ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের তেলবাহী জাহাজ আরও সহজে জব্দ এবং পরে সেগুলোর সম্পদ বিক্রি করার সুযোগ তৈরি করতে যুক্তরাষ্ট্রের শতাব্দীপ্রাচীন একটি সামুদ্রিক আইন আবার সক্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছে। এই আইনি ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘প্রাইজ আইন’, যা যুদ্ধের সময় শত্রুপক্ষের জাহাজ বা পণ্য জব্দ করার নিয়ম নির্ধারণ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলার অ্যাটর্নি অ্যারন রেইটজ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেছেন, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সামরিক সংঘাতের সময় শত্রুপক্ষকে সহায়তা করা জাহাজ বা পণ্য জব্দ করার প্রয়োজন হলে ফেডারেল আদালতকে সেসব জাহাজ ও পণ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
তিনি বলেন, প্রাইজ আইন একটি প্রাচীন সামুদ্রিক আইন। এটি আগে থেকেই আইনে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, তবে এখন তা আবার সক্রিয় করা হচ্ছে। জব্দ করা সামুদ্রিক সম্পদ কীভাবে বাজেয়াপ্ত, ফেরত বা অন্যভাবে নিষ্পত্তি করা হবে, সেই নিয়ম এই আইনে নির্ধারিত।
ইরানের ওপর নৌ অবরোধ জোরদারের সুযোগ

এই আইন কার্যকর হলে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি যুদ্ধের ব্যয়ও জব্দ করা সম্পদ বিক্রির মাধ্যমে কিছুটা পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সাধারণ দেওয়ানি জব্দ আইনের সঙ্গে প্রাইজ আইনের বড় পার্থক্য রয়েছে। দেওয়ানি আইনে কোনো জাহাজ জব্দ করতে হলে সরকারকে নির্দিষ্ট কোনো আইনি লঙ্ঘন চিহ্নিত করতে হয় এবং সেই লঙ্ঘনের ওপর আদালতের এখতিয়ার প্রতিষ্ঠা করতে হয়। এ ধরনের মামলা দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে গড়াতে পারে।
অন্যদিকে, প্রাইজ আইনে জব্দ করার জন্য আগেই আদালতের পরোয়ানা নেওয়া কিংবা কোনো বিদ্যমান আইনের লঙ্ঘনের সঙ্গে জাহাজটির জব্দের বিষয়টি সরাসরি যুক্ত করা বাধ্যতামূলক নয়। সাধারণ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পরিবর্তে প্রতিরক্ষা বিভাগ সামরিক শক্তি ব্যবহার করে শত্রুপক্ষের জাহাজ জব্দ করতে পারে।
মধ্যযুগ থেকে শুরু এই আইনের ইতিহাস
প্রাইজ আইনের শিকড় মধ্যযুগ পর্যন্ত বিস্তৃত। যুক্তরাষ্ট্রের আইনব্যবস্থার শুরু থেকেই যুদ্ধের সময় শত্রুপক্ষের জাহাজ দখল ও বাজেয়াপ্ত করার নীতির উপস্থিতি ছিল। দেশটির সংবিধানেও যুদ্ধের সময় শত্রুপক্ষের জাহাজ দখল ও বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা নিয়ে বিধান রয়েছে।
উনিশ শতকে প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন ১৮১২ সালের প্রাইজ আইন ব্যবহার করে কনফেডারেটদের সমুদ্রবন্দর অবরোধ করেছিলেন। সেই পদক্ষেপ আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হলেও শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট তা বহাল রাখে।
এরপর সর্বশেষ ১৮৯৮ সালের স্পেন-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের সময় এই আইনের ব্যবহার দেখা যায়। ওই সময় স্পেনের জাহাজগুলোকে যুদ্ধের সম্পদ হিসেবে আটক করার আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছিল।

