চীনের নতুন শিক্ষাবর্ষে কিশোর-কিশোরীদের বাধ্যতামূলক পাঠ্যতালিকায় জায়গা পেয়েছে ১৯ শতকের বিখ্যাত ইংরেজি উপন্যাস ‘জেন আয়ার’। শার্লট ব্রন্টির লেখা এই উপন্যাস একদিকে যেমন একজন নারীর আত্মমর্যাদা, স্বাধীনতা ও কঠিন জীবনের গল্প, অন্যদিকে তেমনি প্রেম, সম্পর্ক ও আত্মপরিচয়েরও জটিল আখ্যান।
চীনের মতো দেশে, যেখানে স্কুলের পাঠ্যবইয়ে রাষ্ট্রের আদর্শ ও মূল্যবোধের বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বাছাই করা হয়, সেখানে ‘জেন আয়ার’-এর অন্তর্ভুক্তি অনেকের কাছেই বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন দেশটিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন উপন্যাস ও ছোট নাটকে প্রেম ও সম্পর্কের নানা অতিরঞ্জিত উপস্থাপনা নিয়ে কর্তৃপক্ষ উদ্বেগ প্রকাশ করছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র ‘বেইজিং ডেইলি’ বলেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে চেহারা, অর্থ ও সামাজিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া ‘অগভীর ধারণার’ বিপরীতে ‘জেন আয়ার’ তরুণদের সত্যিকারের ভালোবাসার মূল্য বুঝতে সাহায্য করতে পারে।
প্রেমের ধারণা বদলাতে চায় চীন?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের অনলাইন বিনোদন জগতে এমন অনেক গল্প জনপ্রিয় হয়েছে, যেখানে বিপুল সম্পদের মালিক পুরুষ, ধনী পরিবার, প্রতারিত প্রেমিক-প্রেমিকা, প্রতিশোধপরায়ণ নারী কিংবা অস্বাভাবিক প্রেমের সম্পর্ককে ঘিরে নাটকীয় কাহিনি তৈরি হয়।

এসব গল্পে অর্থ ও সামাজিক মর্যাদা অনেক সময় ভালোবাসার প্রধান মাপকাঠি হিসেবে উঠে আসে। অনলাইন ছোট নাটক ও উপন্যাসের এই প্রবণতা চীনা কর্তৃপক্ষেরও নজরে এসেছে।
জুন মাসে দেশটির সম্প্রচার নিয়ন্ত্রক সংস্থা এমন সব ‘ক্ষতিকর ও নিম্নমানের’ বিষয়বস্তুর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে, যেগুলো সম্পর্ক ও বিয়ে সম্পর্কে ‘বিকৃত’ ধারণা ছড়াতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে ‘জেন আয়ার’কে স্কুলের পাঠ্যতালিকায় রাখা শুধু সাহিত্য পড়ানোর বিষয় নয়—এর মাধ্যমে কিশোরদের প্রেম, সম্পর্ক, আত্মমর্যাদা ও জীবনের মূল্যবোধ সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট ধারণা দেওয়ার চেষ্টা রয়েছে বলেও মনে করছেন অনেকে।
‘বেইজিং ডেইলি’র মতে, চীনের ১৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য জেন আয়ারের গল্প গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ এই বয়সেই অনেক শিশু প্রথমবারের মতো প্রেম বা আকর্ষণের অনুভূতির মুখোমুখি হয়। তাই এই সময় তাদের চরিত্র ও সম্পর্ক সম্পর্কে সুস্থ ধারণা তৈরি করা জরুরি।
অনাথ মেয়ের আত্মমর্যাদা ও ভালোবাসার গল্প
‘জেন আয়ার’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৪৭ সালে। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র জেন আয়ার একজন অনাথ মেয়ে। জীবনের শুরু থেকেই তাকে নানা প্রতিকূলতা ও অবহেলার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু কঠিন পরিস্থিতি তাকে ভেঙে দেয় না। বরং নিজের আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতার জন্য সে লড়াই করে।
পরবর্তীতে জেন তার চেয়ে অনেক বেশি ধনী এক পুরুষ, এডওয়ার্ড রচেস্টারের বাড়িতে গভর্নেস হিসেবে কাজ শুরু করে। সেখানেই তাদের মধ্যে গভীর প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। কিন্তু সেই প্রেমও সহজ নয়। শ্রেণিগত পার্থক্য, গোপন সত্য, সামাজিক নিয়ম ও ব্যক্তিগত সংকট তাদের সম্পর্ককে বারবার কঠিন করে তোলে।

উপন্যাসের একটি বিখ্যাত অংশে জেন প্রশ্ন করে—সে দরিদ্র, সাধারণ দেখতে কিংবা ছোটখাটো বলেই কি তার আত্মা ও হৃদয় নেই? এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে জেন নিজের মানবিক মর্যাদা ও সমান অধিকারকে সামনে আনে।
চীনে উপন্যাসটি প্রথম জনপ্রিয়তা পায় ১৯২৫ সালের দিকে। এরপর বইটি বহুবার অনূদিত, প্রকাশিত ও মঞ্চ ও চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হয়েছে। এমনকি ১৯৭৯ সালে একটি ব্রিটিশ চলচ্চিত্রও চীনের প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয়—সাংস্কৃতিক বিপ্লবের অস্থির সময় পার হওয়ার পর।
চীনের শ্রমজীবী মানুষের কাছেও দীর্ঘদিন ধরে জেন আয়ারকে দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক সাহসী নারী চরিত্র হিসেবে দেখা হয়েছে। দেশটির কমিউনিস্ট পার্টির কাছেও বইটি দীর্ঘদিন ধরে পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য ছিল না।
তাহলে এখন বিতর্ক কেন?
