আগে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা সবচেয়ে উপকারী হতে পারে। কতক্ষণ করতে হবে, তারও নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম নেই। কেউ কয়েক মিনিটেই স্বস্তি অনুভব করেন, আবার কেউ ১৫ মিনিট পর্যন্ত চালিয়ে যান।
শ্বাস-প্রশ্বাসের বিভিন্ন অনুশীলনের শিকড় যোগের মতো প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী চর্চায় রয়েছে। শত শত বছর ধরে মার্শাল আর্টসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার দেখা যায়। আধুনিক সময়ে বক্স ব্রিদিং জনপ্রিয় হয়েছে মূলত মনোযোগ ধরে রাখা এবং স্নায়ুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করার সম্ভাবনার কারণে।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর বিশেষ বাহিনীর সদস্যরাও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে যাওয়ার আগে এই ধরনের শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন করেন বলে স্টুয়ার্ট জানান। তিনি ইংল্যান্ডের ফুটবল দলকেও শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন করিয়েছেন।
মারিয়ার ক্ষেত্রে ঘুমাতে যাওয়ার আগে কিংবা মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে তিনি বক্স ব্রিদিং করেন।
শেষ ধাপটিই কেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
উত্তর আমেরিকায় সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উচ্চচাপের পরিস্থিতিতে বক্স ব্রিদিংয়ের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, চাপপূর্ণ পরিস্থিতিতে এই পদ্ধতি হৃদস্পন্দন এবং শরীরের অন্যান্য মানসিক চাপ-সম্পর্কিত সূচকের বড় ধরনের বৃদ্ধি ঠেকাতে সহায়তা করতে পারে।
জুনে প্রকাশিত ওই গবেষণাটি টেক্সাস স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় এবং টরন্টো মিসিসাগা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা পরিচালনা করেন।
:max_bytes(150000):strip_icc()/box-breathing-GettyImages-1644662793-3bdde86fff2343f6a11f48e17b02028f.jpg)
চিকিৎসক ও নার্সদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা চিকিৎসক হেলেন গ্যার বলেন, তিনি অনেক রোগীকেই বক্স ব্রিদিং করার পরামর্শ দেন। তার মতে, মানসিক চাপের প্রতিক্রিয়া এবং স্নায়ুতন্ত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য এটি সবচেয়ে কার্যকর বৈজ্ঞানিকভাবে সমর্থিত সহজ কৌশলগুলোর একটি।
তার ব্যাখ্যায়, বক্স ব্রিদিংয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো শ্বাস ছাড়ার পরের সেই বিরতি, যখন কিছু সময় শ্বাস না নিয়ে থাকতে হয়।
এই সময় শরীরে কার্বন ডাই-অক্সাইড জমতে থাকে। মস্তিষ্কে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বাড়লে শরীর সেটিকে বিপদের সংকেত হিসেবে অনুভব করতে পারে। তখন স্বাভাবিকভাবেই শ্বাস নেওয়ার তাগিদ তৈরি হয়।
হেলেন গ্যার মনে করেন, শেষ ধাপের এই অনুশীলন শরীরকে রক্ত ও মস্তিষ্কে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে ধীরে ধীরে মানিয়ে নিতে সাহায্য করতে পারে। এর ফলে আতঙ্ক বা অতিরিক্ত চাপের অনুভূতি সামলানোর ক্ষমতা বাড়তে পারে।
মানুষ মানসিক চাপে থাকলে স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের ধরনও বদলে যায়। এর ফলে শরীরে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রাতেও পরিবর্তন ঘটে।
প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত করেছেন অনেকে
ক্যালিফোর্নিয়ার ২৮ বছর বয়সী ব্রিটানি ল্যাম ঘুমানোর আগে নয়, বরং সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর বক্স ব্রিদিং করেন।
তিনি বলেন, প্রতিদিন সকালে এই অনুশীলন করেন এবং কারও সঙ্গে কথা বলার ঠিক আগেও তিনি এটি করেছিলেন।