তবে এবার ঠিক কোন আইনের অধীনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা রেইটজ স্পষ্ট করেননি। ১৮১২ সালের প্রাইজ আইন, সংবিধানের সংশ্লিষ্ট ধারা অথবা অন্য কোনো আইন ব্যবহার করা হতে পারে।
জাহাজ ও তেল বিক্রি করে অর্থ পেতে পারে যুক্তরাষ্ট্র
এই আইনি ব্যবস্থার অন্যতম আকর্ষণ হলো জব্দ করা জাহাজ ও তেল বিক্রি করে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি কোষাগারে অর্থ জমা দেওয়ার সুযোগ।
নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ও সামুদ্রিক আইনজীবী রেমন্ড ওয়েইডের মতে, জব্দ করা তেল ও জাহাজ বিক্রি করে পাওয়া অর্থ সরকারের কোষাগারে যুক্ত করার ক্ষেত্রে প্রশাসনের স্পষ্ট আর্থিক আগ্রহ থাকতে পারে।
অর্থাৎ, এই উদ্যোগ শুধু ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর কৌশল নয়; যুদ্ধের অর্থনৈতিক ব্যয় কমাতেও এটি ব্যবহার করা হতে পারে।
পুরোনো আইনই হতে পারে বড় আইনি সমস্যা
তবে আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কয়েক শতাব্দী পুরোনো এই আইন পুনরুজ্জীবিত করলেই ইরানের জাহাজ জব্দের প্রক্রিয়া সহজ হয়ে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং আইনটির দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়াই নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে।
সামুদ্রিক আইনজীবী মাইকেল ফ্রেভোলা রসিকতা করে বলেছেন, বিচার বিভাগে এই আইনে অভিজ্ঞ আইনজীবীর সংখ্যা এতটাই কম যে গুরুতর পরামর্শ পেতে যেন ‘আত্মাদের ডেকে আনতে হবে’।
কারণ, ১৮৯৮ সালের স্পেন-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের পর প্রাইজ আইন কার্যত ব্যবহার হয়নি। ফলে আধুনিক যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক আইন ও বর্তমান মার্কিন সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে এই পুরোনো আইন কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে।
যুদ্ধ ঘোষণা না থাকায় তৈরি হতে পারে ধূসর অঞ্চল
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো, যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেনি।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাইজ আইন প্রয়োগ করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে দেখাতে হবে যে জাহাজ জব্দের ঘটনা এমন একটি যুদ্ধ বা সশস্ত্র সংঘাতের অংশ, যার জন্য প্রেসিডেন্ট ও কংগ্রেসের সাংবিধানিক ক্ষমতার যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে।
যেহেতু ইরানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা হয়নি, তাই প্রাইজ আইন ব্যবহারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। এই বিষয়টি কংগ্রেসকেও এমন একটি বিতর্কে আরও সক্রিয় করে তুলতে পারে, যেটি থেকে তারা এখন পর্যন্ত অনেকটাই দূরে থেকেছে।
নৌ অবরোধ নিয়েও মামলা হতে পারে
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের বৈধতা নিয়েও আদালতে মামলা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সামুদ্রিক আইনজীবী অ্যালিসন লুজউইকের মতে, অবরোধটি যথাযথভাবে ঘোষণা করা হয়েছিল কি না এবং সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোকে সে বিষয়ে যথেষ্টভাবে জানানো হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্ন আদালতে উঠতে পারে।
বিশেষ করে নিরপেক্ষ কোনো দেশের জাহাজ যদি অন্য দেশের পণ্য বহন করে, তাহলে সেই জাহাজও জব্দের আওতায় পড়বে কি না, তা নিয়ে আরও জটিলতা তৈরি হতে পারে।
কোনো জাহাজ আদৌ অবরোধের আওতায় ছিল কি না, জাহাজটির কাছে অবরোধের খবর পৌঁছেছিল কি না এবং সেটি ইচ্ছাকৃতভাবে অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করেছিল কি না—এসব বিষয় নিয়েও আইনি বিতর্ক হতে পারে।

পুরোনো আইনের নতুন পরীক্ষা
ফলে ইরানের তেলবাহী জাহাজ জব্দে প্রাইজ আইন পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একই সঙ্গে সামরিক, অর্থনৈতিক ও আইনি কৌশল হয়ে উঠতে পারে। এতে জাহাজ জব্দের প্রক্রিয়া তাত্ত্বিকভাবে সহজ হলেও, প্রায় ১৩০ বছর ধরে ব্যবহার না করা একটি আইনের আধুনিক প্রয়োগ নিয়ে আদালতে দীর্ঘ বিতর্ক শুরু হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
মূল পরীক্ষা হবে—যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র কতটা বিস্তৃতভাবে এই প্রাচীন যুদ্ধকালীন আইন ব্যবহার করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বা নিরপেক্ষ জাহাজের ক্ষেত্রে সেই ক্ষমতার সীমা কোথায়।
ইরানের তেলবাহী জাহাজ জব্দে প্রাইজ আইন কেন গুরুত্বপূর্ণ
ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ জোরদার, তেল ও জাহাজ বিক্রি করে অর্থ পুনরুদ্ধার এবং সামরিকভাবে জাহাজ জব্দের আইনি ভিত্তি তৈরির ক্ষেত্রে শতাব্দীপ্রাচীন প্রাইজ আইনকে নতুন করে সামনে আনছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে যুদ্ধ ঘোষণা না থাকা ও নিরপেক্ষ জাহাজ নিয়ে সম্ভাব্য মামলা এই উদ্যোগকে বড় আইনি পরীক্ষার মুখে ফেলতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















