কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের করা মামলার নিষ্পত্তিতে মেটা আগামী ১০ বছরে সর্বোচ্চ ১৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দিতে রাজি হয়েছে। মামলাগুলোতে অভিযোগ ছিল, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যাতে শিশু-কিশোরেরা এসব প্ল্যাটফর্মে দীর্ঘ সময় আটকে থাকে। পাশাপাশি শিশুদের ক্ষতির বিষয়ে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করা এবং ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের তথ্য যথাযথ অভিভাবকীয় অনুমতি ছাড়া সংগ্রহের অভিযোগও আনা হয়েছিল।
২৬ আগস্ট ২০২৬ মেটা সমঝোতার ঘোষণা দেয়। এর মাধ্যমে ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে শুরু হতে যাওয়া একটি ফেডারেল বিচার কার্যত শেষ হয়ে যায়। মামলাটিতে মেটার সম্ভাব্য আর্থিক দায় ছিল অত্যন্ত বড়। অঙ্গরাজ্যগুলোর দাবি ছিল, জরিমানা কয়েকশ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে মেটা সমঝোতার পথে যায়। প্রতিষ্ঠানটি অবশ্য কোনো অন্যায় স্বীকার করেনি। সমঝোতাটি কার্যকর করতে বিচারক ইয়ভন গনজালেস রজার্সের অনুমোদন প্রয়োজন।
অভিযোগের কেন্দ্রে ছিল কিশোরদের আটকে রাখার নকশা
ওকল্যান্ডের মামলায় ২০২৩ সালে ২৯টি অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলদের করা পৃথক মামলা একত্র করা হয়েছিল। এর আগে ২০২১ সালে দেশজুড়ে একটি তদন্ত শুরু হয়েছিল।
অঙ্গরাজ্যগুলোর অভিযোগ ছিল, মেটা কিশোরদের মানসিক ও বিকাশগত দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে ব্যবহার বাড়ানোর উদ্দেশ্যে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য তৈরি করেছে। এর মধ্যে ছিল অন্তহীনভাবে নিচে নামতে থাকা বিষয়বস্তু, স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিডিও চালু হওয়া, বারবার বিজ্ঞপ্তি পাঠানো, পছন্দের সংখ্যা দেখানো এবং চেহারা পরিবর্তনকারী বিভিন্ন ফিল্টার।

অভিযোগকারীদের দাবি, মেটার নিজস্ব গবেষণাতেও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারের সঙ্গে তরুণদের বিষণ্নতা, উদ্বেগ এবং নিজের শরীর নিয়ে নেতিবাচক ধারণার মতো সমস্যার সম্পর্ক পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি প্রকাশ্যে এসব ঝুঁকি কম গুরুত্ব দিয়ে দেখিয়েছে বা আড়াল করেছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ ছিল, ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের কাছ থেকে অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের শিশুদের গোপনীয়তা সুরক্ষা-সংক্রান্ত আইন লঙ্ঘন করতে পারে।
অঙ্গরাজ্যগুলো আরও বলেছিল, এসব কর্মকাণ্ড ভোক্তা সুরক্ষা আইনও লঙ্ঘন করেছে।
কেন ভোক্তা সুরক্ষা আইনের অভিযোগটি গুরুত্বপূর্ণ
ইন্টারনেটভিত্তিক প্ল্যাটফর্মগুলো দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ-শালীনতা আইনের ২৩০ ধারার সুরক্ষা পেয়ে এসেছে। ব্যবহারকারীরা যে বিষয়বস্তু প্রকাশ করেন, তার জন্য সাধারণত প্ল্যাটফর্মগুলোকে দায়ী করা হয় না।
