আফগানিস্তানের বর্তমান বাস্তবতা শুধু অর্থনৈতিক সংকটের গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, নারীর অধিকার, খাদ্যনিরাপত্তা, অভিবাসন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সাধারণ মানুষের টিকে থাকার সংগ্রাম। ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর দেশটির অর্থনীতি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও সেই পুনরুদ্ধারের সুফল সমাজের সব শ্রেণির মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি।
অর্থনীতি ঘুরলেও মানুষের জীবন সহজ হয়নি
২০২১ সালে প্রজাতন্ত্র সরকারের পতনের পর আফগান অর্থনীতিতে ভয়াবহ ধস নামে। পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কিছুটা পুনরুদ্ধার হলেও মাথাপিছু আয় কমে যাওয়ার প্রবণতা, কর্মসংস্থানের সংকট এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বহু পরিবার এখনো গভীর চাপের মধ্যে রয়েছে।
একসময় স্বচ্ছলভাবে চলা পরিবারগুলোও এখন খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা ও বাসস্থানের মতো মৌলিক প্রয়োজনের মধ্যে কোনটি আগে পূরণ করবে, সেই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে। অনেক পরিবার আয় বাড়ানোর জন্য ঘরে বসে নারী ও শিশুদের দিয়েও সামান্য পারিশ্রমিকের কাজ করাচ্ছে।
অর্থাৎ সামগ্রিক অর্থনীতির কিছু সূচকে উন্নতির আভাস থাকলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় তার প্রতিফলন সীমিত।
অসুস্থ হওয়াও হয়ে উঠেছে অর্থনৈতিক বিপর্যয়
আফগানিস্তানে চিকিৎসার ব্যয় বহন করা বহু পরিবারের জন্য বড় সংকট। স্বাস্থ্যসেবার খরচের একটি বড় অংশ রোগী ও পরিবারের নিজেদের বহন করতে হয়। ফলে গুরুতর অসুস্থতার সময় অনেক পরিবারকে ধারদেনা করা, সম্পদ বিক্রি করা কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বাদ দেওয়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় পরিস্থিতি আরও কঠিন। চিকিৎসাকেন্দ্রের দূরত্ব, যাতায়াতের খরচ, নারী চিকিৎসাকর্মীর ঘাটতি এবং কিছু স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে নারীদের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ আরও সংকুচিত হয়েছে।
অর্থের অভাবে আধুনিক চিকিৎসার বদলে কেউ কেউ স্থানীয় চিকিৎসক, কবিরাজি পদ্ধতি কিংবা ধর্মীয় স্থানের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু গুরুতর রোগের ক্ষেত্রে এসব বিকল্প অনেক সময় প্রয়োজনীয় চিকিৎসার বিকল্প হয়ে উঠতে পারে না।
মেয়েদের শিক্ষায় দীর্ঘ অন্ধকার
২০২১ সালে ক্ষমতা নেওয়ার পর ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েদের বিদ্যালয়ে পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে লাখ লাখ কিশোরী আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
তবে শিক্ষা পুরোপুরি থেমে যায়নি। কিছু এলাকায় বিকল্প ব্যবস্থায় মেয়েদের শেখানোর চেষ্টা চলছে। এর মধ্যে বেতারভিত্তিক শিক্ষা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। শ্রেণিকক্ষের দরজা বন্ধ হলেও শব্দতরঙ্গের মাধ্যমে পাঠ পৌঁছে দেওয়ার এই উদ্যোগ অনেক মেয়ের জন্য শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত থাকার একটি পথ তৈরি করেছে।
তবু এটি বিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষার পূর্ণ বিকল্প নয়। দীর্ঘদিন শিক্ষার বাইরে থাকলে একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান, দক্ষতা অর্জন এবং সামাজিক অংশগ্রহণের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।
নারীদের জীবনে বেড়েছে সীমাবদ্ধতা
নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ওপর বিধিনিষেধ তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বহু নারী চাকরি হারিয়েছেন বা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ হারিয়েছেন। এর প্রভাব শুধু নারীদের ওপর নয়, তাদের পুরো পরিবারের আয় ও জীবনযাত্রার ওপর পড়েছে।
অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে সামাজিক বিধিনিষেধ যুক্ত হওয়ায় অনেক নারীর জন্য নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ আরও সংকুচিত হয়েছে। বিয়ে, শিক্ষা ও কাজ—জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে তাদের স্বাধীনতা কমে গেছে।
খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও চাপ
