পাকিস্তানের রাষ্ট্রচিন্তায় সাত দশকের বেশি সময় ধরে একটি প্রশ্নই ঘুরেফিরে এসেছে—দেশটি কে চালাবেন? এবার সেই প্রশ্নের জায়গায় আরও মৌলিক একটি প্রশ্ন উঠে আসছে: পাকিস্তানকে কীভাবে চালানো হবে?
এই পার্থক্যটি আপাতদৃষ্টিতে শব্দের পরিবর্তন মনে হতে পারে। বাস্তবে এটি রাষ্ট্রক্ষমতার ধারণাতেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
স্বাধীনতার পর পাকিস্তান একের পর এক শাসনপদ্ধতি ও নেতৃত্বের মডেল পরীক্ষা করেছে। সামরিক শাসক এসেছেন, বেসামরিক রাজনীতিক ক্ষমতায় ফিরেছেন, প্রযুক্তিবিদদের ওপর নির্ভরতার চেষ্টা হয়েছে, জনতুষ্টিবাদী নেতৃত্বের উত্থান ঘটেছে, রাজনৈতিক বংশপরম্পরাও ফিরে এসেছে। ক্রিকেটের মাঠ থেকে একজন জনপ্রিয় নেতা পর্যন্ত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পদে পৌঁছেছেন।
কিন্তু নেতৃত্বের ধরন বদলালেও রাষ্ট্রের মৌলিক সংকট বদলায়নি।
ঋণ বেড়েছে, মুদ্রার মূল্য কমেছে, বিদ্যুৎ খাতের দায় ফুলে উঠেছে এবং অর্থনীতি বারবার সংকটের মুখে পড়েছে। পাকিস্তানের ইতিহাসে গভর্নর জেনারেল থেকে প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী—ক্ষমতার শীর্ষে বহু মুখ এসেছে। কিন্তু ফলাফলের ধারাবাহিকতা এতটাই অস্বস্তিকর যে প্রশ্ন উঠতেই পারে: সমস্যা কি চালকের, নাকি গাড়ির?
সম্ভবত পাকিস্তানের ক্ষমতাকাঠামো এখন দ্বিতীয় প্রশ্নটির দিকে তাকাতে শুরু করেছে।
ক্ষমতার মানুষ নয়, ক্ষমতার কাঠামো
নতুন প্রদেশ নিয়ে আলোচনা, সাংবিধানিক পরিবর্তনের উদ্যোগ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নতুন ভারসাম্য তৈরির প্রচেষ্টা—এসবকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে বড় ছবিটি ধরা পড়বে না।
এখানে মূল বিষয় হলো রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোকে এমনভাবে পুনর্বিন্যাস করা, যাতে কোনো একজন ব্যক্তি বা একটি রাজনৈতিক সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে পুরো ব্যবস্থা অস্থিতিশীল হয়ে না পড়ে।
এটি পাকিস্তানের জন্য বড় ধরনের চিন্তার পরিবর্তন। এতদিন মূল লড়াই ছিল ক্ষমতার দখল নিয়ে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে ক্ষমতাটিকে কীভাবে সংগঠিত করা হবে।
নতুন প্রদেশের ধারণার মধ্যেও তাই শুধু প্রশাসনিক সুবিধার বিষয় নেই; আছে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও কেন্দ্র-প্রদেশের ক্ষমতার হিসাব। সাংবিধানিক সংশোধনের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন শুধু আইন পরিবর্তনের নয়; প্রশ্ন হলো ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামো কোন নীতিতে পরিচালিত হবে।
সামরিক-বেসামরিক সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকেও এটি গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৫৮ সালের পর পাকিস্তানের ক্ষমতার রাজনীতিতে যে সমীকরণ বারবার ফিরে এসেছে, সেখানে প্রতিষ্ঠানগত স্থায়িত্বের প্রশ্নটি এখন আরও সামনে আসছে। বাস্তব রাজনীতিতে যে ধরনের হাইব্রিড ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে দেখা গেছে, সেটিকে যদি সাংবিধানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে স্থায়ী রূপ দেওয়ার চেষ্টা হয়, তবে সেটি ক্ষমতার ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন হবে।
কিন্তু কাঠামোই শেষ কথা নয়। নতুন ব্যবস্থা পুরোনো ব্যর্থতাকে নতুন পোশাকে ফিরিয়ে আনবে, নাকি সত্যিই রাষ্ট্রের সক্ষমতা বাড়াবে—সেটিই হবে আসল পরীক্ষা।
ভূগোল যখন কৌশলগত সম্পদ
পাকিস্তানের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে দেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে ঘিরে।

ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইসলামাবাদের যোগাযোগ, রিয়াদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক, বেইজিংয়ের দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত অংশীদারত্ব—সব মিলিয়ে পাকিস্তান আবারও আঞ্চলিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ পরিসরে উঠে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে।