কিন্তু মেটার বিরুদ্ধে করা এই মামলার ধরন ছিল আলাদা। এখানে ব্যবহারকারীর প্রকাশিত বিষয়বস্তুর জন্য নয়, বরং মেটার নিজের পণ্য নকশা, ব্যবসায়িক কর্মকৌশল এবং কথিত বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে দায়ী করার চেষ্টা করা হয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার আইনজীবী মামলার মূল যুক্তিকে চারটি শব্দে তুলে ধরেছিলেন—ব্যবহারকারীকে আকৃষ্ট করা, ধরে রাখা, তার তথ্য সংগ্রহ করা এবং ক্ষতির বিষয়টি আড়াল করা।
এই ধরনের অভিযোগ যে আদালতে এগোতে পারে, তার আগের দৃষ্টান্তও রয়েছে। ম্যাসাচুসেটসে একই ধরনের একটি মামলা আদালত চলতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
একটি সমঝোতা মানেই সব মামলা শেষ নয়
মেটার বিরুদ্ধে চলমান সব আইনি লড়াই এই সমঝোতার মাধ্যমে শেষ হচ্ছে না। ওকল্যান্ডের ফেডারেল মামলাটি ৪৭টি অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে করা চুক্তির আওতায় নিষ্পত্তি হয়েছে। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মামলা এখনো সক্রিয়।

লস অ্যাঞ্জেলেসে আলাদা একটি ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্য আদালতের মামলায় একটি জুরি মেটা ও গুগলকে দায়ী করেছে। সেখানে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানগুলোর পণ্য এমনভাবে নকশা করা হয়েছিল, যা এক কিশোরীর মানসিক ক্ষতির ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল। ওই মামলায় মেটার বিরুদ্ধে ৪ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার এবং গুগলের বিরুদ্ধে ১ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়।
অঙ্কগুলো তুলনামূলকভাবে ছোট মনে হলেও একই ধরনের হাজার হাজার ব্যক্তিগত মামলা চলমান থাকায় সম্মিলিত ক্ষতিপূরণ অনেক বড় হতে পারে। মেটা ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে।
নিউ মেক্সিকোতেও আলাদা আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। সেখানে অভিযোগ ছিল, মেটা শিশুদের বিপদের মধ্যে ফেলেছে এবং অঙ্গরাজ্যের ভোক্তা সুরক্ষা আইন লঙ্ঘন করেছে। নিউ মেক্সিকো মেটার বিরুদ্ধে ৯০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থের রায় পেয়েছে। মেটা সেই সিদ্ধান্তও চ্যালেঞ্জ করছে।
এই দুটি মামলা ওকল্যান্ডের ফেডারেল বিচারের অংশ ছিল না। তাই নতুন সমঝোতা সেগুলোর নিষ্পত্তি করছে না এবং এ থেকে কোনো আইনি নজিরও তৈরি হচ্ছে না।
টাকার চেয়ে বড় বিষয় পণ্য নকশা বদল
সমঝোতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের ব্যবহার-পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা।
আদালতের অনুমোদন পাওয়া গেলে অংশগ্রহণকারী অঙ্গরাজ্যগুলোতে ১৮ বছরের কম বয়সী কিশোরদের জন্য ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকে প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা ব্যবহারের একটি স্বয়ংক্রিয় সীমা থাকবে। দুই অ্যাপ এবং একাধিক হিসাব মিলিয়েই এই সময় গণনা করা হবে। শুধু অভিভাবক চাইলে সেই সীমা তুলে দিতে পারবেন।
মধ্যরাত থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত অ্যাপ ব্যবহারে বাধা থাকবে। স্কুল চলাকালে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত সাধারণ বিজ্ঞপ্তিও বন্ধ থাকবে, যদিও সরাসরি বার্তা এর বাইরে থাকবে।
একটানা ১৫ মিনিট ব্যবহার করার পর ব্যবহারকারীকে বিরতি নেওয়ার জন্য স্মরণ করিয়ে দেওয়া হবে।
