০৩:৪৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইতালিতে সন্তান পালনের অভিজ্ঞতা, নিউইয়র্কের মায়ের চোখে একেবারেই ভিন্ন ২০২৭ সালের বসন্ত-গ্রীষ্মে অফিস পোশাকে আসছে নতুন ধারা চাঁদের বুকে এক শতাব্দীর বিরল গর্ত, নাসার স্ক্যানে মিলল ২০২৪ সালের মহাজাগতিক আঘাত ‘ছাত্রঋণের চেয়েও বেশি ভাড়া’—যুক্তরাজ্যে শিক্ষার্থীদের আবাসন ব্যয়ের চাপ বাড়ছে খরা কাটাতে টানা সাত মাস বৃষ্টি দরকার ইংল্যান্ডে, বসন্তেও থাকতে পারে পানির সংকট কফি খেয়েও কারও ঘুম আসে, আবার কারও রাতভর ঘুম হারাম—কেন এমন হয়? চীনের স্কুলে ‘জেন আয়ার’, কিশোরদের প্রেম শেখাতেই কি ক্লাসিক এই উপন্যাস? অভিশংসন প্রক্রিয়ায় সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ কতটা সাংবিধানিক? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপত্তা নিয়ে স্কটল্যান্ডে বড় বৈঠক, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করলেন রাজা চার্লস ক্যানসার রোগীদের জীবনে বাড়তি সময়ের আশা, ইংল্যান্ডে NHS-এ মিলবে নতুন ওষুধ

কফি খেয়েও কারও ঘুম আসে, আবার কারও রাতভর ঘুম হারাম—কেন এমন হয়?

কেউ সন্ধ্যার পর এক কাপ কফি খেলেই অস্থির হয়ে পড়েন, রাতে বিছানায় শুয়ে ঘুমের অপেক্ষায় ছটফট করেন। আবার এমন মানুষও আছেন, যিনি রাতে কফি, কোমল পানীয় কিংবা ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় খেলেও নির্বিঘ্নে ঘুমিয়ে পড়েন। তাহলে একই পানীয় মানুষের শরীরে এত ভিন্ন প্রভাব ফেলে কেন?

২০ বছর বয়সী এমিলি যেমন বলেন, কফি বা ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় তার শরীর কিংবা ঘুমে তেমন কোনো প্রভাব ফেলে না। লন্ডনে সন্ধ্যা ৬টার দিকে একটি ক্যাফে থেকে বের হওয়ার সময় তিনি জানান, সাধারণত দিনে দুই কাপ কফি পান করেন। এর সঙ্গে কখনো একটি শক্তিবর্ধক পানীয়ও খান। এমনকি রাতে কোমল পানীয় খেলেও তার ঘুমের সমস্যা হয় না।

এমিলির মতো মানুষ অনেকেরই পরিচিত। কেউ রাতে ডাবল এসপ্রেসো খেয়েও এক ঘণ্টার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েন। অন্যদিকে কারও জন্য বিকেলের এক কাপ কফিই রাতভর জেগে থাকার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এর পেছনে রয়েছে মানুষের শরীরে ক্যাফেইন কীভাবে কাজ করে, কত দ্রুত শরীর সেটিকে ভেঙে ফেলে এবং ব্যক্তি বিশেষে শরীরের প্রতিক্রিয়ার পার্থক্য।

Feeling tired and sleepy after having coffee: Here's why it happens and how  to prevent it | - The Times of India

ক্যাফেইন আসলে কী?