পাকিস্তানের সেনাবাহিনী এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতার পাশাপাশি দেশটির ভৌগোলিক অবস্থানকে কূটনৈতিক প্রভাব তৈরির উপাদানে পরিণত করা হয়েছে।
সৌদি আরবের সঙ্গে কৌশলগত প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, মক্কাকেন্দ্রিক যৌথ প্রতিরক্ষা উদ্যোগ এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর পাকিস্তানি জনশক্তি ও মধ্যস্থতার প্রতি আগ্রহ—সবই দেখায় যে পাকিস্তানের কাছে এমন কিছু কৌশলগত সম্পদ রয়েছে, যার চাহিদা আন্তর্জাতিক পরিসরে রয়েছে।
কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য।
প্রভাব আছে, আয় নেই
কোনো দেশের কৌশলগত গুরুত্ব নিজে নিজে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি তৈরি করে না।
আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো যদি পাকিস্তানের সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী হয়, সেটি অবশ্যই কূটনৈতিক সম্পদ। কিন্তু সেই সম্পদ যদি বিনিয়োগ, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি স্থানান্তর, বৈদেশিক মুদ্রা আয় কিংবা উৎপাদনশীল অর্থনীতির সম্প্রসারণে রূপ না নেয়, তাহলে তার মূল্য সীমিত থেকে যায়।
পাকিস্তানের সমস্যা তাই এখন কেবল কৌশলগত গুরুত্বের অভাব নয়। বরং সেই গুরুত্বকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে না পারাই বড় দুর্বলতা।
এখানে সামরিক প্রতিষ্ঠানের জন্যও একটি কঠিন প্রশ্ন আছে। একটি দেশকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা এবং সেই গুরুত্বের সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে পৌঁছে দেওয়া এক বিষয় নয়। প্রথমটি শক্তি প্রদর্শনের সক্ষমতা; দ্বিতীয়টি রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতা।
পাকিস্তান যদি প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ টেবিলে জায়গা করে নেয়, কিন্তু দেশের অর্থনীতি সেই কূটনৈতিক অবস্থানের সুবিধা না পায়, তাহলে কৌশলগত সাফল্য শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবেও অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
সুযোগেরও মেয়াদ থাকে
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো সময়।
ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা কখনো স্থির থাকে না। আজ মধ্যপ্রাচ্যে যে সংঘাত আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর অগ্রাধিকার নির্ধারণ করছে, কাল তার চরিত্র বদলে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মনোযোগ পরিবর্তিত হতে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রয়োজনও বদলাতে পারে। চীনের নিজস্ব অগ্রাধিকারও নতুন পরিস্থিতিতে ভিন্ন হতে পারে।
অতএব পাকিস্তানের বর্তমান কৌশলগত গুরুত্বকে স্থায়ী সম্পদ ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
এখনকার সুযোগকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করার জন্য রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার দিকে যেতে হবে। শুধু নতুন ক্ষমতার সমীকরণ তৈরি করলেই হবে না; সেই সমীকরণকে মানুষের জীবনমান উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের সামনে তাই প্রশ্নটি আর কে চালকের আসনে বসবেন—এমন সরল প্রশ্ন নয়।
প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের গাড়িটি আদৌ ঠিক করা হচ্ছে কি না।
চালক বদলানো পাকিস্তানের ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। এবার যদি সত্যিই পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়, তবে ইঞ্জিন, ব্রেক, ট্রান্সমিশন—পুরো ব্যবস্থাটিই পরীক্ষা করতে হবে।
কারণ একটি রাষ্ট্রকে দীর্ঘদিন ধরে টিকিয়ে রাখে কোনো একক চালক নয়; কার্যকর প্রতিষ্ঠান, স্থিতিশীল অর্থনীতি এবং এমন একটি শাসনব্যবস্থা, যা চালক বদলালেও পথ হারায় না।
রিজওয়ান ফাররুখ 


