ব্যবহারকারীরা এমন একটি ধারাও বেছে নিতে পারবেন, যেখানে বিষয়বস্তু ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী সাজানো হবে না।
স্বয়ংক্রিয় ভিডিও চালুর সুবিধা বন্ধ করা যাবে এবং অভিভাবকেরা সেটিকে শুরু থেকেই বন্ধ রাখার ব্যবস্থা করতে পারবেন।

পছন্দের সংখ্যা স্বাভাবিকভাবে গোপন রাখা হবে। প্রসাধনমূলক অস্ত্রোপচার বা অতিরিক্ত সাজসজ্জার চেহারা তৈরির ফিল্টারও বন্ধ করা হবে।
১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের শনাক্ত করার ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করার কথা রয়েছে।
স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাই কেন গুরুত্বপূর্ণ
এই পরিবর্তনগুলোর বিশেষ গুরুত্ব হলো, এগুলোর অনেকগুলো ব্যবহারকারীর ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে না দিয়ে শুরু থেকেই পণ্যের স্বাভাবিক ব্যবহারের অংশ হয়ে যাবে।
কোনো কিশোর বা অভিভাবককে যদি প্রথমে নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুঁজে বের করতে হয়, সেটি কীভাবে কাজ করে বুঝতে হয় এবং তারপর নিজে থেকে চালু করতে হয়, তাহলে সেটি এক ধরনের ব্যবস্থা। আর কোনো নিরাপত্তা বাধা যদি পণ্যের ভেতরেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি থাকে, তাহলে সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
সমঝোতাটি তাই শুধু নতুন কিছু নিয়ম যোগ করছে না। এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সেই মূল কাঠামো পরিবর্তনের চেষ্টা করছে, যা নির্ধারণ করে একজন ব্যবহারকারী কীভাবে প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন।
এখানেই বিষয়টির বড় তাৎপর্য। প্রতিষ্ঠানটি শুধু ব্যবহারকারীদের আচরণের ওপর দায় চাপাচ্ছে না; বরং যে পরিবেশটি নিজেই তৈরি করেছে, তার জন্যও দায়িত্ব গ্রহণের কাঠামো তৈরি হচ্ছে।
১৭ বিলিয়ন ডলার আসলে কতটা বড়?
১০ বছরে সর্বোচ্চ ১৭ বিলিয়ন ডলার অর্থ প্রদান শুনতে বিশাল মনে হলেও মেটার আর্থিক সক্ষমতার তুলনায় এর প্রভাব অনেক সীমিত হতে পারে।
এক দশকে মেটার প্রত্যাশিত মোট আয়ের তুলনায় এই অর্থ আনুমানিক ১ শতাংশের মতো। প্রতিষ্ঠানটি বিনিয়োগকারীদের জানিয়েছে, সমঝোতার কারণে তাদের আর্থিক পূর্বাভাসে বড় কোনো পরিবর্তন হবে না; বরং একটি ত্রৈমাসিক সময়ের জন্য ব্যয় হিসেবে এর প্রভাব পড়বে।
অর্থাৎ, মেটার জন্য সবচেয়ে বড় বিষয় অর্থ পরিশোধ নয়। আসল বিষয় হলো ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের নকশা পরিবর্তন করা।
তবে এখানেই একটি সমস্যা রয়েছে। কঠোর নজরদারি ও স্বচ্ছতা ছাড়া শুধু নকশা পরিবর্তনের ঘোষণা দ্রুতই প্রচারণার হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে।
মেটা এর আগেও কিশোরদের জন্য বিশেষ হিসাব এবং অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মতো নিরাপত্তামূলক উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছে। তাই নতুন ব্যবস্থাগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা দীর্ঘ সময় ধরে স্বাধীনভাবে যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।

নজরদারি ব্যবস্থায় এখনো বড় প্রশ্ন