ক্যাফেইন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মনঃপ্রভাবকারী রাসায়নিকগুলোর একটি। প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে দুই বিলিয়নেরও বেশি কাপ কফি পান করা হয়। এর বাইরে কোমল পানীয়, শক্তিবর্ধক পানীয়, চকোলেট, চুইংগাম এবং কিছু ক্রীড়া-সম্পূরক পণ্যেও ক্যাফেইন থাকে।

ক্যাফেইন আমাদের সতর্ক থাকতে সাহায্য করে। এটি মনোযোগ বাড়াতে পারে এবং ক্লান্তির অনুভূতি কিছু সময়ের জন্য দূরে রাখতে পারে। কিন্তু ক্যাফেইন আসলে শরীরকে বাড়তি শক্তি দেয় না। বরং মস্তিষ্কে জমে থাকা ঘুম ও ক্লান্তির সংকেতকে সাময়িকভাবে আড়াল করে।

সারাদিন ধরে মস্তিষ্কে ‘অ্যাডেনোসিন’ নামের একটি রাসায়নিক জমতে থাকে। এই রাসায়নিকের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ঘুম ঘুম ভাব তৈরি হয়। ক্যাফেইন মস্তিষ্কে অ্যাডেনোসিনের কার্যক্রম আটকে দেয়। ফলে কিছু সময়ের জন্য আমাদের মনে হয় আমরা ক্লান্ত নই, বরং আরও সতেজ ও সজাগ।

তবে বেশি ক্যাফেইন গ্রহণ করলে মাথাব্যথা, হাত-পা কাঁপা, অস্থিরতা, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া এবং ঘুমের সমস্যা হতে পারে।

একই কফি, কিন্তু প্রভাব এত আলাদা কেন?

এর একটি বড় কারণ হলো—ক্যাফেইন শরীরে কতক্ষণ থাকে।

কফি পান করার পর ক্যাফেইন দ্রুত রক্তে মিশে যায় এবং মস্তিষ্কেও পৌঁছে যায়। একই সময়ে শরীর ক্যাফেইনকে ভেঙে ফেলার কাজ শুরু করে। মূলত যকৃতে থাকা একটি এনজাইমের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া হয়। এরপর শরীর প্রস্রাবের মাধ্যমে ক্যাফেইন ও তার বিপাকজাত পদার্থ বের করে দেয়।

কিন্তু এই পুরো প্রক্রিয়ার গতি সবার ক্ষেত্রে এক নয়।

নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক ড. মেরিলিন কর্নেলিসের মতে, একজন মানুষের শরীর থেকে ক্যাফেইন পুরোপুরি কমে যেতে প্রায় ছয় থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

The Reason Coffee Makes Some People Sleepy

অর্থাৎ, কেউ কফি পান করার পর দ্রুত ক্যাফেইন শরীর থেকে বের করে ফেলতে পারেন। আবার কারও শরীরে তা অনেক বেশি সময় ধরে থেকে যেতে পারে।

এ কারণেই প্রথম কাপ কফি পান করার পর একজন হয়তো তেমন কিছু অনুভব করেন না। কিন্তু দুই-তিন ঘণ্টা পরও যদি সেই ক্যাফেইন শরীরে থেকে যায় এবং এর মধ্যে দ্বিতীয় কাপ কফি পান করা হয়, তাহলে মোট ক্যাফেইনের মাত্রা বেড়ে গিয়ে অস্থিরতা বা উদ্বেগের অনুভূতি তৈরি হতে পারে।

জিনও কি এর জন্য দায়ী?

ক্যাফেইন শরীরে কত দ্রুত ভাঙবে, তার ক্ষেত্রে জিনগত পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষ করে CYP1A2 নামের একটি জিন যকৃতের সেই এনজাইম তৈরির সঙ্গে যুক্ত, যা ক্যাফেইন ভাঙতে সাহায্য করে। মানুষের শরীরে এই প্রক্রিয়া কত দ্রুত হবে, তার একটি অংশ এই জিনের বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে।

সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, গড়ে ইউরোপীয় ও দক্ষিণ আমেরিকান বংশোদ্ভূত মানুষের শরীরে ক্যাফেইন তুলনামূলক দ্রুত ভাঙতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের সব মানুষ একইভাবে ক্যাফেইনের প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখাবেন। ব্যক্তিভেদে পার্থক্য অনেকটাই থাকে।

শুধু জিন নয়, আরও অনেক বিষয় আছে

ক্যাফেইনের প্রভাব নির্ধারণে শুধু জিনই দায়ী নয়। একজন মানুষ ধূমপান করেন কি না, কী ধরনের ওষুধ খান, গর্ভবতী কি না এবং নিয়মিত কতটা ক্যাফেইন গ্রহণ করেন—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

