ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর যুক্তরাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজেদের অবস্থান পুনর্বিবেচনার হুমকি দিয়ে লন্ডনের ওপর সামরিক ব্যয় বাড়ানোর চাপ সৃষ্টি করছে যুক্তরাষ্ট্র। এমনটাই দাবি করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বড় অংশ মিত্রদের কাঁধে তুলে দিতে চাইছে ওয়াশিংটন।
যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিরক্ষা ব্যয়, ইরান এবং ভারত মহাসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ চাগোস দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে ফকল্যান্ড ইস্যুকে যুক্তরাজ্যের ওপর চাপ প্রয়োগের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রায় দুই শতকের বিরোধ
ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনার বিরোধ প্রায় দুই শতকের। ১৯৮২ সালে আর্জেন্টিনার সামরিক সরকার দ্বীপপুঞ্জে হামলা চালিয়ে দখল নেওয়ার চেষ্টা করলে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার নৌবাহিনীর একটি বিশেষ বাহিনী পাঠান। ৭৪ দিনের যুদ্ধের পর ব্রিটেন আবার দ্বীপগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয়।
১৯৮২ সালের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটেনকে সমর্থন করেছিল। বর্তমানে ওয়াশিংটন বাস্তবে দ্বীপগুলো পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্রিটিশ অবস্থানকে স্বীকৃতি দিলেও যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার সার্বভৌমত্বের দাবির বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পক্ষ নেয় না।
সামরিক ব্যয় বাড়ানোর চাপ
টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এখন ব্রিটেনের সার্বভৌমত্বের দাবির প্রতি তাদের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করার সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। এর মাধ্যমে লন্ডনকে প্রতিরক্ষা খাতে আরও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে উৎসাহিত করাই ওয়াশিংটনের লক্ষ্য বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিষয়টি উত্তর আটলান্টিক জোটের সদস্যদের প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান চাপের সঙ্গেও সম্পর্কিত। জোটের অধিকাংশ সদস্য ২০৩৫ সালের মধ্যে জাতীয় আয়ের ৫ শতাংশ নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করার লক্ষ্যে সম্মত হয়েছে। তবে ব্রিটেন ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয় জাতীয় আয়ের ৩ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
সমস্যা হলো, জুনে ঘোষণা করা ব্রিটিশ নতুন প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৯-৩০ অর্থবছর পর্যন্ত মূল প্রতিরক্ষা ব্যয় জাতীয় আয়ের মাত্র ২ দশমিক ৭ শতাংশে থাকার কথা। একই সময়ে আর্থিক চাপের কারণে ব্রিটিশ সরকার প্রতিরক্ষা বাজেটের জন্য অতিরিক্ত ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন পাউন্ড জোগাড়ের চ্যালেঞ্জে রয়েছে।
একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা টেলিগ্রাফকে বলেছেন, ব্রিটেনের বর্তমান প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ পরিকল্পনাকে সঠিক পথে এগোনোর পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হলেও তা যথেষ্ট নয়। তার ভাষায়, বর্তমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মাত্রা বিবেচনায় যুক্তরাজ্যের মতো মিত্রদের আরও মৌলিক ও বড় ধরনের ভূমিকা নিতে হবে।
ফকল্যান্ড কেন আলোচনায়
ফকল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিবর্তনের সম্ভাবনার কথা প্রথম সামনে আসে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে। সে সময় একটি অভ্যন্তরীণ মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের ই-মেইলের বরাত দিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় যে, ইউরোপীয় দেশগুলোর নিয়ন্ত্রিত কিছু বিতর্কিত ভূখণ্ড নিয়ে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক অবস্থান পুনর্বিবেচনার কথা ভাবা হচ্ছে।
যেসব উত্তর আটলান্টিক জোটের সদস্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উদ্যোগে প্রত্যাশিত মাত্রায় সহযোগিতা করছে না, তাদের ওপর চাপ তৈরির উপায় হিসেবেই এমন পদক্ষেপ বিবেচনা করা হতে পারে বলে তখন জানানো হয়েছিল।
এই সম্ভাবনায় আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মাইলেই আশাবাদ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। ফকল্যান্ড নিয়ে আর্জেন্টিনার দীর্ঘদিনের সার্বভৌমত্বের দাবির প্রেক্ষাপটে তিনি বলেছিলেন, দেশটি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি অগ্রগতি করছে।
চাগোস দ্বীপপুঞ্জ নিয়েও টানাপোড়েন
ফকল্যান্ডের পাশাপাশি চাগোস দ্বীপপুঞ্জ নিয়েও লন্ডন ও ওয়াশিংটনের মধ্যে জটিলতা তৈরি হয়েছে। ভারত মহাসাগরের এই দ্বীপপুঞ্জে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।
২০২৫ সালে ব্রিটেন চাগোস দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব মরিশাসের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে সম্মত হয়েছিল। তবে একই সঙ্গে সামরিক ঘাঁটিটি ৯৯ বছরের ইজারায় রাখার পরিকল্পনা করা হয়। এ উদ্যোগকে ট্রাম্প প্রকাশ্যে ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে আখ্যা দেওয়ার পর ব্রিটিশ সরকার এপ্রিলে পরিকল্পনাটি স্থগিত করে।
ইরান নিয়েও দুই মিত্রের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। ইরানে হামলার জন্য ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিতে লন্ডন প্রথমে অস্বীকৃতি জানায়। আইনি জটিলতাকে এর কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছিল। পরে ইরানের পাল্টা হামলায় ব্রিটিশ সামরিক স্থাপনা ও সম্পদ আক্রান্ত হওয়ার পর যুক্তরাজ্য তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে।
সব মিলিয়ে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের প্রশ্নটি এখন শুধু যুক্তরাজ্য ও আর্জেন্টিনার পুরোনো ভূখণ্ডগত বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এটি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যকার বৃহত্তর প্রতিরক্ষা সম্পর্ক, ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যয় এবং দুই মিত্রের কৌশলগত মতপার্থক্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠছে।
মেটা বর্ণনা: ফকল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাজ্যের অবস্থান পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দিয়ে সামরিক ব্যয় বাড়াতে লন্ডনের ওপর চাপ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র—এমন দাবি ঘিরে বাড়ছে উত্তেজনা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