সমঝোতার আওতায় একজন স্বাধীন নিরীক্ষক প্রতি বছর মেটার নিয়ম মেনে চলা পর্যালোচনা করবেন। কিন্তু এই ব্যবস্থা থাকবে মাত্র পাঁচ বছর, যেখানে পুরো সমঝোতার মেয়াদ ১০ বছর।
আর সবচেয়ে শক্তিশালী আচরণগত শর্তগুলো—দৈনিক ব্যবহারের সীমা এবং রাতের সময় ব্যবহারে বাধা—প্রথম পাঁচ বছরের জন্য নিশ্চিত করা হয়েছে। ইউটিউব ও টিকটক একই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করলে কঠোরতর স্বয়ংক্রিয় নিয়মের মাধ্যমে এটি ১০ বছর পর্যন্ত বাড়তে পারে।
মেটা একটি স্বাধীন গবেষণা ফাউন্ডেশনও প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রযুক্তি খাতে এটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে তাদের পণ্যের প্রভাব নিয়ে সবচেয়ে বেশি তথ্য থাকে। অথচ স্বাধীন গবেষকদের অনেক সময় সেই তথ্যের নাগাল দেওয়া হয় না।
তবে এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করবে এমন কিছু বিষয়ের ওপর, যেগুলো এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
স্বাধীন নিরীক্ষককে কে নিয়োগ করবে? তিনি কোন তথ্য দেখতে পারবেন? স্বাধীন গবেষকেরা কি নিজেদের মতো করে গবেষণার ফল যাচাই করতে পারবেন? মেটা নিয়মের ভাষা মেনে চললেও যদি পণ্যের এমন নতুন নকশা তৈরি করে, যা পুরোনো সমস্যাকে অন্যভাবে ফিরিয়ে আনে, তাহলে সেটিকে কীভাবে নিয়মভঙ্গ হিসেবে গণ্য করা হবে? আর মেটার প্রভাব থেকে স্বাধীন গবেষণা ফাউন্ডেশন কীভাবে মুক্ত থাকবে?
প্রযুক্তি খাতে নীতিনির্ধারণের বড় দুর্বলতা অনেক সময় নিয়ম তৈরিতে নয়, বরং সেই নিয়ম কার্যকর করার পর্যায়ে দেখা যায়।
সমঝোতার ফলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণও হারিয়ে যেতে পারে
মামলা আদালতে গড়ালে সাধারণত প্রমাণ, নথি ও সাক্ষ্য প্রকাশ্যে আসার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু সমঝোতার মাধ্যমে মামলা শেষ হলে সেই প্রক্রিয়াও থেমে যায়।
ওকল্যান্ডের মামলায় মেটার তরুণ ব্যবহারকারীদের নিয়ে নিজস্ব গবেষণা এবং সেই গবেষণার ফল নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির আইনজীবীদের ভূমিকা সম্পর্কে যেসব অভ্যন্তরীণ নথি ও সাক্ষ্য সামনে আসছিল, সেগুলোর একটি অংশ এখন আর প্রকাশ্যে আসবে না।
অর্থাৎ অঙ্গরাজ্যগুলো একটি বড় আইনি সমাধান পেলেও সাধারণ মানুষের কাছে মেটার কর্মকাণ্ড কীভাবে এই পর্যায়ে পৌঁছেছে, তার সম্পূর্ণ নথি পাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে গেল।
এখন নজর থাকবে বাস্তব প্রয়োগে
সমঝোতার গুরুত্ব শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে এর বাস্তব প্রয়োগের ওপর।
নতুন স্বয়ংক্রিয় নিয়মগুলো সত্যিই কি ব্যবহার সীমিত করতে পারবে? একাধিক হিসাব বা বিভিন্ন যন্ত্র ব্যবহার করে কিশোরেরা কি সহজেই এগুলো এড়িয়ে যেতে পারবে? প্রযুক্তিতে বয়স নির্ধারণ করা যে কঠিন, সেটিও বড় চ্যালেঞ্জ।

আরেকটি প্রশ্ন হলো, কিশোরেরা যদি মেটার প্ল্যাটফর্মে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে, তারা কি এমন অন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলে যাবে, যেগুলো এই সমঝোতার আওতায় নেই? এমনকি সমঝোতার বাইরে থাকা সরাসরি বার্তা ব্যবস্থার ব্যবহারও কি বেড়ে যাবে?
