সকালে অ্যালার্ম বেজে উঠলেই কি আপনি সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়তে পারেন? নাকি চোখ মেলে অ্যালার্মের দিকে তাকিয়ে মনে হয়—আর মাত্র পাঁচ মিনিট ঘুমাই! এরপর অ্যালার্ম বন্ধ করে আবার ঘুম, আবার অ্যালার্ম, আবার কয়েক মিনিটের ঘুম—এভাবেই শুরু হয় দিনের সকাল।
অনেকের কাছেই এটি খুব পরিচিত অভ্যাস। আসলে ঘুম থেকে জাগার সময় শরীর ও মস্তিষ্ক পুরোপুরি সচেতন হতে কিছুটা সময় নেয়। এই সময়টিকে বলা হয় ঘুমের জড়তা। তখন মাথা ভার লাগতে পারে, চিন্তা করতে কষ্ট হয় এবং বিছানা ছেড়ে ওঠার ইচ্ছাও কম থাকে। ফলে অ্যালার্ম বন্ধ করে আরও কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে থাকার সিদ্ধান্তটি খুব স্বাভাবিক মনে হয়।
কিন্তু প্রতিদিন অ্যালার্মের পর বারবার ঘুমানো কি সত্যিই ক্ষতিকর? নাকি এই অভ্যাসের কিছু ভালো দিকও আছে?
অ্যালার্ম বন্ধ করে আবার ঘুমালে কী হয়
অ্যালার্ম বন্ধ করে আবার ঘুমিয়ে পড়লে কয়েক মিনিট অতিরিক্ত ঘুম পাওয়া যায় ঠিকই। তবে এই ঘুম সাধারণত খুব গভীর বা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। অ্যালার্মের পর আবার ঘুমিয়ে পড়লে শরীর অনেক সময় হালকা ঘুমের পর্যায়ে ফিরে যায়।
ফলে কয়েক মিনিট ঘুমালেও সেই ঘুম সবসময় শরীর ও মস্তিষ্ককে আগের রাতের গভীর ঘুমের মতো পুনরুজ্জীবিত করতে পারে না। বরং বারবার অ্যালার্ম বেজে ওঠা ও ঘুম ভাঙার কারণে ঘুমের ধারাবাহিকতা নষ্ট হতে পারে।

অর্থাৎ, ঘুমের সময় কিছুটা বাড়লেও তার মান সবসময় বাড়ে না।
তবে অ্যালার্মের পর একটু ঘুমানো কি সবসময় খারাপ?
না। বিষয়টি এতটা সরল নয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যালার্মের পর কিছুক্ষণ ঘুমানো কখনো কখনো গভীর ঘুমের মধ্যেই হঠাৎ জেগে ওঠার সম্ভাবনা কমাতে পারে। গভীর ঘুম থেকে আচমকা জেগে উঠলে অনেকের প্রচণ্ড ঝিমুনি, মাথা ভার এবং অস্বস্তি দেখা দেয়।
বিশেষ করে যারা স্বাভাবিকভাবেই রাতে দেরিতে ঘুমাতে পছন্দ করেন এবং সকালে উঠতে বেশি কষ্ট পান, তাদের ক্ষেত্রে অ্যালার্মের পর অল্প সময়ের বিরতি জেগে ওঠার প্রক্রিয়াকে কিছুটা সহজ করতে পারে।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সকালে একবারে অ্যালার্ম দিয়ে জাগানোর তুলনায় প্রায় আধা ঘণ্টা বিরতিতে ঘুম ও জাগরণের কয়েকটি ছোট পর্ব কিছু মানুষের জ্ঞানীয় সক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেনি; বরং কিছু ক্ষেত্রে তা সামান্য উপকারও করেছে।
তাই অ্যালার্ম বন্ধ করে কয়েক মিনিট ঘুমানোকে সবার জন্য ক্ষতিকর অভ্যাস বলা ঠিক হবে না।
আসল বিষয় হলো—আপনার কতটা ঘুম হচ্ছে
অ্যালার্ম বন্ধ করে বারবার ঘুমানোর প্রয়োজন যদি প্রায় প্রতিদিন হয়, তাহলে সেটি অন্য একটি সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
আপনি যদি রাতে পর্যাপ্ত সময় ঘুমানোর পরও সকালে উঠতে প্রচণ্ড কষ্ট অনুভব করেন, বারবার অ্যালার্ম দিতে হয় অথবা ঘুম থেকে ওঠার পর দীর্ঘ সময় ধরে অস্বাভাবিক ঝিমুনি থাকে, তাহলে আপনার ঘুমের মান পর্যাপ্ত কি না তা ভেবে দেখা দরকার।
কারণ শুধু কত ঘণ্টা ঘুমালেন সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়। ঘুম কতটা গভীর, নিয়মিত ও বাধাহীন হচ্ছে—সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিদিন সকালে উঠতে এত কষ্ট হওয়ার কারণ কী
অনিয়মিত ঘুমের সময়, রাত জেগে থাকা, পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া কিংবা প্রতিদিনের ঘুমের সময়সূচি বারবার পরিবর্তিত হওয়ার কারণে সকালে ওঠা কঠিন হয়ে যেতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব ঘুমের নির্দিষ্ট সমস্যার সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে। যেমন, ঘুমের মধ্যে শ্বাস বারবার বন্ধ হয়ে যাওয়া বা অত্যধিক দিনের ঘুমভাবের মতো সমস্যা থাকলে সকালে জাগতে অস্বাভাবিক কষ্ট হতে পারে।
তাই প্রতিদিন সকালে বিছানা থেকে উঠতে অসম্ভবের মতো কষ্ট হলে বিষয়টিকে শুধু অলসতা বলে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়।
অ্যালার্মের ওপর নির্ভরতা কমাতে যা করতে পারেন
একটু আগে ঘুমাতে যান
সকালে অ্যালার্ম বন্ধ করে আরও ঘুমানোর প্রবল ইচ্ছা থাকলে রাতে আপনার ঘুমের সময় পর্যাপ্ত হচ্ছে কি না দেখুন। হঠাৎ করে অনেক আগে ঘুমাতে যাওয়ার পরিবর্তে প্রতিদিন অল্প অল্প করে শোয়ার সময় এগিয়ে আনতে পারেন।
ঘুমের আগে দীর্ঘ সময় মুঠোফোন বা অন্যান্য পর্দার দিকে তাকানো কমানো এবং আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করাও শরীরকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করতে পারে।
প্রতিদিন একই সময়ে উঠুন
শরীরের নিজস্ব একটি জৈব ঘড়ি রয়েছে, যা কখন ঘুম আসবে এবং কখন জেগে উঠব—তার ওপর প্রভাব ফেলে। প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস এই জৈব ঘড়িকে নিয়মিত রাখতে সাহায্য করে।
শুধু কর্মদিবসে নয়, ছুটির দিনেও খুব বেশি দেরি করে ঘুম থেকে না ওঠাই ভালো।