ধূমপান যকৃতকে ক্যাফেইন দ্রুত ভাঙতে উদ্দীপিত করতে পারে। গবেষণা অনুযায়ী, ধূমপানের কারণে এই প্রক্রিয়া প্রায় ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত দ্রুত হতে পারে। তবে ই-সিগারেট বা ভ্যাপিংয়ের ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রভাব দেখা যায় কি না, তা স্পষ্ট নয়।

Is It Bad To Drink Coffee Late at Night?

এ কারণেই ধূমপায়ীদের মধ্যে বেশি কফি পান করার প্রবণতা দেখা যেতে পারে। আবার কেউ ধূমপান ছেড়ে দিলে তার শরীরে ক্যাফেইন আগের তুলনায় ধীরে ভাঙতে পারে। ফলে যে পরিমাণ কফি আগে স্বাভাবিক মনে হতো, ধূমপান ছাড়ার পর সেটিই অনেক বেশি শক্তিশালী মনে হতে পারে।

কিছু অ্যান্টিবায়োটিক, জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি এবং অন্যান্য প্রেসক্রিপশন ওষুধ ক্যাফেইন ভাঙার প্রক্রিয়া ধীর করে দিতে পারে। ফলে ক্যাফেইন শরীরে বেশি সময় থেকে যেতে পারে এবং এর প্রভাবও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

গর্ভাবস্থায় কেন বিষয়টি আলাদা?

গর্ভাবস্থাতেও ক্যাফেইন শরীরে বেশি সময় থাকতে পারে। এ সময় হরমোনের পরিবর্তনের কারণে যকৃতের ক্যাফেইন ভাঙার এনজাইমের কার্যক্রম কমে যেতে পারে।

তাই গর্ভবতী নারীদের ক্যাফেইন গ্রহণের বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।

যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা কর্তৃপক্ষের পরামর্শ অনুযায়ী, গর্ভাবস্থায় প্রতিদিন ২০০ মিলিগ্রামের কম ক্যাফেইন গ্রহণ করা উচিত। এটি প্রায় দুই মগ ফিল্টার কফির সমপরিমাণ। ক্যাফেইনের সঙ্গে কম ওজনের শিশু জন্ম এবং গর্ভাবস্থার কিছু জটিলতার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

নিয়মিত কফি খেলেও কি ক্যাফেইনের প্রভাব কমে?

হ্যাঁ। নিয়মিত কফি বা ক্যাফেইন গ্রহণ করলে শরীর ধীরে ধীরে এর সঙ্গে মানিয়ে নেয়। ফলে একই পরিমাণ ক্যাফেইন আগের মতো তীব্র অনুভূতি তৈরি নাও করতে পারে।

এটিকে বলা যায় ক্যাফেইনের প্রতি সহনশীলতা তৈরি হওয়া।

কিন্তু কেউ যদি কয়েক সপ্তাহ কফি বা ক্যাফেইন থেকে বিরত থাকেন, তাহলে মস্তিষ্কের এই অভিযোজন ধীরে ধীরে কমে যায়। এরপর আবার কফি পান করলে আগের তুলনায় বেশি সতেজ, অস্থির বা কাঁপুনি-কাঁপুনি অনুভূতি হতে পারে।

অর্থাৎ, প্রতিদিনের অভ্যাস একজন মানুষের ক্যাফেইনের প্রতি সংবেদনশীলতাও বদলে দিতে পারে।

Why You Might Feel Tired After Drinking Coffee

রাতে কফি খেলে ঘুমের সমস্যা হবে কি?