টিকটক ও ইউটিউবকে টেনে আনার কৌশল
সমঝোতার সবচেয়ে কৌশলগত দিকগুলোর একটি হলো মেটার প্রতিদ্বন্দ্বী প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে এর সম্পর্ক।
অংশগ্রহণকারী অঙ্গরাজ্যগুলো ১৭ বিলিয়ন ডলারের প্রায় ৭০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ১২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার পাওয়ার নিশ্চয়তা পেয়েছে।
অন্য ৩০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৫ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার, তখনই ছাড় দেওয়া হবে যখন ইউটিউব ও টিকটক একই ধরনের কিশোর সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে এবং সমপরিমাণ অর্থ প্রদানে রাজি হবে।
এর ফলে মেটা কার্যত নিজের জরিমানার একটি অংশকে প্রতিদ্বন্দ্বীদের একই পথে আনার হাতিয়ারে পরিণত করেছে।
বার্তাটি স্পষ্ট—এই ধরনের নিয়ম আসছে। তাই প্রতিদ্বন্দ্বীদেরও একই নিয়ম মেনে একসঙ্গে এগিয়ে আসা ভালো, নইলে পরবর্তী আইনি লড়াই একা মোকাবিলা করতে হতে পারে।
এর পেছনে মেটার নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থও রয়েছে। নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা যদি মেটার পণ্যকে কম লাভজনক করে তোলে, তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপরও একই ধরনের বাধ্যবাধকতা থাকলে মেটা একাই অতিরিক্ত ব্যয়ের ভার বহন করবে না।
এই কৌশল কতটা সফল হবে, তা হয়তো সমঝোতার আর্থিক অঙ্কের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
কংগ্রেসের অচলাবস্থায় অঙ্গরাজ্যগুলোর ভূমিকা
যুক্তরাষ্ট্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণ দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অচলাবস্থায় রয়েছে।
ফলে কংগ্রেস যেসব বিষয়ে বহু বছর ধরে আইন তৈরি করতে পারেনি, অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলরা ভোক্তা সুরক্ষা আইন ব্যবহার করে সেসব বিষয়ে বাস্তব নিয়ম তৈরির পথ তৈরি করেছেন।
ব্যবহারের সময়সীমা, স্বয়ংক্রিয় নিয়ম, বিজ্ঞপ্তি এবং পণ্য নকশার মতো বিষয় এখন আদালতের মাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
এখানেই এই সমঝোতার সবচেয়ে গভীর শিক্ষা।
কোনো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শুধু ব্যবহারকারীর তৈরি বিষয়বস্তুর জন্য নয়, বরং তার নিজের পণ্য নকশার কারণে ক্ষতির অভিযোগও আইনি জবাবদিহির ভিত্তি হতে পারে।
আসল পরীক্ষা শুরু এখন
কোনো প্রতিষ্ঠান তার পণ্য নতুনভাবে নকশা করতে রাজি হলেই জবাবদিহি শেষ হয়ে যায় না। বরং সেখান থেকেই আসল পরীক্ষা শুরু হয়।
মেটার এই সমঝোতা অঙ্গরাজ্যগুলোকে এবং সাধারণ মানুষকে প্রায় এক দশকের একটি সময় দিয়েছে। এই সময়ে দেখা যাবে, নতুন নিয়মগুলো সত্যিই কার্যকর হয় কি না এবং কিশোরদের সুরক্ষায় প্রত্যাশিত পরিবর্তন আনতে পারে কি না।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—এই পুরো দশকজুড়ে এমন কোনো স্বাধীন প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি থাকবে কি না, যার কাছে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা, তথ্যের প্রবেশাধিকার এবং যথেষ্ট প্রণোদনা থাকবে, যাতে স্বাধীনভাবে নির্ধারণ করা যায় মেটার পরিবর্তনগুলো আসলে কাজ করছে কি না।
মেটার ১৭ বিলিয়ন ডলারের সমঝোতার আসল মূল্য তাই অর্থের অঙ্কে নয়; বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কীভাবে নকশা করা হবে এবং সেই নকশার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা আইনি দায় বহন করবে, সেই প্রশ্নে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