‘জেন আয়ার’ পাঠ্যবইয়ে যুক্ত হওয়ার সময়টিই অবশ্য নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
কারণ চীনে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারীবাদ, নারী অধিকার ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে স্বাধীন আলোচনা ও সক্রিয়তা বিভিন্নভাবে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছে। সেই পরিস্থিতিতে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীনচেতা নারী চরিত্রকে রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থায় জায়গা দেওয়াকে কেউ কেউ স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহলের বিষয় হিসেবে দেখছেন।
আবার অনেক অভিভাবকের প্রশ্ন, আজকের চীনা কিশোর-কিশোরীরা কি ১৯ শতকের এই জটিল প্রেমের গল্পকে সত্যিই বুঝতে পারবে?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক মা লিখেছেন, তার ছেলে জানতে চেয়েছে—‘জেন আয়ার’ পড়িয়ে কি তার শ্রেণির মেয়েদের শেখানো হচ্ছে যে তাদের জীবন ও চিন্তা-ভাবনাকে প্রেমের কাছে সমর্পণ করা উচিত?
ওই শিক্ষার্থীর কাছে জেনের সিদ্ধান্তও সহজে বোধগম্য হয়নি। বিশেষ করে, কেন জেন এমন একজন পুরুষকে বিয়ে করতে রাজি হন, যিনি পরে দৃষ্টিশক্তি হারান—তা তার কাছে ভালো সিদ্ধান্ত মনে হয়নি।
এই প্রশ্নগুলো দেখিয়ে দেয়, আধুনিক চীনা কিশোরদের কাছে ‘জেন আয়ার’-এর প্রেমের ধারণা আগের প্রজন্মের তুলনায় একেবারেই ভিন্নভাবে ধরা দিতে পারে।
শিক্ষাব্যবস্থায় প্রেম ও চরিত্রের জায়গা কোথায়?
বেইজিংয়ের সাম্প্রতিক এক চীনা সাহিত্য স্নাতক কিন শি ওয়েন মনে করেন, স্কুলে ‘জেন আয়ার’-এর মতো সাহিত্যকর্ম পড়ানো প্রয়োজন।
তার মতে, চীনের মৌলিক শিক্ষাব্যবস্থায় পড়াশোনা, পরীক্ষার ফল ও একাডেমিক সাফল্যের ওপর প্রচণ্ড গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু ভালোবাসা, সম্পর্ক, আবেগ ও চরিত্র গঠনের মতো বিষয় নিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য খুব বেশি জায়গা থাকে না।
সেই দিক থেকে ‘জেন আয়ার’ কিশোরদের জন্য একটি ভিন্ন ধরনের শিক্ষা দিতে পারে—যেখানে শুধু পরীক্ষায় ভালো করার বিষয় নয়, বরং একজন মানুষ কীভাবে নিজের আত্মমর্যাদা ধরে রাখে, কঠিন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেয় এবং সম্পর্কের মধ্যে নিজের পরিচয়কে রক্ষা করে, সেই প্রশ্নও সামনে আসে।
‘জেন আয়ার’-এর মধ্যেও কি সমস্যা আছে?
