ইংল্যান্ডের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে চলমান খরা পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে আগামী সাত মাসজুড়ে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত প্রয়োজন হতে পারে। নতুন এক গবেষণা বলছে, ২০২৭ সালের বসন্তের মধ্যে ইংল্যান্ডের সব এলাকায় খরা পরিস্থিতি শেষ করতে এখন থেকে আগামী এপ্রিল পর্যন্ত স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ১২০ শতাংশ বৃষ্টিপাত প্রয়োজন।
সেপ্টেম্বরের প্রথমার্ধে কয়েক দফা বৃষ্টি কিছুটা স্বস্তি এনেছে। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতির বড় ধরনের পরিবর্তন হয়নি। ইংল্যান্ডের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এলাকা এখনো খরার মধ্যে রয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির পরিবেশ সংস্থা। অস্বাভাবিক শুষ্ক বসন্ত ও গ্রীষ্ম, এর সঙ্গে একের পর এক তাপপ্রবাহ—সব মিলিয়ে পানির ঘাটতি তৈরি হয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে।
পরিবেশ সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, আগামী কয়েক মাসে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হলে পানির উৎসগুলো দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে না। সর্বশেষ আবহাওয়া পূর্বাভাসে শরৎকালে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টির সম্ভাবনা দেখা গেলেও, সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিস্থিতিতেও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ডেভন ও কর্নওয়াল এবং পূর্ব ইংল্যান্ডের ইস্ট অ্যাংলিয়া ২০২৭ সালের বসন্তের শুরুতেও খরার মধ্যে থাকতে পারে।
আরও কিছু সম্ভাব্য পরিস্থিতির পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী বসন্তে ইংল্যান্ডের প্রায় অর্ধেক এলাকা এখনো খরার কবলে থাকার সম্ভাবনা প্রায় চার ভাগের এক ভাগ। তবে আগামী কয়েক মাসে ‘তীব্র খরা’ দেখা দেওয়ার আশঙ্কা বর্তমানে মাত্র ১ শতাংশ।

তীব্র খরার আশঙ্কা কম, কিন্তু সংকট গুরুতর
পরিবেশ সংস্থা ‘তীব্র খরা’ বলতে এমন পরিস্থিতিকে বোঝায়, যখন পানির ঘাটতি পরিবেশ, কৃষি, জনজীবন ও অর্থনীতিতে ব্যাপক ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে এবং সাধারণ মানুষের পানি সরবরাহও গুরুতর হুমকির মুখে পড়ে।
ইংল্যান্ডে সর্বশেষ তীব্র খরা দেখা গিয়েছিল ১৯৭৬ সালে। সেই তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতিতে তীব্র খরার আশঙ্কা কম হলেও পরিবেশ সংস্থা সতর্ক করে বলছে, দীর্ঘদিনের পানির ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা সহজ হবে না।
সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে কিছুটা স্বস্তি এলেও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এখনো অনেক নিচে। একই সঙ্গে ইংল্যান্ডের জলাধারগুলোতে গত সপ্তাহে মোট মজুত ছিল মাত্র ৫৭ শতাংশের কিছু কম। বছরের এই সময়ে যে পরিমাণ পানি থাকার কথা, তার তুলনায় এই মজুত প্রায় এক-পঞ্চমাংশ কম।
পরিবেশ সংস্থার প্রধান নির্বাহী ফিলিপ ডাফি বলেন, খরা পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত গুরুতর এবং সামনে যে চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেটিকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কয়েক সপ্তাহের বৃষ্টি বসন্ত ও গ্রীষ্মের দীর্ঘস্থায়ী শুষ্কতার কারণে তৈরি হওয়া পানির ঘাটতি পূরণ করতে পারবে না। তাই খরা কাটিয়ে উঠতে সবাইকে পানির ব্যবহার কিছুটা কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসেও উদ্বেগ
শুধু ইংল্যান্ড নয়, যুক্তরাজ্যের অন্য অংশেও দীর্ঘদিনের শুষ্ক আবহাওয়ার প্রভাব রয়ে গেছে।