ব্যক্তিগত জীবনের কঠিন এক সময় মানসিক চাপ সামলানোর উপায় খুঁজতে গিয়ে কয়েক বছর আগে অনলাইনে বক্স ব্রিদিং সম্পর্কে জানতে পারেন ব্রিটানি। এরপর ধীরে ধীরে এটি তার দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।
সাবেক সেনাসদস্য থেকে শুরু করে জীবনযাপনবিষয়ক প্রশিক্ষকেরাও এই কৌশল কীভাবে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে পরামর্শ দেন। অনেকে আবার অনুসরণ করার সুবিধার জন্য ধাপে ধাপে নির্দেশনাও তৈরি করেন।
ব্রিটানি বলেন, ঘুম থেকে উঠে যদি কারও উদ্বেগ হয়, তাহলে নিজের চিন্তার জগতে আটকে না থেকে শরীরের অনুভূতির দিকে মনোযোগ ফিরিয়ে আনতে এটি ভালো একটি উপায় হতে পারে।
তার নিজের ক্ষেত্রে এটি চিন্তা ও আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণের অনুভূতি তৈরি করে। ফলে দিনের শুরুতেই আবেগ তার পুরো দিনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
বক্স ব্রিদিংয়ে ভালো ফল পাওয়ার পর তিনি অন্যান্য শ্বাস-প্রশ্বাসের কৌশল সম্পর্কেও শেখেন। মনোবিজ্ঞানে পড়াশোনা করা ব্রিটানি বর্তমানে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে পেশাগত প্রশিক্ষণও নিচ্ছেন এবং জীবনযাপনবিষয়ক প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন।
অন্যদেরও শেখাচ্ছেন ব্রিটানি
ব্রিটানি তার সঙ্গে কাজ করা মানুষদের সঙ্গে বৈঠক শুরুর সময়ও বক্স ব্রিদিং করান। তার উদ্দেশ্য হলো, আলোচনায় বসার আগে সবাইকে কিছুটা শান্ত হতে সাহায্য করা।
বিশেষ করে সম্পর্কের সমস্যা কিংবা অন্য কোনো আবেগঘন বিষয় নিয়ে আলোচনা করার সময় এই অনুশীলন কথোপকথনকে কিছুটা সহজ করে দিতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
তবে শ্বাস-প্রশ্বাসের কৌশল নিয়ে অনেকের সংশয় রয়েছে। সত্যিই এগুলো মানসিক চাপের ওপর কতটা প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও ব্রিটানি মানুষকে অন্তত চেষ্টা করে দেখার পরামর্শ দেন।
তার মতে, সব মানুষের জন্য একই ধরনের শ্বাস-প্রশ্বাসের পদ্ধতি সমানভাবে কার্যকর নাও হতে পারে। মানুষের অনুভূতি ও পরিস্থিতি অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের কৌশল রয়েছে।
তিনি জানান, তার সঙ্গে কাজ করা বেশিরভাগ মানুষই অনুশীলনের পর নিজেদের ভালো অনুভব করার কথা বলেন।
বিপর্যয়ের মধ্যেও স্বস্তির একটি উপায়
ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্পে মারিয়ার পরিবারের কেউ মারা না গেলেও তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বাড়ি ধ্বংস হয়েছে। পরিচিত অনেকেই পরিবার ও বন্ধু হারিয়েছেন। ভয়াবহ সেই অভিজ্ঞতার প্রভাব এখনো মাঝে মাঝে তার ঘুমে দেখা দেয়।
তবু অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা অসহায়ত্বের মুহূর্তে বক্স ব্রিদিং তাকে পরিস্থিতি সামলাতে সাহায্য করে বলে মনে করেন তিনি।
মারিয়া মনে করেন, দৈনন্দিন জীবনে মানুষ অনেক সময় সচেতনভাবে শ্বাস নেওয়ার বিষয়টি ভুলে যায়। অথচ শরীর ও মনের ওপর সচেতন শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রভাবকে আমরা প্রায়ই অবমূল্যায়ন করি।
মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে সহজ অনুশীলন
বক্স ব্রিদিং মূলত শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার একটি নির্দিষ্ট ছন্দ তৈরি করে মনোযোগকে বর্তমান মুহূর্তে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে। চাপের সময় শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া বদলে যেতে পারে। সেই অবস্থায় ধীর, সমান এবং সচেতন শ্বাস-প্রশ্বাস শরীর ও মনের ওপর নিয়ন্ত্রণের অনুভূতি তৈরি করতে সহায়তা করতে পারে।
তবে এটি সব ধরনের মানসিক সমস্যা বা উদ্বেগের চিকিৎসার বিকল্প নয়। দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ, আতঙ্ক, ঘুমের সমস্যা বা গুরুতর মানসিক সংকট থাকলে যোগ্য চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