ঘুম বিশেষজ্ঞরা সাধারণত ঘুমানোর অন্তত ছয় ঘণ্টা আগে ক্যাফেইন এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন।

মনোবিজ্ঞানী ও ঘুম বিশেষজ্ঞ ড. লিন্ডসে ব্রাউনিং বলেন, ক্যাফেইন শুধু ঘুম আসতে দেরি করায় না, ঘুমের মানও খারাপ করতে পারে।

তার পরামর্শ হলো, কেউ যদি রাত ১০টার দিকে ঘুমাতে যান, তাহলে বিকেল ২টার পর ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা ভালো।

তবে সবার জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। কারণ মানুষের শরীরে ক্যাফেইন কত দ্রুত ভাঙে এবং একজন ব্যক্তি এর প্রতি কতটা সংবেদনশীল—তা একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম।

তাই এমন কোনো কঠোর নিয়ম নেই যে সবাইকে দিনের নির্দিষ্ট সময়ের পর অবশ্যই কফি বন্ধ করতে হবে। বরং নিজের শরীর ও ঘুমের ধরন বুঝে ক্যাফেইন গ্রহণের সময় ঠিক করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

শক্তিবর্ধক পানীয়তেও আছে ক্যাফেইন

কফি ছাড়াও শক্তিবর্ধক পানীয়ের মাধ্যমে অনেকেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্যাফেইন গ্রহণ করেন। সাধারণত একটি বোতল শক্তিবর্ধক পানীয়তে প্রায় ৮০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন থাকতে পারে, যা এক কাপ ফিল্টার কফির তুলনায় কিছুটা কম। তবে ব্র্যান্ড ও পণ্যের ধরনভেদে ক্যাফেইনের পরিমাণে বড় পার্থক্য থাকতে পারে।

তাই শুধু কফি কত কাপ খাওয়া হয়েছে, সেটি হিসাব করলেই হবে না। দিনে কোমল পানীয়, শক্তিবর্ধক পানীয়, চকোলেট বা ক্যাফেইনযুক্ত অন্য কোনো পণ্য খাওয়া হয়েছে কি না, সেটিও বিবেচনায় রাখা দরকার।

অতিরিক্ত ক্যাফেইন কতটা বিপজ্জনক?

Green Tea Before Bed: Is It a Good Idea?

প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ক্যাফেইন সাধারণত পরিমিত পরিমাণে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। তবে অতিরিক্ত গ্রহণ করলে শরীর অস্বস্তিকর প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে।

অতিরিক্ত ক্যাফেইনে অস্থিরতা, হাত-পা কাঁপা, মাথাব্যথা, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া এবং ঘুমের সমস্যা হতে পারে। অনেক সময় শরীর নিজেই সংকেত দেয় যে আর ক্যাফেইন প্রয়োজন নেই।

ক্যাফেইনের মারাত্মক মাত্রার বিষক্রিয়া খুবই বিরল। গুরুতর বিষক্রিয়ার ঘটনা সাধারণত ঘনীভূত ক্যাফেইনজাত পণ্য থেকে ঘটে, যেখানে অল্প সময়ের মধ্যে কয়েক গ্রাম ক্যাফেইন গ্রহণ করা সম্ভব।

তাহলে কফি কি ভালো, নাকি খারাপ?

কফিপ্রেমীদের জন্য সুখবরও আছে।

দীর্ঘ কয়েক দশকের গবেষণায় দেখা গেছে, পরিমিত কফি পানকারীদের মধ্যে কিছু বড় ধরনের রোগের ঝুঁকি তুলনামূলক কম হতে পারে এবং তারা কফি না পানকারীদের চেয়ে সামান্য বেশি দিন বাঁচতেও পারেন।

তবে গবেষকেরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারেন না যে এই ভালো ফলের একমাত্র কারণ কফি। কফি পানকারীদের জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয়ও এর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।

তাই কফিকে একদিকে পুরোপুরি ক্ষতিকর এবং অন্যদিকে সব সমস্যার সমাধান—কোনোটিই বলা ঠিক নয়।

মূল বিষয় হলো পরিমিতি এবং ব্যক্তিভেদে শরীরের প্রতিক্রিয়া বোঝা।

কারও জন্য সকালে এক-দুই কাপ কফি স্বাভাবিক অভ্যাস হতে পারে। আবার অন্য কারও ক্ষেত্রে বিকেলের পর এক কাপ কফিই রাতের ঘুম নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট।

