স্কুলে শিশুরা গণিত, পড়াশোনা, সমাজ ও নানা বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করে। কিন্তু এর পাশাপাশি ছোটবেলা থেকেই তাদের শেখানো জরুরি—নিজের স্বাস্থ্য কীভাবে ভালো রাখতে হয় এবং যে পৃথিবীতে তারা বেড়ে উঠছে, সেটিকে কীভাবে নিরাপদ রাখা যায়। নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরু হতে পারে স্বাস্থ্যকর ও পরিবেশবান্ধব অভ্যাস গড়ে তোলার একটি ভালো সময়।
শিশুর স্বাস্থ্য ও পরিবেশ—দুই দিকেই লাভ
পরিবেশের জন্য ভালো অনেক অভ্যাসই শিশুর স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। প্লাস্টিক ও কীটনাশকে থাকা কিছু রাসায়নিক শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও মস্তিষ্কের বিকাশে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্লাস্টিকের বদলে কাচ বা স্টেইনলেস স্টিলের পাত্র ব্যবহার, অপ্রয়োজনীয় মোড়ক এড়িয়ে চলা এবং সম্ভব হলে জৈবভাবে উৎপাদিত খাবার বেছে নেওয়া যেতে পারে।
এতে একদিকে শিশুর শরীরে ক্ষতিকর রাসায়নিকের প্রবেশ কমে, অন্যদিকে মাটি ও পানিতে এসব উপাদান ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও কমে।
প্রক্রিয়াজাত খাবারে থাকা নানা ধরনের সংযোজক উপাদান থেকেও শিশুকে দূরে রাখা ভালো। তাজা, সম্পূর্ণ এবং ঘরে তৈরি খাবারকে অগ্রাধিকার দিলে খাবারের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় রাসায়নিক ও অতিরিক্ত মোড়ক—দুটিই কমানো সম্ভব।
প্রকৃতির কাছেই শিশুর স্বাভাবিক আনন্দ
শিশুর শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য প্রকৃতির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের গুরুত্ব অনেক। বাইরে খেলাধুলা করলে মানসিক চাপ কমতে পারে, সৃজনশীলতা বাড়তে পারে এবং শরীর সক্রিয় থাকে। একই সঙ্গে শিশুর প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসাও তৈরি হয়।
গাছপালা, মাটি, খোলা মাঠ কিংবা প্রাকৃতিক পরিবেশে সময় কাটালে একটানা মনোযোগ দিয়ে কাজ করার কারণে তৈরি হওয়া ক্লান্তিও কিছুটা কমতে পারে। বাইরে থাকার ফলে শিশুরা সাধারণত বেশি প্রাণবন্ত ও আনন্দিত থাকে।
তবে প্রকৃতির খেলায় সামান্য ঝুঁকিও থাকতে পারে। গাছে ওঠা, ঢালু জায়গায় দৌড়ানো বা উঁচু জায়গা থেকে লাফ দেওয়ার মতো কাজ শিশুকে নিজের সক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে। অবশ্যই শিশুর বয়স ও পরিস্থিতি অনুযায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই এসব সুযোগ দিতে হবে।
গাছের ছোট টুকরো, কাঠের গুঁড়ি, ডালপালা, তক্তা কিংবা শুকনো পাতা দিয়ে খেলার সুযোগ শিশুর কল্পনাশক্তি বাড়াতে পারে। নির্দিষ্ট নিয়মে বাঁধা খেলনার বদলে এসব উপকরণ শিশুকে নিজের মতো করে খেলার সুযোগ দেয়।
খাবারে লুকিয়ে থাকা অনাকাঙ্ক্ষিত উপাদান
শিশুদের প্রতিদিনের খাবারের ক্ষেত্রেও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। আগাছানাশক গ্লাইফোসেট বিভিন্ন শস্য, বীজ ও ডালজাতীয় খাবারে থাকতে পারে। বিশেষ করে ফসল কাটার আগে কিছু ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করা হয়।
খাদ্যাভ্যাসে জৈব খাবার যুক্ত করলে শরীরে গ্লাইফোসেটের মাত্রা দ্রুত কমতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই সম্ভব হলে নিরাপদ উৎস থেকে তাজা ও কম প্রক্রিয়াজাত খাবার বেছে নেওয়া যেতে পারে।
প্রকৃতির বন্ধু হয়ে উঠুক শিশুরা
শিশু যত বেশি প্রকৃতির কাছাকাছি থাকবে, পরিবেশ রক্ষার প্রতি তার দায়িত্ববোধও তত বেশি তৈরি হতে পারে। প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হলে শিশুরা বুঝতে শুরু করে, মানুষের বিভিন্ন কাজ পরিবেশের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে।
এভাবেই তারা নিজেরাই ছোট ছোট সিদ্ধান্ত নিতে শেখে। পরিবারের সদস্যদেরও পানি, বিদ্যুৎ, খাবার ও পণ্যের ব্যবহারে পরিবেশবান্ধব সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করতে পারে। পৃথিবীকে ভালো রাখার কাজে নিজেকে অংশীদার মনে করাও শিশুর আত্মবিশ্বাস ও আনন্দ বাড়াতে পারে।
প্রতিদিনের জীবনে পরিবেশবান্ধব অভ্যাস
স্কুল কাছাকাছি হলে সন্তানকে নিয়ে হেঁটে বা সাইকেলে যাওয়া যেতে পারে। এতে শরীরচর্চা হয় এবং একই সঙ্গে যানবাহন থেকে নির্গত গ্রিনহাউস গ্যাসও কমে।
টিফিনের জন্য বারবার ব্যবহারযোগ্য, টেকসই ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য বাক্স ও পাত্র ব্যবহার করা ভালো। স্কুলে খাবারের উচ্ছিষ্ট আলাদা করে জৈব সার তৈরির ব্যবস্থা না থাকলে শিশুকে তা বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে শেখানো যেতে পারে।
