দীর্ঘদিন ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে থাকা আইসল্যান্ডে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের আলোচনা আবার শুরু করা হবে কি না, তা নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রশ্নটি সরল—ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সদস্যপদ নিয়ে আলোচনা পুনরায় শুরু করা উচিত কি না। গণভোটটি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়। তবে প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্তুন ফ্রস্তাদোত্তির ফলাফলকে সম্মান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
এই ভোটকে ঘিরে আইসল্যান্ডে মূল বিতর্ক তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে—জাতীয় সার্বভৌমত্ব, সামরিক নিরাপত্তা এবং দেশের সমুদ্রসীমার মৎস্যসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ।
২০০৯ সালের আর্থিক বিপর্যয় থেকে শুরু
২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর আইসল্যান্ড বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। দেশটির তিনটি বৃহৎ ব্যাংক একসঙ্গে ধসে পড়ে। মুদ্রার মূল্য কমে যায়, মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায় এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী গেয়ির হার্দে পদত্যাগ করেন।
এই পরিস্থিতিতে দেশটির সামাজিক গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়া এবং পরবর্তীতে ইউরো গ্রহণের পক্ষে অবস্থান নেয়। তাদের যুক্তি ছিল, ইউরোপীয় কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হলে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক ধাক্কা মোকাবিলা করা সহজ হবে।

২০০৯ সালে আইসল্যান্ড আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদের আবেদন করে। তবে দেশটি দ্রুত অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠায় সদস্যপদ নিয়ে আগ্রহ কমতে শুরু করে। ২০১৩ সালে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর সদস্যপদ নিয়ে আলোচনা কার্যত স্থগিত হয়ে যায়।
তখন প্রধান আশঙ্কা ছিল, ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দিলে আইসল্যান্ড নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারাতে পারে এবং দেশের সমৃদ্ধ মৎস্যসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
ভোটের আগে ছিল হাড্ডাহাড্ডি লড়াই
গণভোটের আগে প্রকাশিত জনমত জরিপে দুই পক্ষের ব্যবধান ছিল অত্যন্ত সামান্য। একটি জরিপে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরুর পক্ষে ৫১ দশমিক ৩ শতাংশ এবং বিপক্ষে ৪৮ দশমিক ৭ শতাংশ সমর্থন দেখা যায়।
অন্য একটি জরিপে আবার বিপরীত চিত্র উঠে আসে। সেখানে বিরোধীরা ৫১ দশমিক ৬ শতাংশ এবং সমর্থকেরা ৪৮ দশমিক ৪ শতাংশে ছিল।
অর্থাৎ দুই পক্ষের ব্যবধানই ছিল জরিপের ভুলের সীমার মধ্যে। ফলে ভোটের ফলাফল আগে থেকে নিশ্চিতভাবে অনুমান করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সমর্থকদের যুক্তি—একসঙ্গে থাকলেই নিরাপত্তা বেশি
প্রধানমন্ত্রী ফ্রস্তাদোত্তিরের জোট সরকারের দুটি গুরুত্বপূর্ণ দল ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের পক্ষে। তাদের যুক্তি শুধু অর্থনীতি নয়, নিরাপত্তাকেন্দ্রিকও।
আইসল্যান্ডের অবস্থান উত্তর আটলান্টিকের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকায়। গ্রিনল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের মাঝামাঝি এই দ্বীপরাষ্ট্রটি উত্তর আটলান্টিকের সামুদ্রিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ পথের কাছে অবস্থিত।
সমর্থকদের মতে, বর্তমান বিশ্বে ছোট একটি দেশের জন্য বৃহত্তর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জোটের অংশ হওয়া নিরাপত্তার দিক থেকে সুবিধাজনক। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আগ্রহের প্রেক্ষাপটে আইসল্যান্ডের কিছু রাজনীতিক মনে করছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ দেশটির জন্য অতিরিক্ত রাজনৈতিক সুরক্ষা তৈরি করতে পারে।