তবে উপন্যাসটিকে কিশোরদের জন্য ‘সুস্থ প্রেমের আদর্শ’ হিসেবে উপস্থাপন করা নিয়েও আপত্তি রয়েছে।
বেইজিংয়ের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী ইয়ান হাইরং মনে করেন, উপন্যাসটির কিছু বিষয় আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে গভীরভাবে প্রশ্ন করার মতো।
বিশেষ করে উপন্যাসে ‘অ্যাটিকের পাগলী নারী’ হিসেবে পরিচিত বারথা ম্যাসন চরিত্রটির উপস্থাপন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনা রয়েছে। একই সঙ্গে উপন্যাসের ভেতরে ঔপনিবেশিকতার ছাপও রয়েছে বলে মনে করেন সমালোচকেরা।
ইয়ান হাইরংয়ের আশঙ্কা, শিক্ষার্থীরা যদি এসব বিষয় নিয়ে সমালোচনামূলকভাবে চিন্তা না করে শুধু বইটিকে ‘গভীর প্রেমের গল্প’ হিসেবে গ্রহণ করে, তাহলে তারা উপন্যাসের সমস্যাজনক দিকগুলো বুঝতে নাও পারে।
তার মতে, মাধ্যমিক পর্যায়ে বইটি পড়ানো নিয়ে তাই কিছুটা সতর্কতা প্রয়োজন। বিশেষ করে এটিকে যদি শুধু পাঠ্যবই কিংবা গভীর রোমান্টিক ভালোবাসার আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে শিক্ষার্থীরা এর জটিল দিকগুলো থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
বদলে যাচ্ছে চীনের পাঠ্যবই
‘জেন আয়ার’-এর অন্তর্ভুক্তি চীনের পাঠ্যবইয়ে সাম্প্রতিক বড় পরিবর্তনের একটি অংশ।
এই মাসে চালু হওয়া নতুন পাঠ্যবইগুলো ব্যাপকভাবে সংশোধন করা হয়েছে। এর লক্ষ্য শিশুদের চিন্তা, মূল্যবোধ ও নৈতিক ধারণাকে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির প্রচারিত মূল্যবোধের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে সামঞ্জস্য করা।
গত কয়েক বছরে নয় বছরের বাধ্যতামূলক শিক্ষাব্যবস্থায় চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাস, চীনা নৈতিকতা এবং দেশের আইনব্যবস্থার বিষয়গুলো আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২০২১ সালে চীনা কর্মকর্তারা নতুন ধরনের পাঠ্যবইও প্রকাশ করেন, যেখানে নতুন যুগে চীনা বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সমাজতন্ত্র নিয়ে প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের চিন্তাধারা ব্যাখ্যা করা হয়।
এবারের পরিবর্তনের মধ্যে শুধু ‘জেন আয়ার’ যোগ হওয়াই নয়, সৃজনশীল চিন্তাভাবনা নিয়ে একটি লেখা বাদ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে শিশুদের ‘সর্বাঙ্গীণ সমাজতান্ত্রিক নির্মাতা’ হিসেবে গড়ে তোলার শিক্ষা এবং চীনের ক্রীড়া ও মহাকাশ সাফল্যের গল্প যুক্ত করা হয়েছে।
প্রেমের বই, নাকি মূল্যবোধের পাঠ?
চীনের স্কুলে ‘জেন আয়ার’-এর জায়গা পাওয়া তাই কেবল একটি সাহিত্যিক সিদ্ধান্ত নয়। এর মধ্য দিয়ে একই সঙ্গে চীনের তরুণ প্রজন্মকে প্রেম, সম্পর্ক, আত্মমর্যাদা ও ব্যক্তিগত মূল্যবোধ সম্পর্কে কীভাবে ভাবতে শেখানো হবে—সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
একদিকে রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র মনে করছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অর্থ, সৌন্দর্য ও বাহ্যিক চাকচিক্যনির্ভর সম্পর্কের বিপরীতে ‘জেন আয়ার’ তরুণদের সত্যিকারের ভালোবাসার ধারণা দিতে পারে। অন্যদিকে সমালোচকেরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ১৮৪৭ সালের একটি উপন্যাসকে আধুনিক কিশোরদের জন্য আদর্শ প্রেমের গল্প হিসেবে পড়ানোর আগে এর শ্রেণি, লিঙ্গ, ঔপনিবেশিকতা ও সম্পর্কের জটিলতাগুলোও বোঝানো দরকার।
ফলে চীনের স্কুলে ‘জেন আয়ার’ এখন শুধু একটি পুরোনো ইংরেজি উপন্যাস নয়। এটি হয়ে উঠেছে নতুন প্রজন্মকে প্রেম, স্বাধীনতা ও মূল্যবোধ শেখানোর একটি বড় সাংস্কৃতিক পরীক্ষাও।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