শেষ পর্যন্ত কফি কতটা প্রভাব ফেলবে, তা শুধু কাপের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। মানুষের জিন, শরীরের বিপাকক্রিয়া, ধূমপানের অভ্যাস, ওষুধ, গর্ভাবস্থা, নিয়মিত ক্যাফেইন গ্রহণ এবং ব্যক্তিগত সংবেদনশীলতা—সবকিছু মিলেই ঠিক করে দেয় এক কাপ কফি কাউকে কতটা ‘জাগিয়ে’ রাখবে।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

ইতালিতে সন্তান পালনের অভিজ্ঞতা, নিউইয়র্কের মায়ের চোখে একেবারেই ভিন্ন

কফি খেয়েও কারও ঘুম আসে, আবার কারও রাতভর ঘুম হারাম—কেন এমন হয়?

০২:৩৭:৩২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কেউ সন্ধ্যার পর এক কাপ কফি খেলেই অস্থির হয়ে পড়েন, রাতে বিছানায় শুয়ে ঘুমের অপেক্ষায় ছটফট করেন। আবার এমন মানুষও আছেন, যিনি রাতে কফি, কোমল পানীয় কিংবা ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় খেলেও নির্বিঘ্নে ঘুমিয়ে পড়েন। তাহলে একই পানীয় মানুষের শরীরে এত ভিন্ন প্রভাব ফেলে কেন?

২০ বছর বয়সী এমিলি যেমন বলেন, কফি বা ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় তার শরীর কিংবা ঘুমে তেমন কোনো প্রভাব ফেলে না। লন্ডনে সন্ধ্যা ৬টার দিকে একটি ক্যাফে থেকে বের হওয়ার সময় তিনি জানান, সাধারণত দিনে দুই কাপ কফি পান করেন। এর সঙ্গে কখনো একটি শক্তিবর্ধক পানীয়ও খান। এমনকি রাতে কোমল পানীয় খেলেও তার ঘুমের সমস্যা হয় না।

এমিলির মতো মানুষ অনেকেরই পরিচিত। কেউ রাতে ডাবল এসপ্রেসো খেয়েও এক ঘণ্টার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েন। অন্যদিকে কারও জন্য বিকেলের এক কাপ কফিই রাতভর জেগে থাকার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এর পেছনে রয়েছে মানুষের শরীরে ক্যাফেইন কীভাবে কাজ করে, কত দ্রুত শরীর সেটিকে ভেঙে ফেলে এবং ব্যক্তি বিশেষে শরীরের প্রতিক্রিয়ার পার্থক্য।

Feeling tired and sleepy after having coffee: Here's why it happens and how  to prevent it | - The Times of India

ক্যাফেইন আসলে কী?

ক্যাফেইন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মনঃপ্রভাবকারী রাসায়নিকগুলোর একটি। প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে দুই বিলিয়নেরও বেশি কাপ কফি পান করা হয়। এর বাইরে কোমল পানীয়, শক্তিবর্ধক পানীয়, চকোলেট, চুইংগাম এবং কিছু ক্রীড়া-সম্পূরক পণ্যেও ক্যাফেইন থাকে।

ক্যাফেইন আমাদের সতর্ক থাকতে সাহায্য করে। এটি মনোযোগ বাড়াতে পারে এবং ক্লান্তির অনুভূতি কিছু সময়ের জন্য দূরে রাখতে পারে। কিন্তু ক্যাফেইন আসলে শরীরকে বাড়তি শক্তি দেয় না। বরং মস্তিষ্কে জমে থাকা ঘুম ও ক্লান্তির সংকেতকে সাময়িকভাবে আড়াল করে।

সারাদিন ধরে মস্তিষ্কে ‘অ্যাডেনোসিন’ নামের একটি রাসায়নিক জমতে থাকে। এই রাসায়নিকের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ঘুম ঘুম ভাব তৈরি হয়। ক্যাফেইন মস্তিষ্কে অ্যাডেনোসিনের কার্যক্রম আটকে দেয়। ফলে কিছু সময়ের জন্য আমাদের মনে হয় আমরা ক্লান্ত নই, বরং আরও সতেজ ও সজাগ।

তবে বেশি ক্যাফেইন গ্রহণ করলে মাথাব্যথা, হাত-পা কাঁপা, অস্থিরতা, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া এবং ঘুমের সমস্যা হতে পারে।

একই কফি, কিন্তু প্রভাব এত আলাদা কেন?