তবে প্রধানমন্ত্রী নিজেই ভোটটিকে সদস্যপদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করছেন না। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ‘হ্যাঁ’ ভোটের অর্থ হবে কেবল আলোচনা আবার শুরু করা। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চূড়ান্ত কোনো চুক্তি হলে সেটিও ভবিষ্যতে আরেকটি গণভোটে আইসল্যান্ডের জনগণের অনুমোদন পেতে হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে আইসল্যান্ড এত গুরুত্বপূর্ণ কেন
চার লাখেরও কম জনসংখ্যার আইসল্যান্ড ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দিলে জনসংখ্যার বিচারে সবচেয়ে ছোট সদস্যরাষ্ট্র হবে।
তবে জনসংখ্যার তুলনায় দেশটির ভৌগোলিক ও সামরিক গুরুত্ব অনেক বেশি। উত্তর আটলান্টিকের এমন একটি এলাকায় আইসল্যান্ড অবস্থিত, যেটি উত্তর ইউরোপ ও আটলান্টিকের সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
রাশিয়ার উত্তর আটলান্টিকমুখী সাবমেরিন ও নৌযান চলাচলের ক্ষেত্রেও এই অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ বলে সামরিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য আইসল্যান্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়, উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক অঞ্চলে কৌশলগত উপস্থিতির প্রশ্নও।
ন্যাটোর সঙ্গে আইসল্যান্ডের সম্পর্ক আগে থেকেই গভীর
আইসল্যান্ড ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য না হলেও পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর বাইরে নয়। দেশটি ন্যাটোর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের অন্যতম।
দেশটিতে কেফ্লাভিক সামরিক ঘাঁটি রয়েছে এবং ন্যাটোর রাডার ও নজরদারি ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশও আইসল্যান্ডে স্থাপিত। দেশটির নিজস্ব স্থায়ী সেনাবাহিনী নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১৯৫১ সালের প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে দেশটির নিরাপত্তা কাঠামো দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত।
প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ‘নর্দার্ন ভাইকিং’ নামে সামরিক মহড়াও আইসল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হয়। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দিলে আইসল্যান্ড প্রথমবারের মতো পশ্চিমা সামরিক জোটে ঢুকবে—বিষয়টি এমন নয়। বরং দেশটি ইতিমধ্যে সেই নিরাপত্তা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এর পাশাপাশি আইসল্যান্ড ইউরোপীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের সদস্য এবং শেনজেনভুক্ত হওয়ায় ইউরোপের সঙ্গে দেশটির অর্থনৈতিক ও চলাচলভিত্তিক সম্পর্কও বেশ গভীর।
বিরোধীদের আশঙ্কা—ইউরোপীয় ইউনিয়ন আরও সামরিকমুখী হচ্ছে
ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের বিরোধীরা বলছেন, ২০০৯ সালের ইউরোপীয় ইউনিয়ন আর ২০২৬ সালের ইউরোপীয় ইউনিয়ন এক নয়।
তাদের অন্যতম অভিযোগ, ইউক্রেন সংঘাতকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ক্রমেই সামরিক ও সংঘাতমুখী হয়ে উঠছে। রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং রুশ জ্বালানি থেকে দূরে সরে যাওয়ার নীতির কারণে ইউরোপের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিরোধীদের দাবি।
আইসল্যান্ডের সাবেক এক রাষ্ট্রদূত যুক্তি দিয়েছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন ইউরোপের একটি সামরিক সংঘাতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে আইসল্যান্ডের মতো একটি ছোট ও সামরিক বাহিনীহীন দেশের জন্য এমন জোটে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়া ভবিষ্যতে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিরোধী আন্দোলনগুলোর আশঙ্কা, ইউরোপীয় সামরিক শক্তি আরও বিস্তৃত হলে আইসল্যান্ডও সেই কাঠামোর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত সিদ্ধান্তের অংশ হয়ে পড়বে।
সব বিতর্কের কেন্দ্রে মাছ
তবে আইসল্যান্ডের সাধারণ মানুষের কাছে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের বিতর্কের সবচেয়ে বাস্তব বিষয় সম্ভবত মাছ।
মৎস্য খাত দেশটির অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৪ শতাংশ এবং রপ্তানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই খাতের সঙ্গে যুক্ত।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিন্ন মৎস্যনীতি গ্রহণ করতে হলে আইসল্যান্ডকে তার সমুদ্রসীমার মৎস্যসম্পদের ওপর বর্তমান নিয়ন্ত্রণের কিছু অংশ ছাড়তে হতে পারে—এটাই বিরোধীদের সবচেয়ে বড় আশঙ্কা।
তাদের উদাহরণ হিসেবে আয়ারল্যান্ডের কথা সামনে আনা হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হওয়ার পর আয়ারল্যান্ডের জলসীমায় অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের মাছ ধরার অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ রয়েছে।

আইসল্যান্ডের বিরোধীরা মনে করেন, একই ধরনের ব্যবস্থা আইসল্যান্ডের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ হলে দেশের জেলেরা নিজেদের সমুদ্রসীমায় মাছ ধরার সুযোগ হারাতে পারেন।
সদস্যপদের শর্ত নিয়ে বড় প্রশ্ন
ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের পক্ষের রাজনীতিকেরা বলছেন, আইসল্যান্ড বিশেষ ছাড় বা নিজস্ব ব্যবস্থার জন্য আলোচনা করতে পারবে।
কিন্তু বিরোধীদের প্রশ্ন—ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ম যদি সবার জন্য অভিন্ন হয়, তাহলে আইসল্যান্ড কতটা বিশেষ সুবিধা আদায় করতে পারবে?
তাদের যুক্তি, সদস্যপদ এমন কোনো ব্যবস্থা নয় যেখানে একটি দেশ নিজের পছন্দের নিয়মগুলো গ্রহণ করবে আর অপছন্দের নিয়ম প্রত্যাখ্যান করবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের চুক্তি ও নীতিগুলো সদস্য দেশগুলোর জন্য নির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি করে।
এই কারণেই বিরোধীদের কাছে গণভোটটি কেবল ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের প্রশ্ন নয়। এটি দেশের সমুদ্রসম্পদ, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্নও।
আসল সিদ্ধান্ত এখনো বাকি
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলেও আইসল্যান্ড সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হয়ে যাবে না। বরং সদস্যপদ নিয়ে আলোচনা আবার শুরু হবে। এরপর আলোচনার ফলাফল, শর্ত এবং সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে দেশটির জনগণকে আবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হতে পারে।
অন্যদিকে ‘না’ জয়ী হলে সদস্যপদ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করার পথ আপাতত বন্ধ হয়ে যাবে।
তাই এই ভোটের গুরুত্ব শুধু একটি রাজনৈতিক জোটে যোগ দেওয়া বা না-দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আইসল্যান্ডের সামনে মূল প্রশ্ন হলো—দেশটি কি বৃহত্তর ইউরোপীয় কাঠামোর মধ্যে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা খুঁজবে, নাকি নিজের সার্বভৌমত্ব ও সমুদ্রসম্পদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেবে?
ছোট এই দ্বীপরাষ্ট্রের জন্য উত্তরটি শুধু ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কই নির্ধারণ করবে না; আগামী দিনে আইসল্যান্ড নিজেকে বিশ্বরাজনীতিতে কীভাবে দেখতে চায়, সেটিও অনেকটা নির্ধারণ করবে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