শিশুকে খাবার ফলানো, রান্নার প্রস্তুতি নেওয়া কিংবা টিফিন গুছিয়ে নেওয়ার কাজে যুক্ত করাও উপকারী। এতে প্রয়োজনীয় জীবনদক্ষতা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি খাবারের মূল্য সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয়।
স্কুলের পোশাক, ব্যাগ, বই, কম্পিউটারসহ প্রয়োজনীয় জিনিস কেনার সময়ও পরিবেশের কথা ভাবা যায়। নতুন জিনিস কেনার বদলে ভালো অবস্থায় থাকা ব্যবহৃত পোশাক নেওয়া, পুরোনো যন্ত্র মেরামত করে ব্যবহার করা কিংবা নষ্ট হওয়ার আগেই ব্যাগ ঠিক করে নেওয়া—এসব অভ্যাস শিশুকে দায়িত্বশীল হতে শেখায়।
ঘুম, খাবার ও শরীরচর্চার গুরুত্ব
প্রকৃতির মাঝে খেলাধুলার আরও একটি উপকার হলো এটি শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে সহায়তা করতে পারে। স্কুলের মতো জায়গায় যেখানে সহজেই জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে, সেখানে ভালো ঘুম, সুষম খাবার এবং নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা শিশুর সামগ্রিক সুস্থতার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
ভিটামিন ডি ও ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডও শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। খাবারের মাধ্যমে পর্যাপ্ত পরিমাণ পাওয়া কঠিন হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী সম্পূরক গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
টিফিনে থাকুক স্বাস্থ্যকর খাবার

শিশুর টিফিনে যতটা সম্ভব প্রক্রিয়াজাত খাবার ও অতিরিক্ত মোড়ক এড়িয়ে চলা ভালো। রঙিন ফল ও সবজি থেকে পাওয়া অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, সম্পূর্ণ শস্য, বীজ, ডাল, ফল ও সবজির খোসাসহ অংশ থেকে আঁশ এবং প্রয়োজনীয় প্রোটিন খাবারে রাখা যেতে পারে।
তবে স্বাস্থ্যকর খাবার দিলেই হবে না, শিশু আসলে কী খেতে পছন্দ করে সেটিও বিবেচনা করা জরুরি। যেমন পুরো আপেলের বদলে কেটে দেওয়া আপেল হয়তো সে বেশি আগ্রহ নিয়ে খাবে। একইভাবে আলাদা আলাদা উপকরণের বদলে তৈরি করা স্যান্ডউইচ তার কাছে বেশি আকর্ষণীয় হতে পারে।
শিশু যে খাবার খাবে না, সেটি বারবার টিফিনে দিয়ে শেষ পর্যন্ত ফেলে দেওয়ার চেয়ে তার পছন্দ ও প্রয়োজন বুঝে খাবার প্রস্তুত করা ভালো। এতে খাবারের অপচয়ও কমে।
যেসব খাদ্য উপাদান নিয়ে সতর্ক থাকা যায়
খাদ্য নিয়ে সচেতন থাকার ক্ষেত্রে কিছু রাসায়নিক উপাদানের নাম জানা থাকাও গুরুত্বপূর্ণ। এসবের মধ্যে রয়েছে পটাশিয়াম ব্রোমেট, প্রোপাইল প্যারাবেন, বিউটাইলেটেড হাইড্রক্সিয়ানিসোল, বিউটাইলেটেড হাইড্রক্সিটলুইন, টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইড, বিভিন্ন কৃত্রিম রং, অ্যাসপারটেম, অ্যাজোডিকার্বোনামাইড, প্রোপাইল গ্যালেট, টারশিয়ারি বিউটাইলহাইড্রোকুইনোন, সুক্রালোজ এবং সোডিয়াম নাইট্রাইট।
খাবারের মোড়কে থাকা উপাদানের তালিকা পড়ার অভ্যাস শিশুর বয়স অনুযায়ী ধীরে ধীরে তৈরি করা যেতে পারে। এতে সে বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের খাবার সম্পর্কে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে শিখবে।
ফল ও সবজিতেও সচেতনতা জরুরি
কিছু ফল ও সবজিতে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ থাকার আশঙ্কা তুলনামূলক বেশি হতে পারে। ২০২৬ সালের আলোচিত তালিকায় পালং শাক, বিভিন্ন ধরনের পাতাযুক্ত শাক, স্ট্রবেরি, আঙুর, নেকটারিন, পিচ, চেরি, আপেল, ব্ল্যাকবেরি, নাশপাতি, আলু ও ব্লুবেরির নাম রয়েছে।
তাই ফল ও সবজি ভালোভাবে ধুয়ে খাওয়া, সম্ভব হলে নিরাপদ উৎস থেকে কেনা এবং খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুর সুস্থতা আর পৃথিবীর সুস্থতা আসলে একে অপরের থেকে আলাদা নয়। স্বাস্থ্যকর খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত খেলাধুলা, প্রকৃতির সঙ্গে যোগাযোগ এবং সচেতনভাবে জিনিস ব্যবহার—এই ছোট ছোট অভ্যাসই ধীরে ধীরে একজন শিশুকে দায়িত্বশীল ও স্বাস্থ্যসচেতন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
শিশুর সুস্থ বেড়ে ওঠা এবং পরিবেশ রক্ষার সবচেয়ে ভালো শিক্ষা শুরু হতে পারে আমাদের প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজ থেকেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