এর একটি বড় কারণ হলো—ক্যাফেইন শরীরে কতক্ষণ থাকে।

কফি পান করার পর ক্যাফেইন দ্রুত রক্তে মিশে যায় এবং মস্তিষ্কেও পৌঁছে যায়। একই সময়ে শরীর ক্যাফেইনকে ভেঙে ফেলার কাজ শুরু করে। মূলত যকৃতে থাকা একটি এনজাইমের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া হয়। এরপর শরীর প্রস্রাবের মাধ্যমে ক্যাফেইন ও তার বিপাকজাত পদার্থ বের করে দেয়।

কিন্তু এই পুরো প্রক্রিয়ার গতি সবার ক্ষেত্রে এক নয়।

নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক ড. মেরিলিন কর্নেলিসের মতে, একজন মানুষের শরীর থেকে ক্যাফেইন পুরোপুরি কমে যেতে প্রায় ছয় থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

The Reason Coffee Makes Some People Sleepy

অর্থাৎ, কেউ কফি পান করার পর দ্রুত ক্যাফেইন শরীর থেকে বের করে ফেলতে পারেন। আবার কারও শরীরে তা অনেক বেশি সময় ধরে থেকে যেতে পারে।

এ কারণেই প্রথম কাপ কফি পান করার পর একজন হয়তো তেমন কিছু অনুভব করেন না। কিন্তু দুই-তিন ঘণ্টা পরও যদি সেই ক্যাফেইন শরীরে থেকে যায় এবং এর মধ্যে দ্বিতীয় কাপ কফি পান করা হয়, তাহলে মোট ক্যাফেইনের মাত্রা বেড়ে গিয়ে অস্থিরতা বা উদ্বেগের অনুভূতি তৈরি হতে পারে।

জিনও কি এর জন্য দায়ী?

ক্যাফেইন শরীরে কত দ্রুত ভাঙবে, তার ক্ষেত্রে জিনগত পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষ করে CYP1A2 নামের একটি জিন যকৃতের সেই এনজাইম তৈরির সঙ্গে যুক্ত, যা ক্যাফেইন ভাঙতে সাহায্য করে। মানুষের শরীরে এই প্রক্রিয়া কত দ্রুত হবে, তার একটি অংশ এই জিনের বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে।

সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, গড়ে ইউরোপীয় ও দক্ষিণ আমেরিকান বংশোদ্ভূত মানুষের শরীরে ক্যাফেইন তুলনামূলক দ্রুত ভাঙতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের সব মানুষ একইভাবে ক্যাফেইনের প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখাবেন। ব্যক্তিভেদে পার্থক্য অনেকটাই থাকে।

শুধু জিন নয়, আরও অনেক বিষয় আছে

ক্যাফেইনের প্রভাব নির্ধারণে শুধু জিনই দায়ী নয়। একজন মানুষ ধূমপান করেন কি না, কী ধরনের ওষুধ খান, গর্ভবতী কি না এবং নিয়মিত কতটা ক্যাফেইন গ্রহণ করেন—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

ধূমপান যকৃতকে ক্যাফেইন দ্রুত ভাঙতে উদ্দীপিত করতে পারে। গবেষণা অনুযায়ী, ধূমপানের কারণে এই প্রক্রিয়া প্রায় ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত দ্রুত হতে পারে। তবে ই-সিগারেট বা ভ্যাপিংয়ের ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রভাব দেখা যায় কি না, তা স্পষ্ট নয়।

Is It Bad To Drink Coffee Late at Night?