অ্যালার্ম হাতের নাগালের বাইরে রাখুন
মুঠোফোন বা অ্যালার্ম ঘড়ি যদি বালিশের পাশে থাকে, তাহলে ঘুমের মধ্যেই হাত বাড়িয়ে সেটি বন্ধ করে আবার ঘুমিয়ে পড়া সহজ।
অ্যালার্মটি বিছানা থেকে কিছুটা দূরে রাখলে সেটি বন্ধ করার জন্য আপনাকে উঠে দাঁড়াতে হবে। শরীরের এই সামান্য নড়াচড়াই ঘুমের জড়তা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করতে পারে।
সকালে আলো নিন
সকালের প্রাকৃতিক আলো শরীর ও মস্তিষ্ককে সংকেত দেয় যে এখন জেগে থাকার সময়। ঘুম থেকে ওঠার পর জানালা খুলে দিনের আলো নেওয়া বা কিছুক্ষণ বাইরে থাকা শরীরের জৈব ঘড়ি নিয়মিত রাখতে সহায়ক হতে পারে।
তাহলে কি অ্যালার্ম বন্ধ করে আবার ঘুমানো বন্ধ করতে হবে?
অবশ্যই সবার জন্য এমন কোনো কঠোর নিয়ম নেই।

মাঝেমধ্যে অ্যালার্ম বন্ধ করে কয়েক মিনিট ঘুমিয়ে নেওয়া সাধারণত উদ্বেগের বিষয় নয়। বিশেষ করে আপনি যদি পর্যাপ্ত ঘুমান, দিনের বেলায় স্বাভাবিকভাবে কর্মক্ষম থাকেন এবং সকালে জাগতে বড় ধরনের সমস্যা না হয়, তাহলে এই অভ্যাস নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তার প্রয়োজন নেই।
তবে প্রতিদিন একাধিকবার অ্যালার্ম বন্ধ করতে হয়, সকালে বিছানা ছাড়তে অত্যন্ত কষ্ট হয় কিংবা পর্যাপ্ত ঘুমের পরও সারাদিন প্রচণ্ড ঘুমঘুম লাগে—তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অ্যালার্ম বন্ধ করে অতিরিক্ত কয়েক মিনিট ঘুমানোর ওপর নির্ভর না করে রাতে পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুম নিশ্চিত করা। ভালো ঘুম হলে সকালে ঘুম থেকে ওঠার লড়াইটাও অনেকটাই সহজ হয়ে যায়।
ঘুম থেকে ওঠার জন্য অ্যালার্ম প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু সুস্থ থাকার জন্য প্রয়োজন তার চেয়েও বেশি—নিয়মিত, পর্যাপ্ত ও ভালো মানের ঘুম।
অ্যালার্ম বন্ধ করে আবার ঘুমানো — সকালে কয়েক মিনিট অতিরিক্ত ঘুম সবসময় ক্ষতিকর নয়, তবে প্রতিদিন এর প্রয়োজন হলে আপনার ঘুমের মান ও সময় নিয়ে ভাবার কারণ থাকতে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