আফগানিস্তানের খাদ্যব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে নানা সংকটে রয়েছে। দেশের নিজস্ব কৃষি উৎপাদন প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত ও অঞ্চলভেদে অসম। বাণিজ্যপথের পরিবর্তন, খরা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
কোনো কোনো মৌসুমে ভালো বৃষ্টিপাত ও গমের ভালো ফলনের সম্ভাবনা তৈরি হলেও সেটি দীর্ঘমেয়াদি সংকটের চিত্র বদলে দিতে পারে না। বারবার খরা, পানির সংকট এবং পরিবর্তিত আবহাওয়া কৃষকদের জীবিকা ও দেশের খাদ্যনিরাপত্তাকে অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখছে।
ঘরছাড়া মানুষের নতুন অনিশ্চয়তা
ইরান ও পাকিস্তান থেকে বিপুলসংখ্যক আফগানকে ফেরত পাঠানোর ফলে দেশটির ওপর নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। কয়েক বছরে লাখ লাখ মানুষ দেশে ফিরে এসেছে। তাদের অনেকেরই আফগানিস্তানে স্থায়ী বাসস্থান, কাজ কিংবা পর্যাপ্ত আয়ের ব্যবস্থা নেই।
পাকিস্তান থেকে ফেরত আসা পরিবারগুলোর জন্য পরিস্থিতি বিশেষভাবে কঠিন। যারা বছরের পর বছর পাকিস্তানে বসবাস করেছে, তাদের অনেকেই ফিরে এসে নতুন করে ঘর, কাজ ও জীবিকা গড়ে তোলার সমস্যায় পড়েছে।
শিক্ষার্থীরাও এই সংকট থেকে বাদ যায়নি। পাকিস্তানে পড়াশোনা করা অনেক আফগান শিক্ষার্থী বহিষ্কার, আটক হওয়ার আশঙ্কা এবং শিক্ষার অনুমতি না পাওয়ার মতো সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে।
ইউরোপের পথে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা
দেশের ভেতরে ভবিষ্যতের সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেক তরুণ আফগান বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পশ্চিম বলকান অঞ্চল দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ পথ তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিবাসনপথে পরিণত হয়েছে।
বিশেষ করে ১৪ থেকে ২৩ বছর বয়সী আফগান তরুণদের উপস্থিতি এই অভিবাসনপ্রবাহে উল্লেখযোগ্য। সীমান্ত, পাচারকারী চক্র, আটক ও প্রতারণার ঝুঁকি সত্ত্বেও অনেকে উন্নত জীবন ও নিরাপত্তার আশায় এই বিপজ্জনক পথ বেছে নিচ্ছেন।
জলবায়ু পরিবর্তন আরও বাড়াচ্ছে সংকট
আফগানিস্তান জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য খুব কম দায়ী দেশগুলোর একটি হলেও এর প্রভাবগুলোর মধ্যে রয়েছে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি। খরা, পানির সংকট, ধুলিঝড় ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত মানুষের জীবন ও কৃষিকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।
রাজধানী কাবুলের শীতকালীন বায়ুদূষণও গুরুতর সমস্যা। কয়লা, কাঠ ও কখনো প্লাস্টিক পুড়িয়ে ঘর গরম করা এবং পুরোনো যানবাহনের ধোঁয়া বায়ুর মান আরও খারাপ করছে। দেশের কিছু এলাকায় ধুলিঝড় পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে।
বদলে যাচ্ছে গ্রামীণ সামাজিক সংহতি
আফগান গ্রামগুলোতে বহু প্রজন্ম ধরে প্রচলিত ছিল পারস্পরিক সহযোগিতার একটি ঐতিহ্য। প্রতিবেশীর জমিতে ফসল কাটতে সাহায্য করা, বাড়ি নির্মাণ কিংবা সেচখাল পরিষ্কারের মতো কাজে মানুষ বিনা পারিশ্রমিকে একে অন্যের পাশে দাঁড়াতেন।
কিন্তু অর্থনৈতিক চাপ, অভিবাসন, দারিদ্র্য এবং সামাজিক পরিবর্তনের কারণে এই সম্মিলিত শ্রমের ঐতিহ্য অনেক এলাকায় দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে অর্থনৈতিক সংকট শুধু মানুষের আয় কমাচ্ছে না, সামাজিক সম্পর্ক ও পারস্পরিক সহযোগিতার কাঠামোকেও প্রভাবিত করছে।
কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও টিকে থাকার চেষ্টা
আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—মানুষ সংকটের মধ্যেও বেঁচে থাকার পথ খুঁজছে। কেউ ঘরে বসে কাজ করছেন, কেউ বিকল্প শিক্ষার ব্যবস্থা করছেন, কেউ চিকিৎসার জন্য ধার করছেন, আবার কেউ জীবিকার আশায় সীমান্ত পেরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছেন।
দেশটির অর্থনীতি কিছুটা স্থিতিশীলতার দিকে এগোলেও সাধারণ মানুষের জীবনে সেই স্থিতিশীলতা এখনো পুরোপুরি পৌঁছায়নি। দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের অভাব, স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়, মেয়েদের শিক্ষাবঞ্চনা, নারীদের কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও জলবায়ু সংকট একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি জটিল মানবিক বাস্তবতা তৈরি করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