এ কারণেই ধূমপায়ীদের মধ্যে বেশি কফি পান করার প্রবণতা দেখা যেতে পারে। আবার কেউ ধূমপান ছেড়ে দিলে তার শরীরে ক্যাফেইন আগের তুলনায় ধীরে ভাঙতে পারে। ফলে যে পরিমাণ কফি আগে স্বাভাবিক মনে হতো, ধূমপান ছাড়ার পর সেটিই অনেক বেশি শক্তিশালী মনে হতে পারে।

কিছু অ্যান্টিবায়োটিক, জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি এবং অন্যান্য প্রেসক্রিপশন ওষুধ ক্যাফেইন ভাঙার প্রক্রিয়া ধীর করে দিতে পারে। ফলে ক্যাফেইন শরীরে বেশি সময় থেকে যেতে পারে এবং এর প্রভাবও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

গর্ভাবস্থায় কেন বিষয়টি আলাদা?

গর্ভাবস্থাতেও ক্যাফেইন শরীরে বেশি সময় থাকতে পারে। এ সময় হরমোনের পরিবর্তনের কারণে যকৃতের ক্যাফেইন ভাঙার এনজাইমের কার্যক্রম কমে যেতে পারে।

তাই গর্ভবতী নারীদের ক্যাফেইন গ্রহণের বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।

যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা কর্তৃপক্ষের পরামর্শ অনুযায়ী, গর্ভাবস্থায় প্রতিদিন ২০০ মিলিগ্রামের কম ক্যাফেইন গ্রহণ করা উচিত। এটি প্রায় দুই মগ ফিল্টার কফির সমপরিমাণ। ক্যাফেইনের সঙ্গে কম ওজনের শিশু জন্ম এবং গর্ভাবস্থার কিছু জটিলতার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

নিয়মিত কফি খেলেও কি ক্যাফেইনের প্রভাব কমে?

হ্যাঁ। নিয়মিত কফি বা ক্যাফেইন গ্রহণ করলে শরীর ধীরে ধীরে এর সঙ্গে মানিয়ে নেয়। ফলে একই পরিমাণ ক্যাফেইন আগের মতো তীব্র অনুভূতি তৈরি নাও করতে পারে।

এটিকে বলা যায় ক্যাফেইনের প্রতি সহনশীলতা তৈরি হওয়া।

কিন্তু কেউ যদি কয়েক সপ্তাহ কফি বা ক্যাফেইন থেকে বিরত থাকেন, তাহলে মস্তিষ্কের এই অভিযোজন ধীরে ধীরে কমে যায়। এরপর আবার কফি পান করলে আগের তুলনায় বেশি সতেজ, অস্থির বা কাঁপুনি-কাঁপুনি অনুভূতি হতে পারে।

অর্থাৎ, প্রতিদিনের অভ্যাস একজন মানুষের ক্যাফেইনের প্রতি সংবেদনশীলতাও বদলে দিতে পারে।

Why You Might Feel Tired After Drinking Coffee

রাতে কফি খেলে ঘুমের সমস্যা হবে কি?

ঘুম বিশেষজ্ঞরা সাধারণত ঘুমানোর অন্তত ছয় ঘণ্টা আগে ক্যাফেইন এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন।

মনোবিজ্ঞানী ও ঘুম বিশেষজ্ঞ ড. লিন্ডসে ব্রাউনিং বলেন, ক্যাফেইন শুধু ঘুম আসতে দেরি করায় না, ঘুমের মানও খারাপ করতে পারে।

তার পরামর্শ হলো, কেউ যদি রাত ১০টার দিকে ঘুমাতে যান, তাহলে বিকেল ২টার পর ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা ভালো।

তবে সবার জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। কারণ মানুষের শরীরে ক্যাফেইন কত দ্রুত ভাঙে এবং একজন ব্যক্তি এর প্রতি কতটা সংবেদনশীল—তা একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম।