স্কটল্যান্ডের পূর্বাঞ্চলের কিছু এলাকায় সাম্প্রতিক বৃষ্টিও কয়েক মাসের শুষ্কতার প্রভাব পুরোপুরি কাটাতে পারেনি। সেখানে চারটি এলাকায় এখন উল্লেখযোগ্য পানি সংকট ঘোষণা করা হয়েছে।
ওয়েলসের পুরো এলাকাও এখনো খরা পরিস্থিতির আওতায় রয়েছে।
কোনো এলাকায় নদীর পানির প্রবাহ টানা ৩০ দিন স্বীকৃত নিম্নসীমার নিচে থাকলে সেখানে ‘উল্লেখযোগ্য পানি সংকট’ ঘোষণা করা হয়।
এই সপ্তাহে কি যথেষ্ট বৃষ্টি হবে?
আগামী কয়েক দিনে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন অংশে বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আবহাওয়াবিদদের মতে, এই বৃষ্টি এত দীর্ঘস্থায়ী বা ব্যাপক হবে না যে তা দিয়ে দীর্ঘদিনের পানির ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব।
বৃহস্পতিবার দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি দিয়ে দিন শুরু হতে পারে। কেন্ট উপকূল থেকে বৃষ্টি সরে যেতে কিছুটা সময় লাগবে। দেশের অন্য অংশে রোদ ওঠার পাশাপাশি বিক্ষিপ্ত বৃষ্টিও হতে পারে। বিশেষ করে স্কটল্যান্ড, উত্তর আয়ারল্যান্ড ও উত্তর ইংল্যান্ডে বৃষ্টির সম্ভাবনা বেশি।

স্কটল্যান্ডের উত্তরে নিম্নচাপ অবস্থান করায় যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় ঝোড়ো বাতাসও থাকতে পারে।
শুক্রবার পশ্চিম দিক থেকে খণ্ড খণ্ড বৃষ্টি ছড়িয়ে পড়বে। শনিবার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও দক্ষিণের কিছু এলাকায় বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে রোববারের দিকে বৃষ্টি ও বৃষ্টির প্রবণতা কমে আসবে। এরপর আগামী সপ্তাহের শুরুতে আবহাওয়া অনেকটাই শুষ্ক ও স্থির থাকতে পারে।
আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস বলছে, সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে আবারও তুলনামূলক শুষ্ক আবহাওয়া ফিরে আসতে পারে। দক্ষিণ ইংল্যান্ডে এ পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগের, কারণ পানির ঘাটতি সবচেয়ে বেশি সেখানেই।
এল নিনোর প্রভাব কতটা?
চলমান এল নিনো পরিস্থিতিও যুক্তরাজ্যের আগামী কয়েক মাসের আবহাওয়ার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এটি বর্তমানে প্রায় রেকর্ড মাত্রার কাছাকাছি রয়েছে।

আবহাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে শরৎকালে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টির সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। অতীতের এল নিনো পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্তরাজ্যে শরতের শেষ ভাগ ও শীতের শুরুতে তুলনামূলক উষ্ণ, বেশি বৃষ্টিপাত এবং ঝড়ো আবহাওয়ার সম্পর্ক দেখা গেছে।
এমন বৃষ্টি খরা কাটাতে সহায়ক হতে পারে। তবে অতিরিক্ত ভারী বৃষ্টির আরেকটি ঝুঁকি রয়েছে—হঠাৎ বন্যা।
পরিবেশ সংস্থার মতে, বন্যার পানি দ্রুত নেমে আসায় তা জনসাধারণের পানি সরবরাহের জন্য সংরক্ষণ করা কঠিন হতে পারে। এ ধরনের পানিতে জমি থেকে ধুয়ে আসা পলি, নাইট্রেটসহ বিভিন্ন উপাদানের মাত্রাও বেশি থাকতে পারে।
ফলে ইংল্যান্ডের জন্য সামনে পরিস্থিতিটি এক ধরনের ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। খরা কাটাতে প্রয়োজন দীর্ঘ সময়ের পর্যাপ্ত বৃষ্টি, কিন্তু অতিরিক্ত ভারী বৃষ্টি আবার বন্যার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই আগামী কয়েক মাসে শুধু কতটা বৃষ্টি হচ্ছে তা নয়, সেই বৃষ্টি কতটা ধারাবাহিক ও কীভাবে হচ্ছে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