তাই এমন কোনো কঠোর নিয়ম নেই যে সবাইকে দিনের নির্দিষ্ট সময়ের পর অবশ্যই কফি বন্ধ করতে হবে। বরং নিজের শরীর ও ঘুমের ধরন বুঝে ক্যাফেইন গ্রহণের সময় ঠিক করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

শক্তিবর্ধক পানীয়তেও আছে ক্যাফেইন

কফি ছাড়াও শক্তিবর্ধক পানীয়ের মাধ্যমে অনেকেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্যাফেইন গ্রহণ করেন। সাধারণত একটি বোতল শক্তিবর্ধক পানীয়তে প্রায় ৮০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন থাকতে পারে, যা এক কাপ ফিল্টার কফির তুলনায় কিছুটা কম। তবে ব্র্যান্ড ও পণ্যের ধরনভেদে ক্যাফেইনের পরিমাণে বড় পার্থক্য থাকতে পারে।

তাই শুধু কফি কত কাপ খাওয়া হয়েছে, সেটি হিসাব করলেই হবে না। দিনে কোমল পানীয়, শক্তিবর্ধক পানীয়, চকোলেট বা ক্যাফেইনযুক্ত অন্য কোনো পণ্য খাওয়া হয়েছে কি না, সেটিও বিবেচনায় রাখা দরকার।

অতিরিক্ত ক্যাফেইন কতটা বিপজ্জনক?

Green Tea Before Bed: Is It a Good Idea?

প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ক্যাফেইন সাধারণত পরিমিত পরিমাণে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। তবে অতিরিক্ত গ্রহণ করলে শরীর অস্বস্তিকর প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে।

অতিরিক্ত ক্যাফেইনে অস্থিরতা, হাত-পা কাঁপা, মাথাব্যথা, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া এবং ঘুমের সমস্যা হতে পারে। অনেক সময় শরীর নিজেই সংকেত দেয় যে আর ক্যাফেইন প্রয়োজন নেই।

ক্যাফেইনের মারাত্মক মাত্রার বিষক্রিয়া খুবই বিরল। গুরুতর বিষক্রিয়ার ঘটনা সাধারণত ঘনীভূত ক্যাফেইনজাত পণ্য থেকে ঘটে, যেখানে অল্প সময়ের মধ্যে কয়েক গ্রাম ক্যাফেইন গ্রহণ করা সম্ভব।

তাহলে কফি কি ভালো, নাকি খারাপ?

কফিপ্রেমীদের জন্য সুখবরও আছে।

দীর্ঘ কয়েক দশকের গবেষণায় দেখা গেছে, পরিমিত কফি পানকারীদের মধ্যে কিছু বড় ধরনের রোগের ঝুঁকি তুলনামূলক কম হতে পারে এবং তারা কফি না পানকারীদের চেয়ে সামান্য বেশি দিন বাঁচতেও পারেন।

তবে গবেষকেরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারেন না যে এই ভালো ফলের একমাত্র কারণ কফি। কফি পানকারীদের জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয়ও এর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।

তাই কফিকে একদিকে পুরোপুরি ক্ষতিকর এবং অন্যদিকে সব সমস্যার সমাধান—কোনোটিই বলা ঠিক নয়।

মূল বিষয় হলো পরিমিতি এবং ব্যক্তিভেদে শরীরের প্রতিক্রিয়া বোঝা।

কারও জন্য সকালে এক-দুই কাপ কফি স্বাভাবিক অভ্যাস হতে পারে। আবার অন্য কারও ক্ষেত্রে বিকেলের পর এক কাপ কফিই রাতের ঘুম নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট।

শেষ পর্যন্ত কফি কতটা প্রভাব ফেলবে, তা শুধু কাপের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। মানুষের জিন, শরীরের বিপাকক্রিয়া, ধূমপানের অভ্যাস, ওষুধ, গর্ভাবস্থা, নিয়মিত ক্যাফেইন গ্রহণ এবং ব্যক্তিগত সংবেদনশীলতা—সবকিছু মিলেই ঠিক করে দেয় এক কাপ কফি কাউকে কতটা ‘জাগিয়ে’ রাখবে।